স্বার্থ যাই থাকুক না কেন, অভীষ্ট যে ভাবে ছকা হোক না কেন, কথকদের সত্তা আছে, শ্রোতাদের বোধ আছে, আছে সামাজিক অভিজ্ঞতা। যোজক ও যোজিতের পারস্পরিক সংঘাত (দ্বিবিধ অর্থে) রসভোগের ক্ষেত্র তৈরি হয়, সেই ক্ষেত্রে টানাপোড়েন আছে, প্রতিসরণ হয় আখ্যানবিন্যাসে ও ভাববোধে। শাসকশ্রেণীর হাতে কথকদের ক্রীড়নক—তাদের আদর্শ প্রচারের ‘মাধ্যম’ মাত্র মনে করা, অন্যদিকে ‘নিরক্ষর’ (দেবীবাবু বার-বার কেন জানি না এই বিশেষণটা গ্রামবাসী ও চাষীদের আগে ব্যবহার করেছেন; যেন অক্ষর জ্ঞানটা বুদ্ধি-বিবেচনা ও বুদ্ধিবোধের সমার্থক) চাষীদের চৈতন্যকে আঁক টানার স্লেট হিসাবে দেখানোর মধ্যে আদর্শ ও মূল্যবোধ গড়ে ওঠার পথে বৈপরীত্যের নানা মুহূর্তকে অবহেলা করা হয়, যোজনার আদান-প্রদানের প্রক্রিয়াকে বাদ দেওয়া হয়। আসরে পাঠের ও শোনার নানা স্তরে যে ভিন্ন বয়ান তৈরি হতে পারে, মুল্যবোধের রঙে তারতম্য ঘটতে পারে—এইরকম কোনও সম্ভাবনা এই জাতীয় আলোচনায় আমল পায় না।
কথক ঠাকুর ও সামূহিক চৈতন্য
এই মূল্যবোধ নিমার্ণ-প্রক্রিয়া সমূহের স্থান কোথায়? কী করে বা যোজিতের অবস্থান পরিবর্তন যোজকের ঘটকালি রীতিতে পরিবর্তন আনে, উভয়ের টানাপোড়েন আখ্যানের বিন্যাস, রসভোগকে করে তোলে ভিন্নতর? তুলনা, প্রতি তুলনার মাধ্যমে সমস্যা বিচারে প্রবৃত্ত হওয়া যেতে পারে? সমূহের উপস্থিতি কথকতার আসরের পরিমণ্ডল কীভাবে নির্ধারিত করে, সেই বিষয়ে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল। তাঁর সাক্ষ্য থেকে বিস্তৃত উদ্ধৃতি দেওয়া আবশ্যক:
আশী বৎসর পূর্বে মাতাঠাকুরাণী রামায়ণ পাঠ করাইয়াছিলেন। তখন ইস্কুলে পড়ি। সমুদয় ঘটনা এখনও প্রত্যক্ষ প্রতীয়মান হইতেছে। তিনি গৃহদেবতা রঘুনাথজীউর সম্মুখে সঙ্কল্প করিলেন, তিনি সমস্ত বৈশাখমাস রামায়ণ পাঠ করাইবেন। আটচালায় বেদী নির্মিত হইল, গ্রামস্থ সকলকে রামায়ণ পাঠ শ্রবণ করিতে আহ্বান করা হইল। মা পাঠক ঠাকুরকে ধুতি, উড়ানী আর কি কি দিয়া বরণ করিলেন। অপরাহ্নে পাঠক বেদীতে বসিয়া রামায়ণের পুথি খুলিলেন। গ্রাম ছোটো, ইতোমধ্যে পঞ্চাশ ষাটজন পুরুষ এবং ত্রিশ চল্লিশ জন নারী যথাস্থানে উপবিষ্ট হইয়াছিলেন। পাঠক রামায়ণ হইতে দুইটি, তিনটি, চারটি শ্লোক পাঠ করিলেন, তারপরে ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন। কত প্রকারে তাৎপর্য বুঝাইতে লাগিলেন, কখন তিনি অভিনয় করেন, কখন পুরুষোচিত ভাষা ব্যবহার করেন, কখন নারীসুলভ কণ্ঠে খেদ করেন ইত্যাদি প্রায় দেড় ঘণ্টা এইরূপ চলিতে থাকে। শ্রোতৃবর্গ নিবিষ্ট চিত্তে শুনিতে থাকে। প্রতিদিন যে একই লোক আসিত তাহাও নয়। রাঢ়ের গ্রামে বর্ষীয়সী বিশেষতঃ গ্রামের ঝিউড়ি, এ পাড়ায় সে পাড়ায় স্বচ্ছন্দে আসে। শ্রোতাদিগের মধ্যে অনেকেই অত্যল্প লেখাপড়া জানিতেন, তাহাও পাঠশালায় সমাপ্ত। কিন্তু পাঠকের ভাষা সংস্কৃত শব্দ বহুল হইলেও ভাবার্থ গ্রহণ করিতে পারিতেন৷ এইরূপ বৈশাখ মাস অতিবাহিত হইল। সমাপ্তি দিবসে ব্রত উদযাপিত হইল, পাঠক দক্ষিণান্ত হইলেন।…পরদিন ব্রাহ্মণ ভোজন। মায়ের সঙ্কল্প সিদ্ধ হইল। শ্রোতারা দুই কারণে আসিত—রামায়ণ পাঠ শ্রবণ করিলে পুণ্য হয়, তাহারা পুণ্য অর্জন করিতে আসিত। আর দ্বিতীয় কারণ, তাহারা না আসিলে মায়ের সঙ্কল্প ভঙ্গ হইত। তাঁহার পাপ হইত৷ তাঁহারা তাঁকে পাপের ভাগী করিতে পারিত না। এই কারণেও তাঁহারা না আসিয়া পারিত না। তাহাদের আসাতে মা কৃতার্থ বোধ করিতেন৷ রামায়ণ শ্রবণ করিলে পুণ্য হয়, ইহা কি অন্ধ বিশ্বাস? যিনি একথা বলেন তিনি রামায়ণ পড়েন নাই, শ্রদ্ধা সহকারে পড়েন নাই,। রামাদির চরিত ধ্যান করেন নাই। আর তিনি পুণ্য শব্দের অর্থও জানেন না।১৫৫ (নজরটান আমার)
কথকতা ইতিহাসে, সমাজে বিবর্তিত। আসরে উদ্যোক্তা ও শ্রোতারা পাপ ও পুণ্যে বিশ্বাসী। পাপ-পুণ্য একার নয়, তার ছোঁয়াচ সবার লাগে, সবার তাতে অংশ আছে। সঙ্কল্প করেন একজন, ডাকেন একজন কিন্তু আসতে হয় সবাইকে, আসরে হাজির থাকা হল সামাজিক দায়। যোগেশচন্দ্র রায়ের ধমকানিটা তাৎপর্যপূর্ণ্য। রস উপভোগ-এর শর্ত আছে, শ্রদ্ধা থাকতে হবে, পুণ্যে আস্থা রাখতে হবে। শ্রদ্ধার আভিধানিক অর্থ তো বিশ্বাস, প্রত্যয়, স্পৃহা, আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি। পুণ্য অর্থ শুভকর্ম, পবিত্র ধর্ম। এই সব গুণের শর্তাধীনে যোজক-যোজিতের মোকাবিলা হয়, তা না হলে রসভোগের সম্ভাবনাই নাকচ হয়ে যায়। ‘কাশীরাম দাস ভনে, শুনে পুণ্যবান।’ শ্রোতারা পুণ্যবান, তাই তো তাঁরা কথা শুনছেন।
যখন সমুহ বদলে যায়। শর্ত পালটে যায়, তখন কথকও বাতিল হয়ে যান। যোগেশচন্দ্রের সমসাময়িক কলকাতার এক বাসিন্দা লিখছেন,
বৃদ্ধ ও বৃদ্ধারা তাহাদের কথকতা ও পালাগান শুনিতে যাইতেন। অন্যান্য ভদ্র লোকেরা কখনো যাইতেন না। কথাবার্তার প্রচলিত মাত্রাই ছিল—এ যেন ‘কথকের কথা’, অর্থাৎ বিশ্বাসযোগ্য নয়।১৫৬
প্রতিতুলনা আনা যেতে পারে। ‘কথার’ একটি রূপ কথকতা। আরও অনেক প্রজাতি আছে—রূপকথা, গীতকথা, কিস্যা, ইত্যাদি সেইগুলিও বাচ্য। এই বাচনীয় প্রজাতি ছাপার অক্ষরে এল, বঙ্গ শিশুসাহিত্যে শোরগোল পড়ে গেল।
