সভার উদযোগে বিগত মাঘমাস হইতে বৈশাখের শেষ পর্যন্ত শ্রীযুক্ত গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য কথক মহাশয় শ্রীমদ্ভাগবতীয় কথা কহিয়াছিলেন। ইহাতে প্রত্যহ শ্রোতৃসংখ্যায় সভাগৃহ পরিপূর্ণ হইত। দূরপল্লী হইতে অসংখ্য স্ত্রীলোক এই কথা শ্রবণ করিতে প্রত্যহ উপস্থিত হইতেন।
পরের বছরের প্রতিবেদনও একই রকম:
গত মাঘ মাসের ও ফাল্গুনের কিয়দ্দিন পর্যন্ত খিদিরপুর নিবাসী শ্ৰীযুক্ত ক্ষীরোদচন্দ্র মুখোপাধ্যায় কথক মহাশয় মাসাধিককাল শ্রীমদ্ভাগবতীয় কথা কহিয়াছিলেন। ইহাতে প্রত্যহ শ্রোতৃসংখ্যায় সভাগৃহ পূর্ণ হইত। বলা বাহুল্য শ্রোতৃগণের মধ্যে স্ত্রীলোকের সংখ্যাই অধিক হইত।” (নজরটান আমার)
১৯৯২ সালে চালতাবাগান গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্মিলনীর আসরেও একই দৃশ্য দেখা যায়।১৪৫ রাধারাণীর কাছে কথক দ্বিজরাজবাবুর মানসিক করা আছে। পৌষ বা মাঘ মাসে একমাস ধরে রামায়ণী কথকতা করেন তিনি।
শ্রোতাদের শতকরা ৯৫ ভাগ পাড়ার বৃদ্ধা বা বয়স্কা মহিলা, তিন-চার ভাগ বৃদ্ধ। তাঁরা নিয়মিত আসতেন, দু-চার পয়সা প্যালাও দিতেন। আসরে জোকার দেওয়া, কান্না, ভাবে অভিভূত হওয়া, সবই তাঁদের মধ্যে দেখা যেত। ষাট বছর আগেকার বেহালার হরিসভা বা এখনকার চালতাবাগানের হরিসভার আসরে শ্রোতার চরিত্রে বা পরিবেশে পার্থক্য খুব আছে বলে মনে হয় না।
আসরে বেমানান একমাত্র আমি। ফলে অনেকের প্রশ্নের জবাব দিতে হত, আলাপও জমে গিয়েছিল। বছরের পর বছর দ্বিজবাবুর কথকতা শুনছেন, শুনতে শুনতে গান মুখস্থ হয়ে গেছে, এমন একজন বললেন, ‘নাতনি কোন স্কুলে পড়ে খোঁজ রাখি না। ওর পড়াও বুঝতে পারি না। রামকথা বুঝি, তাই আসি।’ আর একজন আগে আসতে পারতেন না। সংসারে কাজ ছিল। এখন সবাই বড় হয়েছে, কাজ কম, ফাঁক পেলে চলে আসেন। এখনও কাজ থাকলে আটকে থাকতে হয়। তখন মন খারাপ করে। মন ভার হলে কথকতা শোনেন, মন হাল্কা হয়ে যায়।
আবার একজন বাল্যবিধবা। কষ্টেসৃষ্টে ছেলে মানুষ করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। তা অনেক হয়েছে। রান্নাঘরে আর ঢুকবেন না। শেষ কয়েকটা দিন, ধর্মকর্ম নিয়ে থাকবেন।
আবার কেউ বললেন যে, বাড়ির ছেলের কথা বলার সময় হয় না, সবাই সবসময় ব্যস্ত। এখানে আসেন। অনেক লোকের সঙ্গে কথাবার্তা হয়। সময় কাটে। আবার কথকতায় মনও শান্ত হয়, ভাল ভাল কথা শোনেন।
সবাই বৃদ্ধা, সবাই মহিলা, বৃহৎ পরিবারে সকলের দায়িত্ব ছিল। আজ সেই ভার নেই, নাতনি ও ছেলেদের সঙ্গে আড়ো-আড়ো ভাব, আগের বাঁধন শিথিল হয়েছে। সময়ও আসন্ন, শেষ পারাণির কড়ি চাই, জীবনের দায়বোধের কৈফিয়ৎ হয়তো দিতে হবে। কথকতায় বর্ণিত মূল্যবোধের জগতে তার উত্তর পাওয়া যেতে পারে। আবার কথকতার রস আস্বাদন অনেকে মিলে করেন, আলাপ আলোচনায়, আদানপ্রদানে সেখানে সমাজ গড়ে ওঠে, এককত্ব কেটে যায়। রস আস্বাদনের প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে এসে এখানে শ্রোতা হয়ে ওঠেন সামাজিক, সমূহে বা গোষ্ঠীতে তিনি স্থিত হন।
আবার কোনও না কোনওভাবে এঁরা নিজেদের বঞ্চিত ভাবেন। এঁদের এই বঞ্চনা। রসের ‘সাধারণীকৃতির’ জন্য, শব্দের ব্যঞ্জনা শক্তির প্রভাবে, কোনওদিন মিলে যায় শবরীর সার্বিক দুঃখে, তার প্রাপ্ত সামাজিক তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যে। আবার পরম ভক্তিতে শবরীর যখন চরম প্রাপ্তি হয়, এঁরা মাটিতে কেঁদে লুটিয়ে পড়েন, বার বার হরিধ্বনি করেন। দ্বিজরাজ বাবুর বলা আখ্যানের শবরী তখন আদর্শায়িত হয়ে সর্বজনগ্রাহ্য হয়েছে।
লক্ষণীয় যে ভট্টনায়ক বা অভিনবগুপ্তদের রচনায় সহৃদয় ও সামাজিক সমার্থক, একটির পরিবর্তে অপরটি ব্যবহৃত হয়। সহৃদয়-এর সঙ্গে সামাজিকের এই যোগ তাৎপর্যপূর্ণ, একজন জরন্মীমাংসক যোগী সহৃদয় হতে পারেন না, বাসনার সংস্কার তাঁর নেই, শৃঙ্গার রসের আস্বাদন তার পক্ষে কী করে সম্ভব? রসাস্বাদন অলৌকিক কিন্তু যে বাসনাখ্য সংস্কার চিত্তবৃত্তিতে বিভাবাদিরূপে থাকে, যা রসবোধে অভিব্যক্ত হয় তা সামাজিক অভিজ্ঞতাপ্রসূত। অভিজ্ঞতা একক নয়, তা সমাজস্থ। সহৃদয়কে বার বার ‘সামাজিক’ নামাখ্যায় ভূষিত করে। তার নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে যেন বাস্তবের মধ্যে বেঁধে রেখে দেওয়া হয়।১৪৬
এই বাস্তবতা ক্ষমতা বিন্যাসের দ্বারা আবদ্ধ। মানিকাকা সামাজিক বা সহৃদয় কিন্তু বাস্তবে তিনি পরান্নভোজী, বড়লোক আত্মীয়ের গলগ্রহ। হরিভক্তি প্রদায়িনী সভা বা চালতাবাগানের হরিসভার অধিকাংশ শ্রোতাই পুরুষ শাসিত সমাজে মেয়ে; নানা দৈনন্দিন বঞ্চনার অবশ্যম্ভাবী শিকার। চালতাবাগানের বৃদ্ধারা আবার নানা অর্থে সংসারের প্রান্তবাসী। সম্পন্ন গগন ঠাকুররাও শোকে বিপর্যস্ত। নানাভাবে লৌকিক অভিজ্ঞতা এঁদের আহত করেছে, নানাভাবে এঁরা পর্যুদস্ত। নিষ্পেষণের, হতাশার তাড়নায় এরা কথক ঠাকুরের কাছে যায়, দাবি জানায়,
আমরা চাই একটু প্রাণ জুড়ানো হরিকথা যাতে চোখে জল আসে, প্রাণে ভরসা জাগে। এইসব তত্ত্বকথায় যে শুধু প্রাণ শুকিয়ে যায়, কোন ভরসা পাই না। মনে হয় আমরা ভগবানের কাছ থেকে অনেক দূরে পড়ে আছি।১৪৭ (নজরটান আমার)।
রসের উচ্ছলন ক্ষমতা ও সাধারণীকৃতি এই লৌকিক ক্ষেত্রকে মানসক্রিয়ায় অতিক্রম করায়, শ্রোতারা রসভুক্তির মাধ্যমে একক বোধকে সাধারণ বোধে রূপান্তরিত করেন। সাধারণীকৃতির ধারণার মধ্যে আছে একদিকে আদর্শায়িত করার ঝোঁক অন্যদিকে আছে ব্যাপ্ত করার বৃত্তি। উচ্ছলনের মধ্য দিয়ে, ব্যাপ্ত হবার মধ্য দিয়ে সীমা অতিক্রম করা যায়। ক্ষমতা বিন্যাসের নানা সীমা একক শ্রোতাকে লোকজীবনে নানা নিষেধের মধ্যে আবদ্ধ করে, তার সত্ত্বা বা বোধকে খণ্ডিত করে। রসধ্বনির মাধ্যমে, শব্দশক্তির মাধ্যমে রাম বা শবরীর কাহিনীতে শ্রোতা একাত্ম হয়, লৌকিক বোধের উত্তরণে, অলৌকিক বোধের জগতে তার সাযুজ্য ঘটে। অলৌকিক জগতে এই সাযুজ্যতার মাধ্যমে, আস্বাদনের মাধ্যমে, তার ‘চিৎ সম্বিত’ হয়। সাংখ্য মতাবলম্বী ভট্টনায়ক বর্ণিত সম্বিতের অর্থ ‘চৈতন্য’। নিম্নকোটির প্রতিনিধি মানিকাকার চৈতন্য দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত খণ্ডিত হয়, ক্ষমতার চাপে তাঁকে অস্বীকার করা হয়, ঠাট্টা করা হয়। রসধ্বনির ভোগে সেই চৈতন্য ফিরে পাওয়া যায়, তা স্ফুটিত হয়। চৈতন্যের প্রাপ্তি, অভিব্যক্তি, রসভোগের সাধারণীকরণের মাধ্যমেই সম্ভব। সংসারের অন্য সব ক্ষেত্র মানিকাকার কাছে, বুড়িদের কাছে সংকুচিত, প্রবেশাধিকার সেখানে সীমিত, কিন্তু রসভোগের এই ক্ষেত্র খোলা রয়েছে। আসরে তারা স্বরাট, কারণ তারা সামাজিক, রসের অনুভব সেখানে ‘সহৃদয় হৃদয় দর্পণমধ্যাস্তে।’ শব্দময় ধ্বনিময় কথকতার আসরে তাই দেখা যায় তাদের ভিড়।
