ইতিহাসের মতো সাহিত্য বা চলচ্চিত্রেও ভারতীয় শিল্পীরা স্বাধীনতা সংগ্রামের জয়গান যত করেছেন, সে তুলনায় দেশভাগের বেদনা আদৌ মনে করিয়ে দেননি। অল্প কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। পঞ্জাবি, উর্দু আর হিন্দিতে ১৯৪৬-৪৭-এর দেশ ভাগ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে লেখাপত্র আছে ঠিকই। কিন্তু প্রথমদিকের ‘পার্টিশান সাহিত্য’—সাদাত হাসান মন্টো-র মর্মান্তিক গল্পগুলি যার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন—প্রায় সবই পঞ্জাবের দাঙ্গাবিধ্বস্ত কয়েকটি জেলায় সীমিত।৭ পরবর্তীকালে উত্তর ভারতে এ-বিষয়ে যা লেখা হয়েছে, তা ওই ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী আলোচনার গণ্ডির ভেতরেই পড়ে, যেখানে দেশভাগ হল ইতিহাসের বিভ্রান্তি, অদ্ভুত এক ঘটনা, যার কোনও ব্যাখ্যা নেই। এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বোধহয় রাহী মাসুম রাজা-র আধা গাঁও (১৯৬৬)।
দেশভাগের পরবর্তীকালের বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কোনওভাবেই কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দেখা দেয়নি। সাম্প্রতিক একটা গবেষণায় বলা হয়েছে যে ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ যেভাবে বাঙালি সাহিত্যিককে নাড়া দিয়েছিল, ১৯৪৭-এর দেশভাগ গোটা সমাজকে ওলটপালট করে দেওয়া সত্ত্বেও কিন্তু মোটেই ১৯৫০-এর দশক বা তার পরবর্তীকালের সাহিত্যে সেভাবে রেখাপাত করেনি।৮
সর্বস্বান্ত উদ্বাস্তুদের বেদনা, হতাশা, স্বপ্ন নিয়ে ঋত্বিক ঘটক একাধিক ছবি করেছেন— কোমল গান্ধার(১৯৫৯), মেঘে ঢাকা তারা(১৯৬০), সুবর্ণরেখা(১৯৬২)। কিন্তু ঋত্বিক নিতান্তই ব্যতিক্রম শিল্পী হিসেবে তাঁর আশ্চর্য ক্ষমতার জন্যই শুধু নয়—ছবির বিষয়ের দিক থেকেও বাংলা কিংবা হিন্দি-উর্দু ছবির বিশাল বাণিজ্যিক জগতে, এমনকী ফিলম্স ডিভিসনের সরকারি ডকুমেন্টারিতেও, দেশভাগের ইতিহাস কিংবা পরিণাম নিয়ে ঋত্বিকের মতো আর কেউই প্রায় কোনও নজর দেননি বললে চলে।
হিন্দি-উর্দু চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যে উদাহরণটি আলাদা করে উল্লেখ করা প্রয়োজন সেটি হল এম. এস. সথ্যু-র গরম হাওয়া। ১৯৭০-এর দশকে তৈরি এই আশ্চর্য ছবিটিতে নিপুণভাবে দেখানো হয়েছে সামগ্রিক মত্ততা, ছিন্নমূল মানুষের জীবনের অর্থটাই হারিয়ে যাওয়া, ‘অন্য কোথাও’ হয়তো সে-অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে এই ভেবে বিপন্ন শরণার্থীদের যাত্রা। আরও সম্প্রতিকালে দূরদর্শনে প্রচারিত তমস ধারাবাহিকটির বিশেষ তাৎপর্য এই যে বহু লোকের কাছে তা পৌঁছেছিল। কিন্তু ভীষ্ম কাহানির ১৯৭২ সালে প্রকাশিত উপন্যাসের এই চিত্ররূপটি আসলে পুরনো মোটাদাগের জাতীয়তাবাদী ছকেই ফিরে যায়—এখানে নির্দোষ, বিভ্রান্ত অথচ সাহসী জনগণকে আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়ে বিপথে চালিত করে কিছু রহস্যময় চক্রান্তকারী। দেশভাগ এখানে একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়। মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্ম চিন্তাভাবনার সেখানে কোনও ভূমিকাই নেই। আমরা আগেই দেখেছি, বিদগ্ধ ইতিহাস-রচনার যে জাতীয়তাবাদী ধারা, তাতেও এই একই কাহিনী বলা হয়ে এসেছে।
দেশভাগের ইতিহাস চাপা থাকে কেন, সে-কারণ বের করাও খুব কঠিন নয়। হিন্দু-মুসলিম বিরোধ আজও বাস্তব ঘটনা। বিরোধের ইতিহাস বলতে গিয়ে পুরনো ক্ষত খুঁচিয়ে তোলার বিপদটা তাই অবহেলা করা হলে না। তার ওপর দেশভাগের চরিত্র নিয়ে আমাদের মধ্যে মতৈক্য নেই। একে কীভাবে উপস্থিত করব, কী করে এর দায়িত্ব নেব, তা অমরা জানি না। এই কারণেই জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে, সাংবাদিকতায় অথবা চলচ্চিত্রে দেশভাগ নিয়ে একটা সামগ্রিক বিস্মৃতি তৈরি হয়েছে। সচেতনভাবে হোক বা না-হোক, দেশভাগ একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবেই রূপায়িত হয়েছে। ১৯৪৭-এর ১৪ অগাই যেদিন পাকিস্তানের জন্ম হল—সেটি একটি অনটন, ‘ভুল’, যার জন্য দায়ী আমরা নই, অন্য কেউ।
স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিয়ে আলোচনাও মোটামুটি একই ধারায় বয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে কিছু লেখাপত্র থেকে এর উদাহরণ দেব। এই আলোচনায় একটা বাড়তি সুবিধা হবে। সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে লেখার মধ্যে যে অনির্দিষ্টতা রয়েছে, তথ্য প্রমাণ নিয়ে যে-সব অনিশ্চয়তা সেখানে দেখা দেয়, পুরনো ঘটনার ইতিহাস যাঁরা লেখেন তাঁরা অনেক সময় মনে করেন যে তাঁদের কাজ সে-সব বিপদ থেকে মুক্ত। তা যে সত্যি নয়, সে-কথাটি এই আলোচনার মধ্যে নিয়ে দেখানো যাবে।
সম্প্রতিকালের দাঙ্গার ঘটনা, বিশেষ করে ১৯৮৯-এ ভাগলপুরের ঘটনা নিয়ে এই লেখার পাশাপাশি আমি দেখাতে চেষ্টা করব যে পঞ্চাশ কিংবা একশো বছর আগের ঘটনার সাক্ষ্য প্রমাণ আমরা যে-ভাবে ব্যবহার করে থাকি, একই ঘটনার ওপর একাধিক পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্যকে তুলনা করে তার মধ্যে থেকে একটা নিরপেক্ষ বিবরণ খাড়া করার চেষ্টা করি, সে পদ্ধতি আসলে কতটা গোলমেলে। সাম্প্রতিক ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণী কীভাবে সরকারি ‘সাক্ষ্যপ্রমাণে’ পরিণত হয়, সেই প্রক্রিয়াটাও আমরা খানিকটা দেখতে পাব।
২
সাম্প্রতিক কালের যে কোনও রচনাতে একের পর এক দাঙ্গাকে ১৯৪৭-এর সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
‘চরম বীভৎস’ এই তকমাটা প্রত্যেকটার গায়েই সেঁটে দেওয়া হয়েছে। ১৯৮০-র দশকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের মাত্রার গভীরতা তাই সহজে অনুমের। ১৯৮৯ সালের ভাগলপুরের দাঙ্গা সমগোত্রীয় ভয়ঙ্কর সংঘাত। ১৯৮৯ সালে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে এবারকার সংঘর্ষ আরম্ভ হয়। লুঠতরাজ, আগুন লাগনো, খুন-জখম—সবই শহরে আরম্ভ হয়; এবং চারপাশের গ্রামাঞ্চলে কয়েকদিন ধরে বস্তুত বিনাবাধায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে সামরিক ও অসামরিক বাহিনী অবস্থা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু পরবর্তী অনেক দিন ধরে ভয় ও সন্ত্রাসে বহু লোক দিন গুনছিল।৯
