বিংশ শতকের গোড়ায় ডিকটাফোন নিয়ে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার একশ বছরের বৃদ্ধার কাছ থেকে গীতকথা সংগ্রহ করেছেন, যেমন শুনেছেন তেমন লিখেছেন, সেইমত ছাপিয়েছেন। পরে সমালোচকদের চাপে, ‘গল্পভুক সামান্য শিক্ষিত পাঠকবর্গের’ চাহিদা মেটাতে ঠাকুরদাদার ঝুলির প্রথম সংস্করণ (১৯০৮) পুনর্লিখিত হল, সেই মার্জিত সংস্করণেরই বাজারে কাটতি হল। পুনর্লিখনে মূল গল্প বদলায়নি।১৫৭ কিন্তু অপ্রচলিত শব্দ পালটানো বা ভাষার মার্জিতকরণে দক্ষিণারঞ্জনের কলম সীমাবদ্ধ থাকেনি। কথ্য গল্পের সংহত লেখ্য রূপ দেওয়া হয়েছে, রকমফের ঘটে গেছে গল্প আস্বাদনের তারে।
মনে রাখতে হবে ঠাকুরদাদার ঝুলির গল্প গীতিকথার সংকলন। বিশেষ আয়োজন ও সমাবেশে সমূহের সামনে কথাগুলি বলা হত। আঁতুড়ঘর গল্প বলার অন্যতম জায়গা। আসন্নপ্রসবা জননী যেদিন থেকে আঁতুড়ে যান সেই দিন থেকে গীতকথা-অভিজ্ঞরা প্রতি রাত্রে মজলিশ বসাতেন।
রাত্রি দ্বিপ্রহরে আসর শেষ হত। কথকদের মধ্যে কেউ সম্রান্ত বিধবা, অনেকে কৃষক। ‘রোজের রাত যোগান’ তারা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিত। ষষ্ঠীর দিন ঘটা বেশি হত, সারারাত ধরে পালা বলা চলত। অন্য গায়ক-গায়িকা ‘মূল কথকের’ সঙ্গে যোগ দিত, কথার সঙ্গে সঙ্গে গান চলত। ছেলে, মেয়ে, বুড়ো, আসরে সবাইয়ের আবাধ প্রবেশাধিকার।১৫৮
বৈলক্ষণগুলিও স্পষ্ট। কথকতা মার্গ থেকে জন-অভিমুখী, ব্রাহ্মণের পুথি থেকে প্রাকৃতজনের আসরে তার যাত্রা। লোককথার কথ্য রূপকে দক্ষিণারঞ্জন মার্জনা করেছেন, আঁতুড়ঘর থেকে গল্পকে তুলে আনছেন ব্যক্তি পাঠকদের শহুরে বৈঠকখানায়; কথকতার আখ্যানের যোজনার অভিমুখের বিপরীতে ঠাকুদাদার ঝুলির গল্পের যাত্রা, কথার রওয়ানি হয়ে ওঠে অন্যরকম।
কথকতার নানা গল্প
বর্তমান প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ যথেষ্ট। দীনেশচন্দ্র সেনের সাক্ষ্যানুযায়ী, প্রথম সংস্করণে ‘মালঞ্চমালা’ গল্পটি শুনে হুবহু লেখা হয়েছিল, তাই ওই গল্পটি থেকে একটি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করা হল:
প্রথম পাঠ : ১৯০৮
‘কোটালিনী ছিল ঘরে, কোটালিনী আসিয়া কয়,—কি বারোদিনের আয়ু তারি কাছে। দিব কন্যা আমার,—যুগ জন্ম হবিষ্যি।—মা গেলেও না, ছা গেলেও না! কপাল আমার,—বারোবছরের তিনবছর গেল রোগে, চারবছর গেল শোকে,—আরও যে বচ্ছর আছে তা যদি না যায় ভোগে, তো মেয়ের জন্ম কি? হাঁড়ীর মাছ হাঁড়ীতে জিয়াই, শাখা সিঁদূরের বড়ি খোয়াইতে একবেলা খাই একবেলা না খাই—এক কোলের কন্যা—তাই দিব শিশুপুত্রের কাছে।—সেও পুত্র বাঁচে কি না বাঁচে?—‘কুড়ে বাঁধি, কুঁড়েয় থাকি তার তলেও রাজার হাঁচি!’ রাজাকে গিয়া কও, কন্যা যে আমি দিব না ‘আহা, কিবা আমার পাড়লেন গিয়া ফল, তারি জন্য দেখি আমি কন্যার চক্ষের জল!’ কোটালিনী পোঁটলা পুঁটলী বাঁধিয়া কন্যাকে ডাকে—‘মালঞ্চ লো মালঞ্চ! আয় মা, আমরা এ জনমের মত রাজ্য ছেড়ে যাই।’১৫৯
মার্জিত পাঠ: ১৯০৯
কোটালিনী বলে,—কুঁড়ে বাঁধি কুঁড়েয় আছি। তার তলেও রাজার হাঁছি।: বারো দিনের আয়ু শিশুর কাছে কন্যা দিব? রাজাকে গিয়া বল কন্যা আমি দিব না।১৬০
দুইটিতেই কোটালিনীর আপত্তির কথা অক্ষুণ্ণ আছে, বদলে গেছে শুধু ঢঙ; ব্যঞ্জনের তার হয়ে গেছে পানসে। প্রথম বয়ানে আছে আশা ও আশঙ্কা, বঞ্চনা ও সাধ, রাজার প্রতি ছুঁড়ে দেওয়া ব্যঙ্গ, সংসারে দৈনন্দিন লড়াই, অত্যাচার থেকে মেয়েকে বাঁচাবার জন্য পথে বেরিয়ে পড়বার তাগিদ। রাজার অন্যায় আবদারের বিরুদ্ধে, জোর-জবরদস্তির বিরুদ্ধে এইসব অনুভূতির মিশ্রণে গড়ে উঠেছে কোটালিনীর আপত্তি। মার্জিত পাঠে শব্দ বদলায়, গান বাদ দেওয়া হয়, বলার রওয়ানিকে সংক্ষিপ্ত করা হয় সরাসরি নেতিবাচক বাক্যে; লৌকিক স্বাদের আভাস দেবার জন্য বজায় রাখা হয় একটা প্রবাদ। ফলে কোটালিনীর আপত্তি একমাত্রিক ঘোষণার মতো শোনায়। বাগর্থ যে সম্পৃক্ত, আলাদা। করা মুশকিল।
নতুন গড়ে ওঠা ‘শিশু সাহিত্যের’ অন্যতম রূপকার দক্ষিণারঞ্জন। জোর তর্ক চলছে, কোনটা পাঠ্য কোনটা অপাঠ্য, কোনটা বোধগম্য, কোনটা বা দুর্বোধ্য। এই গোষ্ঠীতে দক্ষিণারঞ্জনও আছেন, লিখছেন দেশগঠনের বই, চারু ও হারু, লাস্টবয়, ফার্স্টবয়।
তার চেয়ে বড় কথা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ উদ্যোগ নিয়েছে, খাঁটি দেশজ বস্তুর উদ্ধার করতে হবে, স্বদেশী ব্রতে নিজস্ব অনুসন্ধানে লিপ্ত হতে হবে, ‘ভারতীয় প্রাণধারা’, ‘বাঙালীর জাতীয় চিত্তরসের’ সঙ্গে শিক্ষিতের পরিচয় করানো কর্তব্য। এই প্রকল্পের তিনি পুরোপুরি শরিক, এই কথা দক্ষিণারঞ্জন ভূমিকায় বার-বার স্বীকার করেছেন। ‘আমার দেশ’, ‘বাঙ্গালীর আপন প্রাণ’, ‘বাঙ্গালা ভাষার প্রকৃত আকৃতি’ (নজরটান মিত্র মহাশয়ের) সব কিছু ঠাকুরদাদার ঝুলিতে পাওয়া যাবে, এই বিশ্বাসে তিনি কাহিনী সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছেন।
এর অর্থ এই নয় যে দাবিগুলি যথার্থ নয়, মিত্র মহাশয়ের বানানো। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে ‘কথার’ বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হচ্ছে নতুনভাবে। বোধের এই রূপান্তর স্মর্তব্য। সমালোচনা দরকার। ‘পাশ্চাত্য শিক্ষা’, ‘পাশ্চাত্য আদর্শ’ ও ‘উপন্যাস’ জাঁকিয়ে বসেছে, তার তুলনীয় কিছু ‘আমার দেশ’ দিয়েছিল, যেমন ‘শিশুসাহিত্য (রূপকথা)’ মেয়েলি সাহিত্য (ব্রতকথা) ইত্যাদি। জিনিস খাঁটি হওয়া চাই, মেকি হলে চলবে না। জড়িত আছে ‘জাতির বেদনা উল্লাসের মৰ্ম্মমর্যাদা’, ‘দেশে ও বিশ্বে’ প্রতিষ্ঠা কামনা, প্রমাণ করার উদগ্র ইচ্ছা ‘ভারতেরই মধুচক্রের মোম, অপর দেশ হইতে ক্যান্ডেলরূপে আসিয়া, আলো জ্বালাইতেছিল।’ ফলে জিনিস আমাদের, কিন্তু প্রতি পদক্ষেপে তুলনা দিতে হবে বিদেশের, তা না হলে স্বদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে কী করে?১৬১
