সেখানে মানুষেরা একসঙ্গে চিরকাল থেকেছেন ও থাকছেন, একে অপরের সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন—সে আহার বিহারের ব্যাপারই হোক, মেয়ের বিয়েই হোক কিংবা নির্বাচনের রাজনীতিই হোক। এটা কি করে সম্ভব যে তাঁরা রাতারাতি একে অপরের শত্রু হয়ে দাঁড়াবেন? বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভুমি বিতর্কে তাঁদের কিই বা এসে যায়? কিন্তু সুযোগ বুঝে দুই সম্প্রদায়ের বদমাইসরা খুব তাড়াতাড়ি এই সব লোকেদের মনে পাগলামির বিষাক্ত বীজ বুনে দিতে পেরেছিল।
দ্রুত মানুষের মন বিষাক্ত করার বিশেষ কাজটি কিন্তু কোনও সমস্যা রূপে বিবেচিত হল না, তার তাৎপর্য নিয়ে কোনও আলোচনা থাকল না। বরং আমাদের বলা হল, ‘ভাগলপুরের দাঙ্গা ততটা সাম্প্রদায়িক মনোভাবের ফল নয়, বরং বদমাইসদের সৃষ্ট একটি দুর্বিপাক।’১৩
প্রাক-স্বাধীনতা আমলের জাতীয়তাবাদী বিবরণগুলির ধরতাই এই সব কাহিনীগুলোতে শোনা যায়। ‘জনগণ’ আদতে ধর্মনিরপেক্ষ। ওই একই সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে লক্ষ করা যায়,
রাইফেল, বন্দুক, টাঙ্গি, কাটারি ও বর্শা দ্বারা সশস্ত্র বদমাইসদের দল শক্তিশালী (রাজনৈতিক) নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট। জনগণ কিই-বা করতে পারত? শান্তি ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষরা বসবাস করতে চেয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত বদমাইসরা তাদের মনে বিষ ছড়াতে সক্ষম হয়।
আপাতদৃষ্টিতে অন্যরকম মনে হলেও, ‘বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া’র ধাঁচে হিংসার বিশেষণও এই জাতীয় ব্যাখ্যা থেকে খুব একটা কিছু আলাদা নয়। সেই বিশ্লেষণে বিশ্বহিন্দু পরিষদ বা বদমাইসদের কার্যকলাপ বা স্থানীয় প্রশাসকদের কর্তব্যে অবহেলা ততটা গুরুত্ব পায় না। সেই বিশ্লেষণে আলোচিত হয় অন্য নানা বিষয়: রাজনীতি কীভাবে ‘অপরাধদুষ্ট’ হচ্ছে, প্রশাসনসহ ভারতীয় জনজীবনের সাম্প্রদায়িক হবার প্রবণতা, অথবা ‘পিছিয়ে পড়া জাতগুলোর উত্থান’, নতুন ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর অভ্যুদয়, ইউনিয়নবাজি, শ্রমিক অসন্তোষ ইত্যাদির মতো নানা দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ধারা। ভাগলপুরের দাঙ্গা প্রসঙ্গে পি. ইউ. ডি. আর,-এর সতর্ক ও বিস্তৃত প্রতিবেদনের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। হিংসার সূত্রপাতের পারিপার্শ্বিক জটিলতা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনের বিস্তৃত অথচ কিছুটা বিভ্রান্তিকর বয়ান হল,
দাঙ্গার দায় বদমাইসদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সাধারণ একটি সরলীকরণ। আমরা মনে করি যে বদমাইস, পুলিশ, প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, প্রভুত্বকামী উচ্চবর্গ ও অর্থনীতির সম্পর্কের যোগফলকে দায়ী করাটা অনেক বেশি সঠিক। একটি বিশেষ ক্ষণে এই উপাদানগুলির একটি বা সব কটিই এমনকি কিছু কিছু স্থানীয় সাধারণ মানুষও দাঙ্গার অনুঘটক রূপে কাজ করে থাকে।১৪
প্রায়শ দীর্ঘস্থায়ী জটিল ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বক্তব্যগুলিতে সাধারণ মানুষ ও তার দায়দায়িত্বের কথা বাদ পড়ে যায়। সেইগুলি পর্যবসিত হয় আলোচ্য জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের অপরিহার্য এবং অপরিবর্তনীয় (ধর্মনিরপেক্ষ) চরিত্র সম্পর্কিত মন্তব্য সমূহে। ‘অর্থনৈতিক মাত্রাই’ এইসব ক্ষেত্রে সবকিছুর মূলসূত্র হিসাবে প্রাধান্য পায়। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের কারণ বিশ্লেষণে অগ্রণী গবেষক আসগার আলি ইঞ্জিনিয়ারের রচনার দুটি উদ্ধৃতি বিষয়টিকে আরও প্রাঞ্জল করতে সাহায্য করবে,
জব্বলপুর ১৯৬১: একটি হিন্দু মেয়েকে ফুসলিয়ে নিয়ে মুসলিম যুবকের বিয়ে করাটা আপাত কারণ ছিল। এর ফলে দুই সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংস্কারগুলো জোরদার হলেও প্রকৃত কারণ অন্যত্র নিহিত ছিল। মুসলিম যুবকটি স্থানীয় একজন বিশেষ সম্পন্ন বিড়ি ব্যবসায়ীর ছেলে এবং ব্যবসায়ীটি ধীরে ধীরে স্থানীয় বিড়ি শিল্পের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করছিলেন। এই উন্নতির দরুন তাঁর প্রতিযোগীদের তাঁর উপর বিদ্বেষ ছিল। এই বিষয় খুব তাৎপর্যপূর্ণ যে, ওই দাঙ্গায় মুসলিম মালিকানার অধীন বিড়ি শিল্পগুলি বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভিওয়াণ্ডি ১৯৭০: বিদ্যুৎচালিত তাঁত শিল্পের বর্ধিষ্ণু কেন্দ্র হল (ভিওয়াণ্ডি)। বেশ কিছু মুসলিম পরিবার কিছু তাঁতের মালিক এবং বাদ বাকিরা এই শিল্পে তাঁতি হিসাবে নিয়োজিত।…আবার, বম্বে-আগ্রা জাতীয় সড়কের উপর অবস্থিত বলে চলাচলকারী ট্রাকগুলি থেকে বড় পরিমাণ রাজস্ব আদায় হিসাবে ভিওয়াণ্ডিতে সংগৃহীত হয়। এই পৌরসভার উপার্জনের অঙ্ক তাই বেশ বলার মতো। ফলে স্থানীয় পৌর রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পৌরসভায় নিয়ন্ত্রণ রাখবার জন্য বিভিন্ন দল ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা লেগে আছে। তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত বর্ধিষ্ণু মুসলিমদের একটি গোষ্ঠী রাজনৈতিক উচ্চাশা পোষণ করতে থাকে এবং কায়েমী নেতৃত্বের প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠে। এলাকায় সাম্প্রদায়িক অসন্তাষ বেড়ে যায়।১৫
এই গোত্রের কিছু কিছু কট্টর ব্যাখায়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসকে জমি ও মুনাফার লড়াইয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলেছে। ভাগলপুরে ‘সাম্প্রদায়িকতার অর্থনীতি’ প্রসঙ্গে একজন সাংবাদিক মন্তব্য করেছেন:
আমাদের সভ্য সমাজের কুৎসিত রূপের প্রকাশ হিসাবে ভাগলপুরের দাঙ্গাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করাটা অতি সরলীকরণ হবে। বরং আমাদের নজর দিতে হবে অন্য দিকেও—যেমন ধ্বসে যাওয়া অর্থনীতি, মুমূর্ষু শিল্প, অথবা এই ঘটনার ইন্ধনস্বরূপ এলাকার ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক কৃষি কাঠামো।
