দলটি নেহাৎ ছোট ছিল না। এবং আটদিনের সফরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তথ্য সংগ্রহের পেছনে সময় দেওয়া হয়েছিল। তবুও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। যে সব লোকেদের সঙ্গে আমরা ভাগলপুরে কথা বলেছি তাঁরা অধিকাংশই মুসলমান। ‘দাঙ্গার’ প্রথম ভুক্তভোগী তাঁরাই, তাঁরাই রিলিফ ক্যাম্পের বাসিন্দা। তাঁরা কথা বলছিলেন, হয়তো বলবার তাগিদও অনুভব করেছিলেন। যে সব এলাকার অবস্থা খারাপ ছিল, সেই সব অঞ্চলের হিন্দুরা সব সময় সরাসরি বিরোধিতা না করলেও আমাদের প্রসঙ্গে ঠাণ্ডা ও চুপচাপ ছিলেন। যে সব হিন্দুদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি তারা একটি ছোট গোষ্ঠী: কিছু মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী, রাষ্ট্রনৈতিক কর্মী, পেশাদার ও সরকারি কর্মচারী। ঘটনা সম্পর্কে কোনও না কোনও নির্দিষ্ট মতামত বা ‘তত্ত্বে’ এরা বিশ্বাসী ছিলেন।
আরও সমস্যা ছিল। ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কি কি প্রশ্ন কীভাবে করব? আমাদের প্রশ্নের ধরনগুলি এমন ছিল যে, তার মধ্যে যেন একটা বিশেষ উত্তরের প্রত্যাশা লুকিয়ে আছে। আর আমরা সেই ধরনের বিশেষ উত্তরই পেয়েছি, যা আমরা শুনতে চাইছিলাম। আমি এ বিষয়ে পরে আবার আলোচনা করব। কিন্তু কাজে নেমে প্রথম অসুবিধা হল, বর্বরতার শিকার মানুষগুলিকে কীভাবে প্রশ্ন করা যায়? হয়তো ‘দাঙ্গার’ কোনও পরিবারের কেবল বাবা ও ছেলে, অথবা মা ও ছোট ছোট চারটি শিশু বেঁচে গিয়েছিল। একজন ছিটকে পড়েছিল বা কোনওভাবে মাঠে লুকিয়ে পড়ে, সেখান থেকে তারা দেখেছে যে বয়স্ক ও যুবকদের, স্ত্রী ও পুরুষদের—যাকেই গ্রামের মুসলিম বসতিতে পাওয়া গেছে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এই রকম সন্ত্রাসের ভুক্তভোগী মানুষের কাছে তাঁরা কি দেখেছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা শুনতে চাইব কীভাবে?
তবুও ‘অনুসন্ধানকারীরা’ প্রশ্ন করতে বাধ্য। কোনও কোনও সময় দাঙ্গার ভুক্তভোগীরা অথবা বেঁচে ফিরে আসা মানুষেরা বা আশেপাশে দাড়িয়ে থাকা লোকেরা, জিজ্ঞাসা করার আগেই কথা বলতে শুরু করতেন। কারণ তাদের হয়তো এর মধ্যেই অনেকবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছে; অথবা তাঁরা তাঁদের দুর্ভোগের প্রকাশ্য বিবরণ দেবার প্রয়োজন বোধ করেছিলেন। কিন্তু এই বিবরণগুলিও ছকে বাঁধা। মনে হত বিবৃতিগুলো প্রথাসিদ্ধ, ‘মুসলিম’, ‘যাদব’ বা ‘হিন্দু’, যে কোনও গোটা একটি গোষ্ঠীর তরফে তুলে ধরা একটি সমষ্টিগত স্মৃতি বা প্রতিবেদন। ক্ষতিগ্রস্ত মহল্লা বা গ্রামের কোনও একটি প্রধান জায়গায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হত, অনেক লোক সেখানে জড়ো হত এবং ‘বয়স্ক’ ও ‘শিক্ষিত’ ব্যক্তিরা আমাদের স্থানীয় ঘটনাবলীর বিবরণ দিতেন। সেটা নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হত। এটাই ছিল সাধারণ পদ্ধতি।
এমন কী যে সব ক্ষেত্রে মেয়েরা, তরুণরা অথবা এমন কি শিশুরা আলাদাভাবে কথা বলেছে এবং তাদের বিভিন্ন বিবৃতিতে গুরুত্ব ও ঝোঁকের তারতম্য ধরা পড়েছে, সেই সব বিবরণও যৌথ বয়ানের অঙ্গে পরিণত হয়েছে। ঘটনার সাধারণ রূপরেখা যেন প্রত্যেকের কাছে একইরকম ছিল, তাদের আগ্রহগুলিও ছিল এক জাতীয়। নিজেদের গোষ্ঠীর দুর্ভোগের কাহিনী, নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণের সমস্যা, দুর্দিনে বন্ধুদের চিনে নেবার তাগিদ, বিশেষত এই প্রসঙ্গে নানা ধর্মীয় সংগঠন এবং জায়গা বিশেষে, বামপন্থীদের প্রভাব সাপেক্ষে, বামপন্থী সংগঠন ও কর্মীদের কথা, বার বার শোনা গেছে।
হিংসাত্মক ঘটনা শুরু হবার তিন মাস পরে পি. ইউ. ডি. আর.-এর দলটি ভাগলপুরে গিয়েছিল। এটা খুবই সম্ভব যে সমষ্টিগত বিবরণগুলি এই সময়ের মধ্যে প্রথানুগ হয়ে পড়েছিল। আমি অবশ্য নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, বিবৃত ঘটনা ঘটার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই স্মৃতি একটি গতে বাঁধা হয়ে যায়। এর পেছনে কাজ করেছে স্থানীয় গোষ্ঠীর জীবনচর্চা, অতীত সংঘর্ষের ইতিহাস এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক। অবশ্য আর একটি উপাদানও সক্রিয় ছিল। এই জাতীয় প্রকাশ্য বয়ানের অন্যতর উদ্দেশ্য, রাষ্ট্র ও তার প্রতিনিধিদের সম্পর্কে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করা।
এই জাতীয় ব্যাপক হিংস্র কার্যকলাপ সমাজে সুবিধাভোগী শ্রেণী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজমান বিভাজনকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। আবার এর ফলে গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে সংহত হয়; সন্দেহভাজন সমূহগুলি ‘সাধারণের’ অংশে পরিণত হয়। গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত গ্রামের মানুষ, সদ্য তৈরি রিলিফ ক্যাম্পগুলির অজানা লোক, এমন কী ডাক্তার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মতো উচ্চবর্গের ব্যক্তিরা অর্থাৎ খবর নেবার সব রকমের লোকেরা কোনও না কোনও সমূহের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েন। ভুক্তভোগীদের চোখে, ‘তদন্তকারী’ একজন ‘প্রভাবশালী ব্যক্তি’, তার কাছে ত্রাণ, অনুগ্রহ বা বিচারের জন্য আবেদন জানানো যায়।
ফলে, ভাগলপুরের লোকেদের সঙ্গে আমাদের কথোপকথন অন্য খাতে বয়। সম্পত্তিহানি, আঘাত ও মৃত্যুর খুঁটিনাটি বর্ণনায় বেশি সময় যায় অথচ এইগুলি আমাদের তদন্তের প্রধান উপজীব্য বলে মনে করা হয়নি। আমাদের বার বার আগ বাড়িয়ে অনুরোধ করা হয়েছে স্বচক্ষে দেখে আসতে কীভাবে একটি বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে, বাড়ির সব বাসিন্দাদের নামগুলি লিখে নিতে বলা হয়েছে। আমাদের বলা হয়েছে এফ. আই. আর. নথিবদ্ধ করতে কারণ পুলিশ সেইগুলি লিপিবদ্ধ করেনি বা করতে চায়নি। তাদের আশা এই যে আমরা এইগুলো নথিভুক্ত করতে সাহায্য করব। বেশ কিছু সাক্ষী জানিয়েছেন, ‘আমরা সব সময় ভয়ে দিন কাটাচ্ছি। কেউ সাক্ষ্য নিতে আসার আগেই হয়তো খুন হয়ে যেতে পারি।’ কোনও কোনও জায়গায় আবার এই রকম ছোট্ট জবাব শোনা গেছে, ‘আমরা কিছু জানি না, আমরা এখানে ছিলাম না।’
