আরও দেখুন:
[আগ্নেয়াস্ত্রের] ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে কোনও স্থান নেই। মুনাফা একমাত্র বিবেচ্য। সাম্প্রদায়িক অসন্তাষকে জিইয়ে রাখার জন্য তাদের কায়েমী স্বার্থ আছে।…জিইয়ে রাখার অপর স্বার্থ হল রিলিফ ক্যাম্প পরিচালনা থেকে সংগৃহীত মুনাফা।১৬
এটা মনে করার কোনও যৌক্তিকতা নেই যে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দ্বন্দ্বগুলি গুরুত্বহীন। কিন্তু আমাদের সমসাময়িক ইতিহাসে সংকীর্ণ বস্তুময় স্বার্থের বাইরেও অতিরিক্ত অনেক কিছু রয়েছে। অথচ সমাজবিজ্ঞানের বেশ কিছু পরিশীলিত রচনাতেও নরনারীর জীবনগুলিকে বস্তুস্বার্থের ক্রীড়নকরূপে এখনও দেখানো হয়। কোনও কোনও সময় এদের নিজস্ব জীবন বৃহত্তর নৈর্ব্যক্তিক অর্থনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের অঙ্কে পর্যবসিত হয়। সেইগুলির উপর ব্যক্তিমানুষের কোনও নিয়ন্ত্রণ স্বীকার করা হয় না। এই নিবন্ধের আপত্তির মূল ঝোঁক এইখানেই। এইটা বলা হচ্ছে যে ‘আসল’ লড়াইটা যেখানে হচ্ছে বলে মনে হয়—বস্তুত লড়াইয়ের ক্ষেত্র সেটা নয়। জোর পড়ে না ইতিবৃত্তের অংশে অথবা ইজ্জতের ধারণায়, ধর্মের মৌলিক ভূমিকা স্বীকৃতি পায় না, অবহেলিত হয় বিশেষ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতীকগুলির প্রতি জনগণের আসক্তি। বরং গুরুত্ব দেওয়া হয় তাৎক্ষণিক বস্তু স্বার্থগুলির উপর। এই স্তরের বিরোধের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি জায়গা জুড়ে থাকে উচ্চবর্গ। পি. ইউ. ডি. আর.-এর রিপোর্ট থেকে উল্লেখ করা যেতে পারে। ‘বর্তমান দাঙ্গা থেকে গ্রামের উচ্চবর্গের স্থায়ী ও প্রধান লাভ হল জমি।’ আবার গ্রামের হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে টিঁকে থাকা অসন্তোষ প্রসঙ্গে বলা হয়,
এই অবস্থা সৃষ্টির কারণ হল সম্পত্তি, বিশেষত ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়া লোকেদের পরিত্যক্ত জমি। জবরদখল করতে বা সস্তায় কিনে নিতে ইচ্ছুক লোকেরা ক্রমাগত হুমকি দিতে থাকে। (কেবল কি তারাই হুমকি দেয়?)
বাহুল্য হলেও এই কথা আবার বলা উচিত যে, সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টির পেছনে জমি বা সম্পত্তির ভূমিকার গুরুত্বকে অস্বীকার করা কিন্তু আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য নয়। শুধু এইটুকু বলা যে ওইসব উপাদানগুলির উপর গুরুত্ব দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও বোধের জায়গাগুলো হারিয়ে যায়, এক কথায়, তাদের সক্রিয়তাকে উপেক্ষা করা হয়।
জনগণের সক্রিয়তা সম্পর্কিত একটি বিশেষ দিককে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। ‘দাঙ্গা’ প্রসঙ্গে আমাদের বহু আলোচনায় ‘জন’সমষ্টি নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। অর্থনৈতিক স্বার্থ, জমির লড়াই, বাজার দখলের খেলা এবং উচ্চবর্গের কলকাঠি নাড়া—এই সবই ঘটনাকে বেগবান করে তোলে। ‘জনগণ’ যেন আবার ইতিহাসের বাইরে থেকে যায়। এইভাবে বোধহয় তাদের আদিম ‘শুদ্ধতা’ রক্ষা করা হয়। আধুনিক ভারতের সাম্প্রদায়িক হিংসার উপরে অধিকাংশ সাম্প্রতিক লেখার বক্তব্য প্রাক-স্বাধীনতা যুগের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের অভিমতের অনুসারী মাত্র। সেখানে এই কথা বলতে চাওয়া হয় যে ১৯৮৯-এর ভাগলপুরের সংঘর্ষের তুল্য ঘটনাগুলি ভারতীয় ইতিহাসের প্রবাহে স্বাভাবিক নয়। সেইগুলি ব্যতিক্রমী, কতকগুলি অস্বাভাবিক সঙ্কটের ফল। এমন একটা ভান করা হয় যে, ১৯৮০-র দশকে দেখা এই ঘটনাসমূহের সংখ্যা যতই বাড়ুক না কেন ও মাত্রা যাই হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তা জনগণের আদত ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ কোনও মৌলিক পরিবর্তন ঘটায় না;১৮ ফলে আমাদের সযত্নে লালিত জাতীয় ঐতিহ্যগুলি— ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’, ‘অহিংসা’ এবং ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’—অটুট থাকে।
৩
আমার কাছে এই ইতিহাস গ্রহণীয় নয়। তার কারণ শুধু এই নয় যে এই রকম ইতিহাসচর্চায় সবকিছু একটি ছাঁচে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে বা জাতীয়তাবাদের এক ঘেয়ে ধারাপাতের আবৃত্তি হয়। এই ইতিহাসচর্চাকে বর্জন করার অন্য কারণও আছে।
স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই ধরনের ইতিহাসচর্চায় ‘সাম্প্রদায়িকতা’ এবং ‘সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ’ কোনও এক নির্ভেজাল মৌলে পর্যবসিত হয়। মৌলের গুণাবলী অপরিবর্তনীয় ও সহজবোধ্য। যা বদলায় তা হল শুধু প্রসঙ্গ। এই অংশে এই রকম ইতিহাস-চর্চার অসম্পূর্ণতার দিকগুলি আলোচনা করব।
আগে বলা হলেও যে কথার পুনরুক্তি করতে চাই তা হল যে ঐতিহাসিক বা রাষ্ট্রনীতি বিশারদ বা সমাজতান্ত্রিক হিসাবে আমরা যে সব নিটোল পূর্ণাঙ্গ বয়ান তৈরি করি ও ভবিষ্যতেও করে যেতে থাকব, তার নির্দিষ্ট একটি প্রবণতা আছে। সেই বয়ানের উপজীব্য হল ‘প্রসঙ্গ’ বিশ্লেষণ মাত্র অথবা উপর্যুক্ত সংঘর্ষগুলির সংঘটক হিসাবে ইতিহাসের বৃহত্তম শক্তির ব্যাখ্যা। এইরকম বিশ্লেষণের একটা সুবিধা বা ফল এই যে আমরা যন্ত্রণাকে তুলে ধরার সমস্যা এড়িয়ে যাই। এ যেন একটি অনাময় ইতিকথা যেটা পড়তে আমরা অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এই ইতিবৃত্তে হিংসা, দুর্দশা ও অতীতের রেখে যাওয়া অনেক ক্ষতচিহ্ন চাপা পড়ে যায়।
কিন্তু এটা খুবই জরুরি যে হিংসার প্রকাশের মুহূর্তগুলি যেন বেশি বেশি করে ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের নজর কাড়ে এবং তাদের রচনায় সেগুলি যেন নতুন করে উপস্থাপিত হয়। নিদেনপক্ষে এর সমর্থনে দুটি কারণ দেখানো যেতে পারে। প্রথমত, হিংসা ও দুর্দশার মুহূর্তগুলিতে আমাদের বর্তমান অবস্থার কথা অনেক বিশদভাবে ধরা পড়ে।১৯ দ্বিতীয়ত, নানা গুরুত্বপূর্ণ অর্থে হিংসার অভিজ্ঞতা আমাদের ‘ঐতিহ্যের’ গড়ে ওঠার উপাদান, সেই অভিজ্ঞতায় আমাদের কৌমের বোধ, গোষ্ঠীচেতনা ও তার ইতিহাস তৈরি হয়েছে।
