আশির কোঠায় নৃতত্ত্ববিদ ভিক্টর টার্নারের ‘সীমা অতিক্রমের’ (Liminality) তত্ত্ব অনেক সমাজবিজ্ঞানীকে নাড়া দিয়েছিল। দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপের মধ্যে এমন আচার অনুষ্ঠান আসে, নানা শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে এমন ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া সম্ভব যেখানে গ্রাহ্য কাঠামো মুহূর্তের মধ্যে নাকচ হয়ে যায়, সমূহের অবস্থিতি বড় হয়ে ওঠে, মুক্তির অনন্ত সম্ভাবনা দেখা যায়। মুহূর্তগুলি হয়তো ক্ষণস্থায়ী কিন্তু সেইগুলির পুনরাবৃত্তি হয়, নানা আচারে, আন্দোলনে, উৎসবে, তীর্থযাত্রায় কাঠামো থেকে বাইরে যাবার পথ খুঁজে পাওয়া যায়, এমন কী কাঠামো নাকচ হতেও পারে। মানসিক ও ব্যবহারিক, উভয়ক্ষেত্রে, এই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়।১৪৮
ভারতীয় রসতত্ত্বের ব্যাখ্যায় এই প্রক্রিয়ার অন্যতর মাত্রা দেখা যায়। রসের আলোচনায় আছে ‘চমৎকারিত্ব’, ও এই চমৎকারিত্ব নিহিত আছে বিস্তৃতির ধারণায়। ভরত নাট্যশাস্ত্রে স্পষ্ট বলা হচ্ছে,
যোহৰ্থো হৃদয় সংবাদী তস্য ভাবো রসোম্ভবঃ।
শরীরং ভ্যাপ্যতে তেন শুষ্কংকাষ্ঠমিবাগ্নিনা॥
আগেই দেখেছি, অভিনবগুপ্ত এই রসব্যাপ্তির তত্ত্বে কীভাবে সায় দিয়েছেন। বিশ্বনাথ কবিরাজ লিখেছেন, ‘চমৎকারশ্চিত্তবিস্তাররূপো বিস্ময়াপর পর্যায়ঃ।’ (চমৎকার শব্দের অপর নাম হচ্ছে চিত্ত বিস্তাররূপ বিস্ময়)।১৪৯
রসপ্রস্থানের ব্যতিক্রমী চরিত্র কুন্তকও রসের এই সামান্য গুণকে স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষায় ‘চমৎকারো বিতন্যতে, চমৎকৃতিবিস্তাৰ্যতে।’ ফলে মুহূর্তে মুহূর্তে রসাস্বাদন হয়, সেই আস্বাদন ক্ষণকালের নয়।১৫০ কবি-হৃদয় থেকে রস ক্ষরিত হয়, উচ্ছলিত হয়। আবার রসাস্বাদনে সহৃদয় চিত্তের বিস্তার হয়। এই তত্ত্বে কাঠামোর মধ্যে থেকেও মানসক্রিয়ায় কাঠামোকে অতিক্রম করার কথা থাকে; সামাজিক সংস্কারে আবদ্ধ হয়ে। লৌকিকভাবে তটস্থ থেকেও রসাস্বাদনে অলৌকিকভাবে রূপান্তরিত হওয়া যায়। ভ্যান গেনেপ বা টার্নার বার বার কাঠামোর বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা পর্ব বা ভাগের কথা বলেছেন, সীমা অতিক্রমের মুহূর্তগুলিকে সেই পৰ্বান্তরের মধ্যে প্রোথিত করার চেষ্টা করেছেন।
রসানুভূতির ভারতীয় ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এইরকম পর্বভাগের বা মুহূর্তের অনুসন্ধানের প্রয়োজন উপলব্ধ হয় না। রসব্যাপ্তির বা উচ্ছলনের মধ্যে সহৃদয় ডুবে যান, চমকৃত হন, তটস্থের সীমা অতিক্রান্ত হয়, মুহূর্ত ও ক্ষণকে আলাদা করে চেনার সুযোগ থাকে না, কাঠামোর বাইরে তার বিরোধী রূপ দাঁড়িয়ে থাকে না, কাঠামোর মধ্যে হাজির ও গায়েব অনুযোগী-প্রতিযোগী রূপে আবদ্ধ, একটার সঙ্গে অন্যটা সমবায় সম্বন্ধে থাকে, মুহূর্তের মধ্য দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যায় না। সহৃদয়ের রসাস্বাদনের সামগ্রিকতার রূপ তাই এই তত্ত্বে ধরা পড়ে।
৫ কথকতার সামাজিকতা: লোকশিক্ষার চরিত্র বিচার
বঙ্কিমচন্দ্র বা সঞ্জীবচন্দ্র, দীনেশচন্দ্র সেন বা হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সবাই ঐতিহ্যানুসারী সমাজে কথকদের শ্রেষ্ঠ লোকশিক্ষক বলেছেন। কথকের সম্বল কথা। মজলিশে সেই কথার মাধ্যমে শ্রোতারা নানা নীতি উপাখ্যান শুনতেন, আখ্যানের বয়ানে, গানের কথার পরতে পরতে থাকত জীবনচর্চার নানা মূল্যবোধের ইঙ্গিত, কী করলে ভাল হয়, কী করলেই বা মন্দ হয়, এইসবের নির্দেশ। এই ভালমন্দ ত্রিকালব্যাপ্ত। কথকের বয়ানে ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সমভাবে বিরাজ করে। অথচ শ্রোতারা তো সাম্প্রতিক। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও জীবনচর্চার মধ্যেই তাদের নীতিবোধ স্থিত। তাই ঘটকালি করার সময় কথকও দৈনন্দিনকে ভুলতে পারেন না, পৌরাণিক চরিত্রে বাস্তবের মিশেল দিতে হয়; কথা যত ‘অসম্ভব’ হোক না কেন, তাকে ‘সহজের’ সমে, সমাজের পথে, ফিরতে হবে। বার-বার শ্রোতারা কাল্পনিক আখ্যানে খুঁজে বের করেন নিত্য প্রাসঙ্গিকতা, প্রাত্যহিক জগতের তুলনায় বা প্রতিতুলনায় পৌরাণিক চরিত্রগুলো ফিরে আসে, ঢুকে পড়ে প্রবাদ ও প্রবচনে, ধারণা হয়ে ওঠে লোকগ্রাহ্য, ‘বিদুরের খুদ’ বা ‘রাবণের চিতা’, ‘কংস মামা’ বা ‘দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ’; পৌরাণিক কথা জন্ম দেয় ধারণার, ধারণা রূপ পায় লৌকিক ছড়ায়, সামাজিক মন্তব্যে,
ভীম, দ্রোণ, কর্ণ গেল, শল্য হল রথী,
চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল জোনাকি ধরে বাতি।
উনিশ শতকের দ্বিতীয় পদে, লোকবৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে, ইংরেজের পিঠ চাপড়ানোর কাঙাল, ইংরেজি নবীশ, ‘নদের ফটিক চাঁদ’দের বিরুদ্ধে বঙ্কিম প্রায়ই গালমন্দ করতেন। সমাজে ‘শিক্ষিত’ ও ‘রামাদের’ মধ্যকার দূরত্ব ক্রমশ যোজন-প্রমাণ হচ্ছে। বঙ্কিম চিন্তিত। এই ব্যবধান কমাবার জন্য যে ‘সুশিক্ষিতের’ উদ্যোগ কাম্য। লোকশিক্ষার প্রকল্পে তাঁর অগাধ আস্থা। স্বভাবত তাঁর আলোচনার অনুষঙ্গে হাজির হন আশৈশব পরিচিত কথক ঠাকুর,
গ্রামে গ্রামে, নগরে নগরে, বেদী পিঁড়ির উপর বসিয়া, ছেঁড়া তুলট, না দেখিবার মানসে সম্মুখে পাতিয়া, সুগন্ধ মল্লিকামাল শিরোপরে বেষ্টিত করিয়া নাদুস্নুদুস্ কালো কথক সীতার সতীত্ব, অর্জুনের বীরধর্ম্ম, লক্ষ্মণের সত্যব্রত, ভীষ্মের ইন্দ্রিয়জয়, রাক্ষসীর প্রেমপ্রবাহ, দধীচির আত্মসমর্পণবিষয়ক সুসংস্কৃতের সন্ধ্যাখ্যা সুকণ্ঠে সদলঙ্কার সংযুক্ত করিয়া আপামর সাধারণ সমক্ষে বিবৃত করিতেন। যে লাঙ্গল চষে, যে তৃলা পেঁজে, যে কাটনা কাটে, যে ভাত পায় না পায়—সেও শিখিত যে ধর্ম্ম নিত্য, যে ধৰ্ম্ম দৈব, যে আত্মান্বেষণ তাশ্রদ্ধেয়, যে পরের জন্য জীবন, যে ঈশ্বর আছেন, যে বিশ্ব সৃজন করিতেছেন, বিশ্ব পালন করিতেছেন, বিশ্ব ধবংস করিতেছেন, যে পাপ পুণ্য আছে, পাপের দণ্ড, পুণ্যের পুরস্কার আছে, যে জন্ম আপনার জন্য নহে, পরের জন্য, যে অহিংসা পরমধর্ম্ম, যে লোকহিত পরম কার্য—সে শিক্ষা কোথায়? সে কথক কোথায়? ১৫১ (নজরটান আমার)
