ঔপনিবেশিক ভারত সম্পর্কে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরের উপযোগী বইগুলির মধ্যে যেটি সম্ভবত শ্রেষ্ঠ, সেই বিপন চন্দ্রের মর্ডান ইন্ডিয়া থেকে এর চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যাবে।
১৫ অগাস্ট ১৯৪৭ ভারতবর্ষ তার মুক্তির প্রথম দিনটির আনন্দ উপভোগ করল। অসংখ্য দেশভক্তের আত্মত্যাগ, শহিদের আত্মবিসর্জন আজ সার্থক হল।…কিন্তু তাও আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বেদনা আর দুঃখ।…স্বাধীনতার সেই মুহূর্তটিতেই ভারত আর পাকিস্তানে বয়ে চলেছিল সাম্প্রদায়িক মত্ততার প্রবাহ, অবর্ণনীয় বীভৎসতায় শেষ হয়ে যাচ্ছিল হাজার হাজার মানুষের জীবন। (পৃ. ৩০৫-৬)
প্রবল শক্তিশালী এক মহৎ সংগ্রাম যেন বিপথগামী হয়ে গেল। তাই ‘বেদনা আর দুঃখ’।
জাতীয় সাফল্যের চরম মুহূর্তের এই যে ট্রাজেডি, গান্ধীজির নিঃসঙ্গ মূর্তিটাই তার প্রতীক। সেই গান্ধীজি যিনি ভারতবর্ষের মানুষকে শুনিয়েছিলেন অহিংসা, সততা, ভালবাসা, সাহস আর পৌরুষের বাণী।…বাকি দেশে যখন উৎসব, গান্ধীজি তখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন হিংসায় বিষিয়ে যাওয়া বাংলায়। অর্থহীন সাম্প্রদায়িক হানাহানির শিকার হয়ে তখনও যারা স্বাধীনতার মূল্য চুকিয়ে যাচ্ছিল, তিনি চেষ্টা করেছিলেন তাদের কিছুটা সান্ত্বনা দেওয়ার। (পৃ. ৩০৬)
মহৎ সংগ্রামটিকে কারা বিপথগামী করল, এখানে অবশ্য তা বলা হয়নি। কিন্তু বই-এর অন্য জায়গা থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে এটা হিন্দু আর মুসলিম সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিক আর বলা বাহুল্য ব্রিটিশদের কাজ। (পৃ. ২৯৬-৭ এবং অন্যত্র) এর ফলেই ঘটল অর্থহীন হানাহানি আর ‘স্বাধীনতার মূল্য’ হিসেবে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু। কিন্তু একটা কথা এড়িয়ে যাওয়া হল এখানে। কারা দিল মূল্য? কাদের স্বাধীনতার জন্য? এই প্রশ্ন না করে বিপন চন্দ্রের পাঠ্যপুস্তকে বলা হচ্ছে জানুয়ারি ১৯৪৮-এ গান্ধীর মৃত্যুর কথা। ‘ঐক্যের সংগ্রামে শহিদ’ হলেন গান্ধীজি। আর জনগণ ‘নিজেদের সামর্থ্য আর মনোবলের ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখে সমাজে ন্যায় আর কল্যাণ প্রতিষ্ঠার কাজে উদ্যোগী হল।’ (পৃ. ৩০৬-৭)।
এখানে ‘গান্ধী’ আর ‘জনগণ’ হয়ে গিয়েছে জাতির অন্তরাত্মার প্রতীক। ‘গান্ধী’ আর ‘জনগণ’ একে অপরের বিকল্প। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনে গান্ধীই জনগণের প্রতীক। আবার গান্ধী যখন আর নেই, তখন জনগণই যেন তাঁর অসম্পূর্ণ কাজ ঘাড়ে তুলে নিল। দেশভাগ, দাঙ্গা, উদ্বাস্তু ইত্যাদি বাধা উপেক্ষা করে তারা ‘ন্যায় আর কল্যাণ’ প্রতিষ্ঠার কাজে নেমে পড়ল।
সুমিত সরকারের পাঠ্যপুস্তকটি৫ আরও উন্নত, স্নাতক আর স্নাতকোত্তর শ্রেণীর উদ্দেশ্য লেখা, তার বিশ্লেষণেও সমালোচনার সুর অনেক বেশি। কিন্তু ভারতীয় জনগণের ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ পথে অগ্রগতি নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত এক। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮-এর জানুয়ারি পর্যন্ত ‘মহাত্মার জীবনের শ্রেষ্ঠ পর্ব’ নিয়ে সুমিত সরকারের বর্ণনা মর্মস্পর্শী। উত্তর ভারতের সর্বত্র যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঝড় বয়ে চলেছে, গান্ধী প্রায় একা হাতে চেষ্টা করেছিলেন সে উন্মত্ততা প্রশমন করতে। তবুও সুমিত সরকারের মন্তব্য, এই ‘বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা’ ব্যর্থ হতে বাধ্য। ‘অবশ্য এমন কথা বলা যায়’, তিনি বলছেন, ‘যে সাম্রাজ্যবাদ আর তার ভারতীয় সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ জঙ্গি গণআন্দোলনই একমাত্র যথার্থ বিকল্প পথ।’ [পৃ. ৪৩৮] এ-পথ যে তখনও খোলা ছিল, তাই নিয়ে তিনি নিঃসংশয়।
দাঙ্গার বিপর্যয় সত্ত্বেও ১৯৪৬-৪৭-এর শীতেও কিন্তু এই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়নি। অগাস্ট দাঙ্গার পাঁচ মাস পরে ফরাসি বিমান বাহিনীর দমদম বিমানবন্দর ব্যবহার করার বিরুদ্ধে কলকাতার ছাত্ররা ২১ জানুয়ারি ১৯৪৭-এ ‘ভিয়েতনাম থেকে হাত ওঠাও’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় নামে। একই দিনে শুরু হয় কম্যুনিস্ট নেতৃত্বে ট্রামকর্মীদের ধর্মঘট যা বামপন্থীদের ভেতরকার সব দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে ৮৫ দিন পর সফল হয়। [পৃ. ৪৩৮-৩৯]
এখানে সুমিত সরকার ১৯৪৭-এর জানুয়ারির ‘ধর্মঘটের ঢেউ’-এর কথা বলেছেন, যা তখন কলকাতা, কানপুর, করাচি, কোয়েম্বাটোর ইত্যাদি শহরের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার পরেই তাঁর সিদ্ধান্ত: ‘কিন্তু এই ধর্মঘটগুলো সবই ছিল কেবল অর্থনীতির দাবিতে সীমাবদ্ধ। যথেষ্ট প্রভাবশালী এবং দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব ছিল প্রকট।’ [পৃ. ৪৩৯]
ঔপনিবেশিক ভারতের এবং ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসের দুটি শ্রেষ্ঠ পাঠ্যবই থেকে উদ্ধৃতি দিলাম এখানে। দুটি বই-ই মার্কসীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করে লেখা। দেশভাগ এবং স্বাধীনতার ইতিহাস রচনায় জাতীয়তাবাদী আদিকল্পটি কতটা আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে, এই উদ্ধৃতি থেকে সেটাই আরও স্পষ্ট করে দেখানো গেল। ইতিহাস-লেখার এই ধারা বৃহত্তর এক জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার অংশ যা সিনেমা, সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যের মাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। উত্তর ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই হয়তো দেশভাগ। ব্রিটেনের কাছে যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কিংবা ফ্রান্স বা জাপানের কাছে যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আমাদের কাছে দেশভাগের অভিজ্ঞতা ঠিক তেমনই ভয়াবহ এবং যুগান্তকারী। অথচ পশ্চিম ইউরোপে এবং জাপানে প্রথম আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মারকচিহ্ন সর্বত্র রয়েছে। ভারতবর্ষে দেশভাগের কোনও স্মারকচিহ্ন প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। হয়তো এটা তেমন আশ্চর্যের কিছু নয়। কিন্তু বিস্মরণ শুধু এতেই সীমিত নয়।৬
