এই আদিকল্প যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাতাবরণে গড়ে উঠেছে, তা সুপরিচিত। ফলে যোজনার ক্ষেত্রে প্রতিসরণ ঘটেছে। সমসাময়িক অনেকের মতো দক্ষিণাবাবুও মনে করছেন খাঁটি আছে পল্লীতে, বঙ্গজননী হচ্ছেন পল্লী নিবাসী। পল্লী ও শহরের ব্যবধান-এর ধারণা প্রধান হয়ে উঠছে। পল্লী ‘খাঁটি স্বদেশী’, শহর মেকি বিদেশি। পল্লীর আতুঁড়ঘর গল্পের উৎস, ভূমিকার ৩নং পাদটীকায় আঁতুড়ঘরকে জায়গাও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু উদ্দিষ্ট হচ্ছেন শহরের আধুনিক পাঠকরা। দক্ষিণাবাবুও ‘ঘটকালি’ করছেন, শহুরে পাঠকদের পড়াচ্ছেন ‘পল্লীর শ্রুতিসাহিত্য।’ রবীন্দ্রনাথ প্রস্তাব দিচ্ছেন যে ‘আধুনিক দিদিমাদের জন্য অবিলম্বে স্কুল খোলা হউক’। সেইখানে দক্ষিণাবাবুর বই হবে পাঠ্য।১৬২
কথকের উদ্দেশ্য একেবারে আলাদা। শহর বা পল্লীর দ্বৈধতা তাঁর পালার কেন্দ্রীয় ভাব নয়, মথুরা ও বৃন্দাবন, রাখাল রাজা ও দ্বারকার রাজা এক লীলাময়ের প্রকার মাত্র। আসরে শ্রোতার পরিচয় বাঙালি নয়, ভক্ত; বিপরীতাচারীরা হল পাষণ্ড। আজও পাঠের শেষে দ্বিজবাবু ভক্তমণ্ডলীর নামে জোকার দেন, পাঠের প্রারম্ভে বাসন্তী দেবী উপস্থিত ও অনুপস্থিত, গত ও বর্তমান ভক্তবৃন্দের চরণে কোটি কোটি প্রণাম জানান। গোস্বামী কবিরাজের অনুসরণে সপ্তদশ শতকে যদুনন্দন তো বলে দিয়েছেন পাঠের সার্থকতা, পাঠকের কামনার কথা:
মোর মুখ মরুস্থল, বাণীখিন্নরূপচর গোকুলা উন্মুখা বাক্যগণ।
বৈষ্ণবের কর্ণ নদী, প্রবেশ করয়ে যদি, পুষ্ট স্নিগ্ধ হইবে তখন ॥১৬৩
বাচ্য থেকে পঠনীয়, কথ্য লেখ্য, শ্রুতি থেকে মুদ্রণ। তাই যোজিতের পড়ার সুবিধের জন্য সংস্করণকে মার্জিত করা হল। পল্লী ‘গীতকথা’ হয়ে যাচ্ছে। তাকে হতে হচ্ছে ‘বঙ্গোপন্যাস’। আধুনিক শিশু সাহিত্যের তালিকায় সেইটা অবশ্য পাঠ্য, ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হল ‘বঙ্গোপন্যাস’-এর ষোড়শ সংস্করণ। আর কথকতার আখ্যান খুঁজে পাওয়া যাবে শুধু পুথিতে। ওইগুলির অমার্জিত পাঠ তো এককের নয়, পাপ-পুণ্যে বিশ্বাসী ভক্তসমূহের, যে সমূহ আজ ‘জাতিতে’ পর্যবসিত, যার সত্তা আজ ‘এককে’ বিভক্ত, স্বগত পাঠে যে অভ্যস্ত।
… … …
আসরে ঝাঁপ পড়ে গেছে, ধীরে ধীরে পুথি পাতড়া গুটিয়ে ফেলছেন, লাল বনাত গায়ে চাঁই বুড়ো, উঠে যাবার সময় হল তাঁর, কোনওদিন আর ডাক আসবে কিনা, কে জানে। সেই কবে খবর পেয়েছি কাশীতে মারা গেছেন হরু ঠাকুর, নিশ্চিন্দিপুরের হরিহর রায়। আর কে পালা বাঁধবে তাঁর মতো? মনটা কি একটু আনচান করে? জানি ‘দুর্ভাবনাময় জটিল সাম্প্রতিকের?’১৬৪ মুখোমুখি আমরা, লোকে ধমক দেবে। এইসব ক্ষেত্রে বিষণ্ণতাকে প্রশ্রয় দেওয়া কাজের কথা নয়, সেইটা রোমান্টিকতা, অলস ‘নস্টালজিয়া’। ইতিহাসের আধুনিকতার, অনিবার্যতার বিরোধিতা। যা অবস্থা আজকাল, এই অতীতবিলাস বিপদজনকও হতে পারে, ব্রাহ্মণ্যবাদকে প্রশ্রয় দেবে, হয়তো বা দুর্বল করে তুলবে ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াইকে। কিন্তু এও তো মনে হয় যে সমূহের রসভুক্তির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে যথাযথ সামাজিক ও নান্দনিক মর্যাদা না দেওয়াটা কৃতঘ্নতা। আরও শুনেছি যে অপু আজও স্বপ্ন দেখে, এই দরিদ্র, নিষ্পেষিত দেশে, নিষ্ক্রিয় সময়ে প্রতিদিন তার কানে ভেসে আসে তার বাবার, কথক হরিহরের, আশীর্বচনের রেশ:
কালে বৰ্ষতু পর্জ্জন্যং পৃথিবী শস্যশালিনী…’
লোকাঃ সন্তু নিরাময়াঃ…
টীকা
সংকেত সূচী:—বিশ্ব—পুথিশালা, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।
ক. বি.—পুধি সংগ্রহ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
পাঠবাড়ি—শ্রীগৌরাঙ্গ গ্রন্থমন্দির, পাঠবাড়ি, বরাহনগর।
এশিয়া—পুথি সংগ্রহ, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলিকাতা।
তালিকার ক্রমিক সংখ্যা ও ফোলিও সংখ্যা দ্বারা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১ দীনবন্ধু মিত্র, রচনা সংগ্রহ, সাক্ষরতা প্রকাশন (কলিকাতা ১৯৭৩), পৃ. ৪৮৪, ৪৯০
২ ‘ব্রজবিলাস’, দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন, বিদ্যাসাগর রচনা সংগ্রহ, সাক্ষরতা প্রকাশন, দ্বিতীয় খণ্ড (কলিকাতা, ১৯৭২), পৃ. ৪৫৪-৪৫৫।
৩ বাধাগোবিন্দ বসাক সম্পাদিত ও অনুদিত, কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্র, ২/২৭ (কলিকাতা ১৯৬৪), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯০-১৯১। প্রাচীনকালে কথকদের প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য, সুকুমার সেনের নিবন্ধ, ‘কথকতা’, ভারতকোষ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ১৫০-১৫১।
৪ ‘কথকতা’, বিশ্বকোষ, তৃতীয় ভাগ, নগেন্দ্রনাথ বসু, ১৮৮৬, পৃ. ১৯১ (পুনর্মুদ্রণ, দিল্লী, ১৯৮৮)।
৫ Willian Ward. Views of the History Literature, Religion of the Hindus 2nd ed.. Vol II. Seranipxone, 1815. 244-29০।
৬ হরিপদ চক্রবর্তী, ‘কথকতার পুঁথি’, সুবর্ণলেখা, আশুতোষ ভট্টাচার্য ও অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত (কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৪), পৃ, ৫৮০-৫৯২।
৭ ভোলানাথ চক্রবর্তী, সেই একদিন আর এই একদিন, অর্থাৎ বঙ্গের পূর্ব ও বর্তমান অবস্থা, সুরাপান নিবারণীসভায় বক্তৃতা, ৯ই শ্রাবণ, আদি ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে মুদ্রিত, ১৮৭৫ সন, পৃ. ১৩-১৪। বাজ নারায়ণ বসু দ্বারা অভিব্যক্ত, বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক বক্তৃতা, সারদাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক বাঙ্গালা যন্ত্রে মুদ্রিত, শোভাবাজার গ্রে স্ট্রিট, ১৮০০ শকাব্দ (১৮৭৮) পৃ. ৬২-৬৪। কথক ঠাকুরের নাম পুস্তিকাটিতে ভ্রমবশত লেখা হয়েছে গঙ্গাধর শিরোমণি।
