ইংরেজি শিক্ষিত নব্য যুবকের লোকশিক্ষার প্রতি অনীহার বিপরীতে কথকের সামাজিক ভূমিকাকে বঙ্কিম ব্যাখ্যা করেছেন। সংস্কৃতির যোজক হলেন কথক; তাঁর যোজনার ফলে সমাজে মূল্যবোধের সৃষ্টি হয়, চিত্তবৃত্তির প্রসার ঘটে।
মুল্যবাধের আবৃত্তি নিঃসন্দেহে কথকের কাজ। কিন্তু সেটা এক বিশেষ প্রকারের মুল্যবোধ। তাঁর আলোচনায় দীনেশচন্দ্র সেন বলেছেন যে লোকগাথার প্রেমকাহিনীকে ব্রাহ্মণরা বাতিল করলেন এবং কথকদের মাধ্যমে দেবলীলার কথা চালু করলেন।১৫২ এক হাতে নিলেন, আর এক হাতে দিলেন। মনোরঞ্জনের ক্ষেত্রটি ‘নিম্নশ্রেণীর’ হাত থেকে চলে গেল পৈতা ঝোলানো কথক ঠাকুরের খপ্পরে। ভাল মন্দের তর্ক-বিচার দীনেশচন্দ্র সেন স্পষ্টত এড়িয়ে গেলেও এই পরিবর্তনের কথা বলেছেন।
ঐতিহাসিক কালক্রম, নৃতাত্ত্বিক তত্ত্ব, এই সবের ফিকিরে দীনেশচন্দ্র সেনের বক্তব্যে ফাঁক পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু কথকদের বর্ণিত পালার খুঁটি ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতিতে প্রোথিত ছিল। কথকরা সমাজরক্ষণে ব্রতী ছিলেন, সমাজ পরিবর্তনে নয়।
প্রয়াত দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় চার্বাক দর্শনের অবলুপ্তির পিছনে কথকদের ভূমিকাকে বেশ বড় করে দেখিয়েছেন।১৫৩ মহাভারতে-র শান্তিপর্বের একটি আখ্যানে ইন্দ্ররূপী শেয়াল নাস্তিক্যধর্মে বিশ্বাসের ভয়াবহ পরিণতি হাতেনাতে দেখিয়েছে, তর্কবিদ্যার প্রতি অনুরক্তির কর্মফল নিজমুখে বলেছে। কর্মফল কী? আগের জন্মে বামুন কিন্তু পরের জন্মে শেয়াল। আর এই গল্পটি নিপুণভাবে কথকঠাকুর ‘নিরক্ষর’ চাষাভুষোদের কাছে বলে কী মারাত্মক ‘প্রোপাগান্ডা’ই না করেছেন। কথকরা এইরকম প্রচারক, সাবেক কালের শাসকশ্রেণীর হাতের প্রচারমাধ্যম; অক্ষরজ্ঞানহীন ‘চাষাভূষোদের’ চেতনায় ‘নাস্তিক্যবুদ্ধির বিভীষিকাটা’ ‘কথকঠাকুর মারফৎ’ শাসকরা গেঁথে দিতেন। গল্পকারদের ও কথকদের প্রসঙ্গে দেবীপ্রসাদের শেষ প্রাসঙ্গিক মন্তব্য হল ‘আজকের দিনে এরকম কুশলী প্রোপাগান্ডিস্ট-এর খবর পেলে শাসক সম্প্রদায় পুরস্কারের ঝুড়ি উপুড় করে দেবেন।’
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের যে কোনও মন্তব্য অনুধাবনযোগ্য। উনিশ শতকে বঙ্কিমী মূল্যায়নের সঙ্গে তাঁর বিবৃতির অনেক ফারাক, এমনকি দীনেশ সেনের লেখার মেজাজের সঙ্গেও তাঁর চিন্তা স্বভাবত খাপ খায় না। বঙ্কিমের কাছে যা লোকশিক্ষা, দেবীবাবুর কাছে সেটা শাসকশ্রেণীর প্রোপাগান্ডা। বঙ্কিমের ধারণা যে, নদের ফটিকচাঁদদের দাপটে কথকদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। হালকাভাবে হলেও দেবীবাবুর মনে হয়েছে যে জানা নেই, তাই, নতুবা কথকদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, খবর পাওয়া মাত্র শাসকদের দয়া তাদের উপর ঝরে পড়বে।
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বিচারের সঙ্গে বৈমত্যের সুযোগ আছে। ঐতিহাসিক-গত ভাবে কথকরা লোকায়তিকদের বিরুদ্ধে কতটা লড়েছিলেন বা ব্যবহৃত হয়েছিলেন, সেটা আলোচ্য নয়। মহাভারত বা রামায়ণে-এর সব আখ্যান কথকরা ব্যবহার করতেন না, সংগ্রহের মাধ্যম দিয়ে কিছু আখ্যানমাত্র নির্বাচিত করতেন, সেই ভিত্তিতে পুথি নিজেদের মতো করে লিখতেন। কোনও কথকতার পুথিতে শান্তিপর্বে লেখা ইন্দ্ররূপী শেয়ালের আখ্যান উল্লিখিত করার কোনও ঐতিহাসিক নিদর্শন আছে কিনা, সেই তথ্য বিচারও গৌণ। আপত্তি আছে অন্যখানে, সমস্যাটাকে যেভাবে সাজানো হয়েছে—সেইখানে।
যে কোনও যুগে শাসক শ্রেণীর চিন্তাধারা সামগ্রিকভাবে সমাজে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে, মার্কসের এই উক্তি মান্য। আমাদের আজকের সমাজেও ডাক্তার, আইনজীবী, বিজ্ঞানী ও কবিরা বুর্জোয়াদের বেতনভুক, এই দামি কথাটাও মার্কস বলে গেছেন। বেশির ভাগ ব্রাহ্মণ ব্রহ্মোত্তর, দেবোত্তর জমি ভোগ করেন। জমিদার বাড়ির ডাকা আসরে তাঁরা কথক। পালার অন্যতম উৎস ব্রাহ্মণদের লেখা পৌরাণিক আখ্যান। বৌদ্ধিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের নিগড় কোথায় বাঁধা, সেইটা বুঝতে কোনও অসুবিধা নেই।
অথচ সীমা অতিক্রান্ত হয়, অন্তত হবার সম্ভাবনা থাকে। কথা বলার আর্ট হল কথকতা। আসর সামাজিক অনুষ্ঠান, বক্তা ও নানা রকমের শ্রোতা উভয়ে উপস্থিত থাকে। শ্রোতারা মান্য বামুন, ‘নিরক্ষর চাষাভূষা’ ‘গোলা মেয়েমানুষ’ সবরকম হতে পারে। কিন্তু আসরে রসভোগের প্রক্রিয়ায় তাদের সাধ্যানুযায়ী শ্রোতারাও সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। নানা শ্রোতার সংবেদনশীলতাকে কথক তার পাঠক্রমে মোকাবিলা করেন, তা না হলে আসর মাটি হবে। এই মোকাবিলার নানা সাক্ষ্য প্রভুপাদ প্রাণকিশোর গোস্বামীর আত্মজৈবনিক রচনায় লব্ধ।
ফলে ইচ্ছানুসারে বক্তব্যকে চেতনায় গেঁথে দেওয়া যায় না; তেমন তেমন শ্রোতার চোখে পাঠরত কথকের দাড়ি মরা পোষা ছাগলের দাড়ির কথা মনে করিয়ে দেয়, তার শোক উছলে ওঠে, এই কথাও গল্পে শোনা যায়।১৫৪ সব মতের কথক থাকতে পারে। নাস্তিক বৌদ্ধ ও জৈনদেরও ‘কথা’ ছিল, তাই কথকও ছিল। কিন্তু ‘রক্ষণশীল আস্তিক’ কথকরাও মজলিশ চাহিদার তাগিদে, শিল্পের নীতিতে, এমনকি পেশার খাতিরে সবসময় বাঁধাধরা পথে চলবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অভিযোজন চলছে, তাৎক্ষণিকতা বয়ানের অভিমুখ বদলাচ্ছে, এই সবের কিছু কিছু উদাহরণ প্রসঙ্গান্তরে আলোচিত হয়েছে। পুরুষ শাসিত সমাজের ভ্রূকুটি অবহেলা করে কুমুদবন্ধু তাঁর পালা ‘রিঙ্গনলীলার’ মধ্যে মহিলা শিক্ষার পক্ষে জোর সওয়াল শুরু করেন, এইরকম নজিরও আছে।
