‘দাঙ্গার’ মাত্রার পরিপ্রেক্ষিতে এবং তারই সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধাতে ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিলুপ্ত করাতে স্থানীয় শাসকদলের নষ্টামির শেষ ছিল না। ফলে এই ঘটনার ‘তথ্যপঞ্জী’ সাজানো মুশকিল। ঐতিহাসিকের চোখে যেগুলি গল্পের ‘নাটবল্টু’ হতে পারত, সেইগুলি খুঁজে পাওয়া ভার হয়ে ওঠে। নিদেনপক্ষে এক হাজার লোক এই ঘটনায় খুন হয়েছিল। এঁদের মধ্যে বেশির ভাগই মুসলমান। কিন্তু হতাহতের সংখ্যা নিয়ে মতভেদের শেষ নেই।১০ ‘দাঙ্গার প্রথম দিনগুলিতে ভাগলপুর ও তার সন্নিহিত এলাকায় নানা জায়গায় বার বার ট্রেন থামানো হয়। এইসব ট্রেন থেকে মুসলমান যাত্রীদের টেনে নামিয়ে শেষ করে দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ ঠিকমতো জানে না যে এইভাবে কতজনকে মারা হয়। এমনকী হিন্দু সহযাত্রীরা এই রকম ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেও তাদের কামরা থেকে ঠিক কতজনকে টেনে নামানো হয়েছে, তার কোনও হিসাব দিতে পারে না। শহর ও গ্রামাঞ্চলে বড় বড় হামলায় বৃদ্ধ, শিশু বা মেয়েরা কেউই রেহাই পায়নি। নারী লুণ্ঠন ও ধর্ষণ যে ব্যাপক হারে হয়েছে এই কথাও অনেকে বলেছেন। কিন্তু বেঁচে থাকা হতভাগ্যরা কেউই ধর্ষণ সম্পর্কে কিছু বলতে চায়নি। ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে ভাগলপুরে প্রেরিত পি. ইউ. ডি. আর-এর একটি তদন্তকারী দল ধর্ষণ সম্পর্কিত যে পাঁচটি ঘটনার উল্লেখ করেছে, সেইগুলির সূত্র মুসলমান মহিলা সংবাদদাতাদের শোনা কথা মাত্র।
প্রশ্নাতীতভাবে এইটুকু বলা যায় যে ১৯৬৪ সালের ‘দাঙ্গা’ বা আরও অনেক পূর্বতন ‘দাঙ্গার’ লীলাক্ষেত্ৰ ভাগলপুরের মতো জেলাতেও হামলার এইরকম বিস্তৃতি ও হিংস্র রূপ নজিরহীন। ১৯৮৯ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে হিংসার ভয়ঙ্কর দিনগুলিতে প্রায় ৪০,০০০ মতো লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে তড়িঘড়ি করে বানিয়ে তোলা রিলিফ ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্যাপকভাবে সম্পত্তিহানি ও লুঠতরাজ চলতেই থাকে। সংখ্যালঘু মুসলমানরা এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে সংঘর্ষের তিন মাস পরেও তারা ঘরে ফিরতে গররাজি ছিলেন। ১৯৯০-এর জানুয়ারির শেষেও প্রায় দশ হাজার মানুষ ‘রিলিফ ক্যাম্পগুলিতে’ থাকছিলেন। তাছাড়াও ভাগলপুর জেলার মধ্যে ও বাইরে আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবদের ‘নিরাপদ’ আশ্রয়ে অনেক মানুষ বাস করছিলেন। এই সময়ে অনেক মুসলিম চাইছিলেন যে সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনী তাদের গ্রামে ও মহল্লায় পাকাপাকিভাবে মোতায়েন থাকুক। তাঁদের কাছে নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য উপায় ছিল ওইরকম কোনও বাহিনী। এই জন্য কেউ কেউ সরকারের কাছ থেকে অস্ত্রও দাবি করছিলেন। গুজবের সীমা ছিল না, লুঠতরাজ ও হামলাও বিক্ষিপ্তভাবে ঘটছিল। মার্চ ১৯৯০ সালেও এরকম কথা শোনা যায়।
এই রকম একটা ঘটনার ইতিহাস আমরা কীভাবে লিখব? বহু প্রজন্ম ধরে, ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা যে সব সরকারি বর্ণনাকে অনেক বেশি ‘নির্ভরযোগ্য’ ও মূল্যবান সূত্র বলে মনে করেন, সেইসব বিবরণের অধিকাংশই ভাগলপুরের সরকারি দপ্তরগুলো থেকে বেপাত্তা হয়ে গেছে। ভাগলপুরে তদন্তকার্যে নিয়োজিত নানা স্বতন্ত্র অনুসন্ধানকারী দলগুলিও ঠিক একইভাবে সরকারি বিবরণ পেতে আগ্রহী ছিল কারণ তাহলে আশা থাকে যে নানা বিভ্রান্তিকর আখ্যানের মধ্যে থেকেও ‘একটা সামগ্রিক ছবি’ গড়ে তোলা যাবে।১১ কিন্তু এইরকম কেন্দ্রাভিমুখী বয়ান অধিকাংশই নষ্ট করে দেওয়া হয়। ‘দাঙ্গার’ প্রথম পর্যায়ে, চরম সংকটের দিনগুলির ক্ষেত্রে, এই নীতি আরও বেশি করে প্রযোজ্য হয়েছিল। দু-সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান চালানোর পরে ভাগলপুরের ধ্বংসলীলা ও তার ফলাফল সম্পর্কে ১১ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৯০-এর সানডে মেল-এ লেখা হয়েছে:
ওই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, বিশেষত যেগুলি জেলাশাসক (ডি. এম.) ও পুলিশ অধিকর্তার (এস. পি.) হেফাজতে ছিল, নিখোঁজ…
…সাক্ষ্য প্রমাণাদি থেকে এইরকম ধারণাই জোরদার হয়ে ওঠে যে (ডি. এম.) কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ-এ রক্ষিত লগবুকটি সম্ভবত নষ্ট করে দিয়েছেন, অথচ সেটাতে সেই ভয়ঙ্কর সপ্তাহে জরুরি সাহায্যের জন্য অসংখ্য আর্তি লিপিবদ্ধ ছিল। আশ্চর্যের কথা যে অফিসে রাখা নতুন লগবুকটিতে ওই সব ঘটনার কোনও উল্লেখই নেই…
…তদীনন্তন এস. পি. ইতিমধ্যেই কুখ্যাত হয়ে উঠেছেন এবং পরবর্তী বদলি অফিসারের কাজে লাগবার মতো কোনও সূত্রই রেখে যাননি…পাটনা হাইকোর্ট নোটিশ দিয়েছিল বলেই তাঁর নথিতে চান্দেরি হত্যাকাণ্ডের (গ্রামাঞ্চলের মর্মান্তিক ঘটনাগুলির অন্যতম) একটি মাত্র যৌথ প্রতিবেদন আছে। এমন কি ২৪ অক্টোবর (ভাগলপুর শহরে) তাতারপুর চৌকের ঘটনাটি পলতেয় আগুন ধরায় অথচ তার ওপর ডি, এম. বা এস. পি.-র যৌথ প্রতিবেদনটিরও কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি।
অবিশ্বাস্য শোনালেও এটাই সত্যি যে, ঘটনাবলি সম্পর্কে ডি. এম. এবং এস. পি.-র কোথাওই কোনও বিবৃতি বা এজাহার পাওয়া যায়নি।
নথি সরিয়ে ফেলা বা নষ্ট করার মতো ঘটনা অবশ্য নজিরবিহীন নয়। ১৯৩৭ সালের পরে ইংরেজ শাসকরা ব্যাপকভাবে এই ধরনের কাজ করেছিল। এ ব্যাপারেও সন্দেহ নেই যে এই রকমের অসংখ্য উদাহরণ স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের ভারতে পাওয়া যাবে। কিন্তু যেটা কমই দেখা গেছে তা হল এই রকম ঘটনা ঘটলে ‘তথ্য’ নষ্ট করার পাশাপাশি যেন সুসংগঠিত ভাবে, সরকারি ও বেসরকারি সব দিক থেকে নতুন প্রমাণপঞ্জী তৈরি করা। হিংসাত্মক ঘটনার প্রেক্ষিতে ‘প্রমাণ’ সংগ্রহ আবশ্যক হয়ে ওঠে; যে সব প্রক্রিয়া বা দ্বন্দ্ব লুকিয়ে থাকে, যেগুলিকে আমরা সাধারণত এড়িয়ে চলি, সেই সবগুলি খোলাখুলিভাবে সামনে আসে। আবার হিংসা ‘প্রমাণপঞ্জী’কে নষ্টও করে দেয়। বিশেষত নষ্ট করার পদ্ধতিটা এতটাই ব্যাপক যে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানে ‘তথ্য’ হিসাবে সংগৃহীত ও গ্রাহ্য হবার কৃৎ-কৌশলটা যেন বানচাল হয়ে পড়ে। ভাগলপুরে পি. ইউ. ডি. আর.-এর কাজের প্রসঙ্গে বিষয়টা আলোচনা করা যেতে পারে।
