বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, তথা প্রতিকৃতি বা আত্মপ্রতিকৃতি অনড় বা অপরিবর্তনীয় নয়। উনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে আর্য সমাজ সমেত অন্যান্য হিন্দু সংগঠনগুলির শুদ্ধি আন্দোলনের ইতিহাস এই বিষয়কে পরিষ্কার করে তোলে। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত History of the Arya Samaj গ্রন্থে লালা লাজপত রায় বলেছিলেন ‘আর্য সমাজ হল একটা বৈদিক চার্চ। অতএব হিন্দু সংগঠনরূপে হিন্দু ধর্মের খোঁয়াড় থেকে বেরিয়ে যাওয়া যে কোনও ভ্রাম্যমান শাবককে ফিরিয়ে আনা এবং যে কাউকে হিন্দু ধর্মে পুনর্দীক্ষিত করা তার কর্তব্য।২৪ হিন্দুধর্মের উপর খ্রিস্টান মিশনারিদের আক্রমণ ও উনবিংশ শতকে নিচু জাতের এবং কিছুটা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তরীকরণের চেষ্টার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিক্রিয়া রূপে শুদ্ধি আন্দোলনের জন্ম হয়। লালা লাজপত রায়ের ভাষাতেই আর্য সমাজ গড়ে ওঠার পেছনে খ্রিস্টানদের প্রভাব লক্ষণীয়। ‘চার্চের’ তুলনা বা মেষ পালক কর্তৃক ‘ভ্রাম্যমান’ মেষ শাবকদের ফিরিয়ে আনার উপমাটি প্রণিধানযোগ্য।
লাজপত রায় এটা লক্ষ করেছিলেন যে ‘শুদ্ধির’ বাচ্যার্থ হল ‘পরিশোধন’ মাত্র। কিন্তু উনিশ শতকের শেষ পদে ও বিংশ শতকের গোড়ায় জঙ্গি হিন্দুয়ানি শব্দটির অর্থ বদলে দিয়েছিল। নানা ধরনের ক্রিয়াকলাপের প্রতি শব্দটি প্রযুক্ত হতে লাগল। (ক) ‘বিদেশী’ ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদের হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করা; (খ) যারা দূর অতীতে অথবা কিছু দিন আগে ‘বিদেশী’ ধর্ম গ্রহণ করেছিল তাদের পুনর্বার ধর্মান্তরিত করা; (গ) নতুন করে পুনরুদ্ধারে ব্রতী হওয়া অর্থাৎ অন্ত্যজদের জাতে তুলে পুরোপুরি হিন্দু করা।২৫
ঔপনিবেশিক ভারতের শেষ পর্যায়ে শাসনতন্ত্রের হিসাবনিকাশের সংখ্যায়নের সঙ্গে হিন্দু সমাজের এই জাতীয় নবতর সংজ্ঞা নিরূপণ অথবা হিন্দু আচারের গ্রাহ্য রূপ নির্ধারণ ও ধর্মান্তরের মতো খ্রিস্টীয় ‘কৌশল’ গ্রহণের চেষ্টা কোনও না কোনওভাবে সম্পৃক্ত।২৬ বিভিন্ন স্তরে গোষ্ঠীচেতনা দ্রুত দানা বেঁধে উঠেছিল, যেমন হিন্দু, মুসলিম, শিখ, আহির, পাটিদার, নাদার, বিহারি, উড়িয়া বা তেলগু। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নতুন মাত্রা পাচ্ছিল। এমতাবস্থায় জঙ্গি হিন্দু নেতা ও সংগঠনরা হিন্দুদের নানা ‘বিকৃত’ ধর্মীয় আচার ও ধারণা পরিত্যাগ করতে ডাক দিলেন। জাতপাতের বিভেদ, একসঙ্গে পঙ্ক্তিভোজন ও সমুদ্রযাত্রা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা, শুচিবাই-এর ‘অদ্ভুত’ ধারণা এবং তার ফলে ধর্মান্তর করবার বিধি নিষেধ ইত্যাদি ‘বোকাটে’, ‘জাতীয়তাবিরোধী’ চিন্তার জন্যই, বলপূর্বক ধর্মান্তরিত লক্ষ লক্ষ হিন্দু আজ পর্যন্ত মুসলিম হয়ে বাস করছে।২৭ ১৯২০ সাল নাগাদ আর্যসমাজীরা ও আরও গোঁড়া হিন্দু নেতার দেবলস্মৃতি করলেন। আরবদের সিন্ধুজয়ের একশ বছর বাদে লেখা এই স্মৃতিগ্রন্থে জোর করে ইসলামে দীক্ষিত হিন্দুদের হিন্দুধর্ম ফিরিয়ে আনার বিস্তৃত বিধি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৩০ সালে একইভাবে খুঁজে পাওয়া গেল অথর্ববেদ ও ব্রাহ্মণের কথিত ‘ব্রাত্যস্তাত্র’ আচার, যার ফলে আর্য সমাজ চ্যুত বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের পুনগ্রহণের বন্দোবস্ত করা যায়।২৮ নতুন এক ঐতিহ্যের পক্ষে শাস্ত্রীয় নির্দেশ সংগৃহীত করা হল।
হিন্দু সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকৃতি ও ‘ঐতিহ্য’ নির্মাণের রীতিসমূহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। এই কথাও বলা প্রয়োজন যে সত্তর বছর ধরে নানা পরিবর্তন ও অভিযোজন সত্ত্বেও কতকগুলি ভিন্ন ঘটনাকে ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার’ সরলীকৃত আখ্যায় ভূষিত করা হচ্ছে। খুব কম সময়ের ব্যবধানে ও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের চরিত্র ও পদ্ধতিগুলি যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা অনুধাবনযোগ্য। এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে ‘দাঙ্গার’ এমন কোনও অপরিবর্তনীয় মৌল রূপ নেই, যার চারপাশের প্রসঙ্গগুলিই শুধু বদলে যায়।
১৯৮০-এর দশকের সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ নানা নতুন রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির মধ্যকার সংঘর্ষ পূর্বতন দাঙ্গার পরিচিত রূপের মধ্যে আর আবদ্ধ নেই; যেমন রাস্তায় দুই দলের মুখোমুখি মারামারি অথবা অলিগলিতে চোরাগোপ্তা খুন। সম্প্রতি ১৯৮৯-এর ভাগলপুর, ১৯৮৭-এর মীরাট, ১৯৮৪-তে শিখ বিরোধী ‘দাঙ্গা’, ১৯৮৩-তে শ্রীলঙ্কার তামিল বিরোধী ‘দাঙ্গা’, ১৯৮০-তে মোরাদাবাদে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ইত্যাদি হিংসার নানা ভয়ংকর নিদর্শনগুলি যেন সুসংগঠিত গোষ্ঠী নির্যাতন, আম কোতলের পরিকল্পনা।২৯ এই সব ক্ষেত্রে শয়ে, হাজারে এমন কি দশ হাজার লোকের জমায়েত ক্ষুদ্র, বিচ্ছিন্ন ও পূর্বচিহ্নিত ‘অপর’ সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, সম্পত্তি ও জীবনের উপর আঘাত হেনেছে।
ভাগলপুরে মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির এক স্থানীয় নেতা বলছিলেন যে এখন কোথাও দু-একটা খুন হলে সেটাকে ‘দাঙ্গা’ বলে গণ্য করা হয় না।৩০ আজকের ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার’ চেহারাটা হয়েছে অন্যরকম, তার চিহ্নগুলো হল: ‘শত্রুকে’ ঝাড়েবংশে শেষ করার উদ্দেশ্যে ছেলে, বুড়ো, অন্ধ, পঙ্গু, মেয়ে, বাচ্চা সবাইকে খতম করা, ক্ষেতের শস্য, সম্পত্তি, যন্ত্রপাতি সমেত ধনেপ্রাণে সবকিছু ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা। এই ক্রিয়াকাণ্ডে পুলিশ নির্লজ্জভাবে অংশ নেয়, সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় চলাচলকারী ট্রেন ও বাসের যাত্রীদের হত্যাও দাঙ্গার নৈমিত্তিক ঘটনা।
