ভারতীয় সমাজের ভগ্নাংশগুলিকে তথাকথিত জাতীয় সংস্কৃতির মূলধারায় মিশিয়ে দেওয়ার জন্য এই ভাবে প্রবল চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ভগ্নাংশ কখনও সংখ্যালঘু ধর্মীয় কিংবা জাতি-উপজাতি গোষ্ঠী, আবার কখনও সংগঠিত শ্রমিকশ্রেণী, কখনো নারী আন্দোলনের কর্মী—যারাই কোনও না কোনও অর্থে সংখ্যালঘু সংস্কৃতি বা আচার ব্যবহারের প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে, তাদের সকলেরই বিরোধিতা ‘জাতীয়তা-বিরোধী’ বলে রাষ্ট্রের দমননীতির কবলে পড়তে পারে। অন্যদিকে জাতীয় সংস্কৃতির মূল ধারা বলতে কিন্তু সবসময়ই তুলে ধরা হয়েছে হিন্দু ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির অত্যাধুনিক বিলাসদ্রব্যভোগী চেহারাটি। এই মূলধারা আসলে সমাজের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশের জীবনযাত্রা ধ্যানধারণার প্রতিফলন। অথচ তাকেই ঢাক পিটিয়ে জাহির করা হয়েছে জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে। ‘বিবিধের মাঝে মিলন’ আজকের এই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের শ্লোগান নয়। বরং শাসক শ্রেণী ছাড়া অন্য যে-কোনও সংখ্যালঘুর পরিচয়—যা ভিন্ন, ক্ষুদ্র, আঞ্চলিক, স্থানীয় বস্তুত, সবরকমের প্রভেদই রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপজ্জনক, বিজাতীয়।
ভারতের রাজনীতি নিয়ে লিখতে গেলে রাষ্ট্রচালিত এই সাংস্কৃতিক সমীকরণের চেষ্টাটাকে সামনে আনা দরকার। সেই সঙ্গে সামনে আনা দরকার জাতীয়তাবাদ নিয়ে গভীর সামাজিক বিরোধের প্রক্রিয়াটিকে। ভগ্নাংশের সমর্থনে কথা বলার একটা উদ্দেশ্য এই অগভীর সমীকরণ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, জাতীয়তার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় সমাজের আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ রূপরেখা নির্মাণে অগ্রসর হওয়া।
এ-কথা বলতে চাইছি না যে ‘সংখ্যালঘু’—যেসব সংখ্যালঘুর কথা ওপরে বললাম—তাদের প্রতিরোধ সবক্ষেত্রেই, এমনকি বহুলাংশে সচেতনভাবে এই উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় সমাজ নিয়ে যে-ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী বা রাজনৈতিক কর্মী একটু বিস্তৃতভাবে ভাবার চেষ্টা করেন, তিনিই নিশ্চয় একমত হবেন যে আজ আমাদের দেশে যা ঘটে চলেছে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই প্রক্রিয়ায় ধরা পড়ে। ইতিহাস লেখা নিয়েও এখানে বিরোধ আছে। জাতীয়তাবাদের যে সংকীর্ণ সংস্করণের কথা ওপরে বললাম, তা শুধু বিশ্বরাজনীতির সাম্প্রতিক হাওয়াবদল থেকেই যে জোর পাচ্ছে, কিংবা শুধু প্রাচীন ভারতের গৌরব নিয়ে আস্ফালন করাতেই যে তা সীমাবদ্ধ , এমন মোটেই নয়। অত্যন্ত আধুনিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ এক জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনার ধারাও ভারতবর্ষের তথাকথিত স্বাভাবিক ঐক্য এবং শাশ্বত জাতীয়তার এই ধারণাকে পরিপুষ্ট করেছে।
শুধু তাই নয়, ইতিহাস-রচনার এই ধারা রাষ্ট্রকে—যে রাষ্ট্র আজকের ভারতবর্ষে উপস্থিত, সেই বিশেষ রাষ্ট্রকেই—উন্নীত করেছে ইতিহাসের অন্তিম লক্ষ্যে। তাই দেখি, ভারতের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইতিহাস’ বিষয়টা প্রায় সবসময়ই শেষ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে এসে, যেন স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের ইতিহাসের সার্থক পরিসমাপ্তি। তাছাড়া যেসব নিখুঁত দ্বিপদ বিভাজনগুলি আমরা সবাই ব্যবহার করি, তাও আমরা পেয়েছি এই ইতিহাস থেকেই—ধর্মনিরপেক্ষ/ সাম্প্রদায়িক/ জাতীয়/ আঞ্চলিক, প্রগতিশীল/প্রতিক্রিয়াশীল। ঐতিহাসিকরা এই বিভাজনগুলির যথার্থতা নিয়ে অতি সম্প্রতিকালেই প্রথম প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।৩
বামপন্থী, জাতীয়তাবাদী এবং উদারপন্থী ঐতিহাসিকদের বেশ কয়েক দশকের শক্তিশালী ও বিদগ্ধ লেখাপত্র সত্ত্বেও ভারতীয় ইতিহাস-রচনার এই ‘কেন্দ্রীয়’ দৃষ্টিকোণই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত দৃষ্টিকোণ থেকে গেছে। আর সরকারি দপ্তর এবং আদালতের নথিপত্রের মহাফেজখানাই রয়ে গেছে তার সর্বপ্রধান প্রাথমিক তথ্যসূত্র। যে ধারণাগুলি আমাদের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের লক্ষ্যবস্তু—যেমন, ভারত, পাকিস্তান অথবা অন্ধ্রপ্রদেশ, অযোধ্যা অথবা হিন্দু বা মুসলিম সম্প্রদায় অথবা জাতীয়তা, জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা—এগুলি যে সবই সাময়িক এবং পরিবর্তনসাপেক্ষ, তা কিন্তু এই ইতিহাস রচনার ধারায় মোটেই স্বীকৃত নয়।
‘ভারত’ নামক একটি সাময়িক এবং বিশেষ সমষ্টির উপর স্বাভাবিক ও শাশ্বত ঐক্যের মহিমা আরোপ করার ফলে এবং সরকারি মহাফেজকে ইতিহাসের তথ্যের প্রাথমিক আকর বলে মেনে নিয়ে ঐতিহাসিকেরা কিন্তু প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিকেই স্বীকার করে নিয়েছেন। এটা বিশেষ করে ঘটেছে আধুনিক ভারতের ইতিহাসের বেলায়। ভারতের ঐক্য এবং সেই ঐক্যবদ্ধ ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রামই যেহেতু এই ইতিহাসের মূল উপজীব্য, উনিশ শতকের গোড়া থেকেই এর কাহিনী তাই পর্যবসিত হয়েছে ভারতীয় জাতি-রাষ্ট্রের জীবনকাহিনীতে। একই কারণে এই ইতিহাসে দেশভাগের কাহিনী, আর সেইসঙ্গে ১৯৪৬-৪৭ সালের হিন্দু-মুসলিম এবং মুসলিম-শিখ দাঙ্গার কাহিনী, এক রকম প্রায় এড়িয়েই যাওয়া হয়েছে।
এই ছকের ভেতর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস একটা গৌণ কাহিনী। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নাটকের সুবিশাল প্রেক্ষাপটে হিন্দু ‘রাজনীতি’, ‘মুসলিম’ রাজনীতি এবং হিন্দু-মুসলিম সংঘাত নেহাতই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা হিসেবে রূপায়িত হয়েছে। সেখানেও আবার আসল কর্ণধার সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা, যারা কলকাঠি নেড়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত জিইয়ে রাখত। সেই রকম দেশভাগের ইতিহাসও লেখা হয়েছে শুধুই ‘সাম্প্রদায়িকতা’-র ইতিহাস হিসেবে। বলা বাহুল্য, দেশভাগের ইতিহাস কোনও মহৎ সংগ্রামের ইতিহাস নয়। কিন্তু আমাদের লেখাপত্রে তা এমনকী অনির্দিষ্ট, খাপছাড়া, দিশাহীন সংগ্রামের চেহারা নিয়েও হাজির হয় না। তাতে কোনও আত্মত্যাগ বা ক্ষতির কাহিনী নেই, নেই কোনও নতুন পরিচয় কিংবা নতুন সংঘবদ্ধতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, নেই লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল হতভাগ্যের মনে নতুন আকাঙ্ক্ষা, নতুন সংকল্পের উন্মোচন। এ-সব ইতিহাসে শুধুই দেশভাগের ‘সূত্র’ বা ‘কারণ’ খোঁজার রিপোর্ট—কোন কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে, রাজনীতির কোন কোন ভুল চালে কিংবা কোন অপ্রতিরোধ্য সামাজিক-রাজনৈতিক চাপে ওই শোচনীয় ঘটনাটি ঘটল, তারই খতিয়ান। অথচ দেশভাগ নামে মর্মান্তিক ট্রাজেডি ঘটা সত্ত্বেও ভারত-ইতিহাসের মূল পথরেখাটি কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে অপরিবর্তিত থেকে গেল। দেশভাগের ফলে দুটি, পরে তিনটি, জাতি-রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। অথচ ইতিহাসের লেখা পড়লে মনে হয় ভারতবর্ষ যেন চিরদিনই তার একান্ত স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের জোরে সেই ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, অহিংসা সহনশীল পথে অগ্রসর হয়ে চলেছে।
