প্রায়শই আমরা যে বিবরণী সংগ্রহ করেছি সেইগুলি যেন আগেভাগে কোনও কিছুকে বাতিল করার জন্য সাজানো কাহিনী। কোনও না কোনও বিশেষ ‘তত্ত্ব’ বা ঘটনার কোনও কোনও ব্যাখ্যাকে নাকচ করার জন্য যেন এই বিবৃতিগুলিকে বানিয়ে তোলা হয়েছিল। ‘হিন্দুদের’ বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তারা ভাগলপুর শহরে সশস্ত্র মিছিল বের করেছিল এবং অত্যন্ত প্ররোচনামূলক কৌশল অবলম্বন করেছিল। ২৪ অক্টেবরে হিংসার সূচনা এর থেকেই হয়। অথচ তাঁদের মতে, মিছিলটি অন্যান্য সাধারণ ধর্মীয় শোভাযাত্রার মতোই ছিল এবং মিছিল যাবার পথে অসংখ্য মহিলা ও শিশু বাজনা বাজিয়ে ধর্মীয় সংগীত গাইতে গাইতে যোগ দিয়েছিল। ২৪ অক্টোবরের অনেক আগে থেকে একটা ‘দাঙ্গা’ বাঁধাবার প্রস্তুতি ‘মুসলিমরা’ নিচ্ছিল, এইরকম একটা অভিযোগ স্থানীয় ‘প্রশাসন’ ও অন্যান্যরা করে থাকে। অথচ গোটা জেলা জুড়ে মুসলিমরা প্রায় একবাক্যে বলেছে যে তাদের সঙ্গে হিন্দুদের কখনও কোনও বিবাদ ছিল না, দাঙ্গা হবার কোনও আশঙ্কা দেখা দেয়নি। জেলায় হিন্দু এবং মুসলিমদের মধ্যে বরাবর সম্প্রীতি ছিল। এমনকি ‘১৯৪৭-৪৮’ সালেও যখন সারা উত্তর ভারত জ্বলছিল, তখন ভাগলপুরে বড় জোর নামমাত্র ঝামেলা হয়েছিল।
এমন কি যে সব ক্ষেত্রে গোষ্ঠী বা সমষ্টির কাছে আশু আত্মরক্ষা করা সমস্যা ছিল না, সেইসব ক্ষেত্রেও কোনও একটা আদর্শ বা মূল্যবোধ বাঁচানোর তাগিদ অনুভূত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ নগরবাসী পেশাদার বা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নিজেদের বা শহর অঞ্চলের সুনাম বজায় রাখার তাগিদ বা ভবিষ্যতে হিন্দু ও মুসলিমদের মিলে মিশে বসবাস করার সম্ভাবনা জিইয়ে রাখার ইচ্ছার কথা বলা যেতে পারে। এর ফলে ‘গতস্য শোচনা নাস্তি’-র মতো চিন্তাকে অনেকে সঠিক মনে করেছিলেন। হয়তো সংঘর্ষের দায় ‘বহিরাগতদের’ উপর চাপিয়ে দেবার সোচ্চার চেষ্টার পেছনে এইরকম কোনও ভাবনা কাজ করে থাকবে। দায়ী বহিরাগত অনেক ধরনের হতে পারে, কোথাও বা পাটনার বা দিল্লির রাজনৈতিক নেতা, কোথাও বা ‘সমাজ বিরোধীদের দল’ বা মেরুদণ্ডহীন দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসন। ‘দাঙ্গা’ বাঁধানোর পেছনে সমাজবিরোধীদের উশ্কানি ও ভূমিকার তত্ত্ব বেশ চালু। এইটে বলা হয়েছে যে ভাগলপুর শহরের উত্তরে ও জেলার পশ্চিম থেকে পুবে প্রবাহিত গঙ্গা নদীর ওপার থেকে দলে দলে ‘অপরাধপ্রবণ জাতেরা’ শহরে ও ‘দাঙ্গা’ অধ্যুষিত অঞ্চলে ঢুকে পড়ে। ঔপনিবেশিক আমলে এইসব জাতদের গায়ে ‘অপরাধীর’ তকমা সেঁটে দেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিক সময়েও আবার এরাই ভাগলপুরে আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে থাকে। তাই ১৯৮৯ সালে ‘সমাজবিরোধীরা’ এইসব ‘বহিরাগতদের’ খুশিমতো ব্যবহার করে সংঘর্ষ শুরু করে দেয়।
এই ধরনের ঘটনার ইতিহাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের অসুবিধা একটি মাত্র দিক। কীভাবে এই অভিজ্ঞতাকে লিপিবদ্ধ করতে হবে, সেটাও কম সমস্যাসঙ্কুল নয়, একথা আগে একবার বলা হয়েছে। লিখতে বসলে রোমাঞ্চকর বর্ণনা লেখার ঝোঁক চলে আসে। অতি নাটকীয় হয়ে যাবার স্বাভাবিক সম্ভাবনা থেকে যায়। ফলে এই ধরনের সংঘর্ষ ও তার ফলাফলকে অস্বাভাবিক, কোনও না কোনও বিকৃতি বলে মনে করার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা কার্যকর হয়ে ওঠে। অপরপক্ষে আরেকটি বিপদের আশঙ্কা থাকে। কেতাবি আলোচনার তাপে অত্যন্ত জঘন্য বিচ্যুতিও স্বাভাবিক ভদ্রতার রূপ পেতে পারে এবং যথারীতি বৈশিষ্ট্যবিহীন হয়ে ওঠে। এটাও দেখানো যায়, কী করে কেতাবি আলোচনা হিংসার ক্ষণগুলোকে ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘বিকৃতির’ উদাহরণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে।
ভারতে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের আলোচনায় ‘হিন্দুদের’ অত্যাচারের বিবৃতির পাশাপাশি ‘মুসলিম’ বা ‘শিখদের’ অত্যাচারের বর্ণনাও রাখা হয়; ভারসাম্য রাখাটা যে জরুরি। আমাদের ভাগলপুর যাত্রার কয়েক সপ্তাহ পরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ধ্বংসপ্রাপ্ত বহু মুসলিম ধর্মীয় স্থানগুলির সঙ্গে কতকগুলি হিন্দু মন্দিরকেও পুনর্গঠিত করা হবে। ভাগলপুরের সংঘর্ষ প্রসঙ্গে মার্চ ১৯৯০ সালে জাতীয় দূরদর্শনে প্রদর্শিত ও নলিনী সিং-এর মতো উদ্যোগী ও স্বাধীনচেতা পরিচালককৃত তথ্যচিত্রটিতে জামালপুরের পাশাপাশি লোগাঁই গ্রামটিকে একসঙ্গে দেখানো হয়। প্রথমটি ‘দাঙ্গায়’ আক্রান্ত হিন্দুগ্রাম, দ্বিতীয়টিতে মুসলিমদের জঘন্যভাবে হত্যা করা হয়। বোঝানো হয় যে, আক্রমণের তীব্রতা ও হতাহতের সংখ্যা যেন দুটি ক্ষেত্রে সমগোত্রীয়। অথচ বিশ্বস্ততম সূত্র অনুযায়ী, জামালপুরে সাতজন মারা যায় ও ৭০টি বাড়িতে আংশিকভাবে আগুন ধরানো হয় ও লুঠ করা হয়। আর লোগাঁইতে ১১৫ জন নিহত হন এবং গোটা মুসলিম বস্তি লুঠ করে, পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।১২
‘দুই পক্ষকেই’ তুলে ধরা, দুই পক্ষের কার্যকলাপকে লিপিবদ্ধ করার আপাত উদারনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে প্রায়শই তাল মিলিয়ে চলে ‘বহিরাগত’ শক্তি ও ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ খুঁজে বার করার জন্য সমাজবিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা। এই জাতীয় অস্বাভাবিক হিংস্র কার্যকলাপের নেপথ্যে তাদেরকেই খোঁজা হয়। ভাগলপুরের ক্ষেত্রেও সাংবাদিক ও অন্যান্য তদন্তকারী দলেরা দায়ী করেছেন ‘সমাজ বিরোধী’, স্থানীয় প্রশাসন, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও অন্যান্য জঙ্গি হিন্দু সংগঠনগুলির বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারকে। ১৯ নভেম্বরের একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে দেখেছি,
