আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে ইতিহাস, যে ইতিবৃত্ত লোকমুখে গড়ে ওঠে, সেখানে হিংসার অভিজ্ঞতা কোনও না কোনওভাবে দাগ কেটে যায়। সেইভাবে বানিয়ে তোলা হয় বর্বর বা সাধু চরিত্রগুলি, তকমা দেওয়া হয় ‘হিন্দু’, ‘মুসলিম’ বা ‘শিখ’। এইসবের পরিণতিও প্রায়শই ভয়ঙ্কর আকার নেয়। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে কীভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের আত্ম-প্রতিকৃতি গড়ে তোলে এবং তাদের প্রতিপক্ষদের চিহ্নিত করে, তার বিশদ বিশ্লেষণে যাব না। সাম্প্রতিককালকে হিন্দুয়ানির প্রচারপত্র থেকে ‘হিন্দু’ বা ‘মুসলিম’ প্রতিকৃতি গঠনের কয়েকটি সূত্রমাত্র নির্দেশ করে আমরা বিষয়টির গুরুত্ব বোঝবার চেষ্টা করব।
কয়েক বছর ধরে জঙ্গি হিন্দুয়ানি ও তার প্রচারের মাত্রা সম্পর্কে অনেকেই বলেছেন। স্পষ্টত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সবচেয়ে বেশি ধুয়ো তুলেছে; ১৯৮০-র দশকে ক্রমবর্ধমান হিন্দু-মুসলিম সংঘাতগুলির সঙ্গে এই রকম প্রচারের যোগও বেশ পরিষ্কার। কিন্তু যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে খেয়াল করা হয়নি তা হল বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো সংগঠনগুলির দাবি, তাদের তোলা বিদ্বেষের জিগির এবং তার থেকে উদ্ভূত ‘দাঙ্গার’ ফুলকি জনসাধারণের মনকে শুধু একটা মুহূর্তের জন্য বিষিয়ে তোলে না। বরং ঠিক তার উলটোটাই ঘটে। আমাদের ইতিহাস, দেশে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির’ নিজেদের সম্বল, অধিকাংশ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির সুবিধাবাদী নীতি এবং বার বার সাম্প্রদায়িক হিংসার বিস্ফোরণ ইত্যাদির প্রেক্ষিতে অন্য গোষ্ঠী বা গোষ্ঠীদের সম্পর্কে ‘দুষ্টু’, ‘বিপজ্জনক’, ‘ভয়ানক’ ইত্যাদি চরিত্রায়ন লোকগ্রাহ্য হচ্ছে, এমন কি লোকমান্য অন্ধ বিশ্বাসের রূপ নিচ্ছে।
কেবল লোকগ্রাহ্য হবার ক্ষেত্রবিচারে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে অনুষ্ঠিত নৃশংস ক্রিয়াকলাপগুলির ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। পুরুষ, মহিলা, শিশু নির্বিশেষে সব মুসলিমকে শেষ করতে হবে—এই জিগির ভাগলপুরের বিভিন্ন জায়গায় কার্যকর করা হয়েছিল। সাধারণভাবে ‘দাঙ্গা’ প্রশমিত হবার আড়াই সপ্তাহ পরেও হিন্দু টেম্পো চালক-সহ ১৮ জন মুসলিম যাত্রীকে গ্রামাঞ্চলের একটি প্রধান সড়কে থামিয়ে খুন করা হয়। পরে তাদের দেহ ক্ষেতে পুঁতে রেখে রসুন গাছের বীজ বুনে দেওয়া হয়। মহিলাদের স্তন কেটে ফেলা হয়, বাচ্চাদের বর্শায় গেঁথে মারা, সেইসব গাঁথা বাচ্চাদের দেহ বাতাসে আন্দোলিত করে হাস্যোল্লাসে মত্ত হওয়ার মতো ঘটনার কথাও শোনা গেছে।২০
আমার মনে হয় যে, এইসব উন্মত্ততা ও অবিশ্বাস্য বর্বরতার পেছনে একটি বিশ্বাস কাজ করেছে। ভুক্তভোগীরা সবাই যেন এক একটি ভয়ঙ্কর দানব বিশেষ। কেউ হয়তো এখন জেগে আছে, কেউ হয়তো ভবিষ্যতে চাগিয়ে উঠবে। ‘আমাদের’ প্রতি ‘তারা’ সমতুল্য বা তার চেয়েও জঘন্য ব্যবহার করেছে বা সামান্য সুযোগ পেলেই ‘তারা’ সেইরকম আচরণ করতে পারে। বহু ক্ষেত্রেই ‘আমাদের’ বর্বর ব্যবহারকে ‘বদলা’ হিসাবে মনে করা হয়েছিল। বিশ্বাস ছিল এই যে আদি বীভৎস ঘটনাগুলো যেন ‘গতকাল ঘটেছে’ বা ‘সেদিন হয়েছে’, ‘শহরে’ বা ‘পাশের জেলায়’ বা আরও দূরে কোথাও সংঘটিত হবার খবর পাওয়া গেছে। ভাগলপুরে গ্রামের দিকে যে গুজবের জন্য হিন্দুরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল, তা হল ভাগলপুর শহরের একাংশে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে মুসলিম মালিকদের বোর্ডিংনিবাসী সমস্ত হিন্দু ছাত্রদের ‘দাঙ্গার’ প্রথম দুদিনেই সাবাড় করা হয়েছে।২১ এইসব হিন্দু ছাত্রদের অধিকাংশই ভাগলপুরের গ্রাম থেকে পড়তে এসেছিল। অন্যান্য ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে, অতীতে ‘তারা’ ‘আমাদের’ উপর সাধারণত যেসব অত্যাচার করেছে, এইবারের দাঙ্গায় সেইসব কুকীর্তির প্রতিহিংসা নেওয়া হল। এখানে যা প্রাসঙ্গিক তা হল এই যে আমাদের কাছে যা কিছু উন্মত্ত হিন্দু প্রলাপ, সেই সবকিছুই ব্যাপক মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য।
এই ধরনের বিশ্বাসের একটা ভদ্ররূপ হল: ‘ভারতের মুসলিমরা পাকিস্তানি’। প্রমাণস্বরূপ বলা হয়, ভারত-পাকিস্তানের যে কোনও ক্রিকেট ম্যাচে ওদের ব্যবহার লক্ষ কর। এর থেকে যুক্তি খাড়া হয় যে স্থানীয় মুসলিমরা একটার পর একটা পাকিস্তান বানাবে—ভাগলপুরে, মোরাদাবাদ, তামিলনাড়ুর মীনাক্ষীপুরমে। এইভাবে আমরা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়াই যেখানে মুসলিমকে মনে হয় ধাতুগতভাবে হিংস্র, ধর্মোন্মাদ ও অবাধ্য।
আক্রমণ, ধর্মান্তরীকরণ, সীমাহীন রিরংসা, এই সমস্ত দিয়ে নাকি ইসলাম প্রসারের ইতিহাস বিধৃত করা যায়। হিন্দুয়ানির ঐতিহাসিক ও প্রচারকদের অভিমত সেটাই। ‘যেখানে মুসলিম গোষ্ঠীরা বাস করে, সেখানেই ইসলামের নামে হত্যার তাণ্ডবলীলা অবশ্যম্ভাবী।’ ‘প্রত্যেক মুসলিমের ধর্মীয় কর্তব্য’ হল ‘অমুসলিম রমণীদের অপহরণ করে তাদের ধর্মে দীক্ষিত করা’। হালে যেসব এলাকায় সংঘাত হয়েছে, সেইসব জায়গাতে জঙ্গি হিন্দু সংগঠনগুলি নানা প্রচারপুস্তিকা ও প্রচারপত্র বিলি করেছিল। এইগুলিতে ‘হিন্দু’ দম্পতির সঙ্গে দুইটি সন্তানের ছবি ছিল, সঙ্গে ছিল শ্লোগান ‘হম দো, হমারা দো’। ঠিক তার পাশেই ছাপা হয়েছিল একটি ‘মুসলিম’ পরিবারের চিত্র। একজন পুরুষের চারটি স্ত্রী এবং অসংখ্য সন্তান, সঙ্গে যুৎসই শ্লোগান, ‘হম পাঁচ, হমারে পচ্চিশ’। এর ফলে তৈরি হল ‘মুসলিমদের’ প্রসঙ্গে লোকগ্রাহ্য একটি নতুন ‘সাধারণ’ চেতনা। অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো এই ক্ষেত্রেও বিবাহ ও যৌনাচার সম্বন্ধে কেবলমাত্র মুসলমান পুরুষদের বিকৃতির কথাই বলা হয়। তাদের বদমেজাজ সম্পর্কে কিছু ধারণাও চালু করে দেওয়া গেল।
