কথক বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে, শব্দ শক্তির মাহাত্মের জন্য, ধ্বনি বা রস সৃষ্টি করেন। মানিকাকার আত্মগত শোকানুভবে হৃদয় সিক্ত ছিল, মানসপ্রক্রিয়ায় তিনি রসধ্বনিজাত বিষয়ে তন্ময়ত্ব পান, রসচর্বণা শুরু হয়। এই অনুভবন লৌকিক নয়, ‘মানসপ্রক্রিয়া’; এই রস কাহিনী বা কথকে আবদ্ধ নেই, রস ব্যাপ্ত, ‘সহৃদয় হৃদয়সংবেদ্য।’ মানিকাকার মতো আসরে অনেকেই এর অংশগ্ৰাহী। আসর রসবোধের ক্ষেত্র হিসাবে রূপান্তরিত হয়েছে রামের অযোধ্যায়, কৃষ্ণের বৃন্দাবনে বা ভরতের তপোবনে।
কথকতার আসরে রসভোগের বা সীমা অতিক্রমের আরও নানারকম উদাহরণ হাজির করা যেতে পারে। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সদ্য বিবাহিত বড় ছেলের অকালমৃত্যুতে সমস্ত পরিবার শোকে মুহ্যমান। মুশকিল আসানের পথ বাতলালেন দীনেশচন্দ্র সেন।১৪২
আমি একদিন বলিলাম, ‘আপনারা যদি সান্ত্বনা চান, তবে আমি একজন ভাল কথককে নিযুক্ত করতে পারি, তাহার কথায় আপনারা শান্তি পাইবেন।’ সমুদ্রে পতিত ব্যক্তি যেরূপ তৃণটিকেও আশ্রয় করিতে হাত বাড়ায়, গগনবাবু এই প্রস্তাবটির সফলতা সম্বন্ধে আস্থাহীন হইয়াও ইহাতে রাজী হইলেন। বাড়ির মেয়েরা সাগ্রহে এই প্রস্তাবে সায় দিলেন।’
কোন পরিস্থিতিতে কথকদের ডাকা হয়, তার আভাস পাওয়া গেল। মেয়েরা এই বিষয়ে যথারীতি উৎসাহী, দীনেশবাবু তাও জানাতে ভোলেননি। কথক ক্ষেত্ৰনাথ চূড়ামণিকে দেখতে আদৌ নয়নাভিরাম নয়।
কিন্তু কথা বলিবার ইহার আশ্চর্য শক্তি! প্রথম দিনই আসর জমিয়া গেল। গগনবাবুর বাড়িতে ছেলে বুড়া সকলেই মৌতাত ধরিলেন, সন্ধ্যায় বড় হল-ঘরটায় ক্ষেত্ৰচূড়ামণির কালোকণ্ঠে ঔজ্জ্বল্য প্রদান করিয়া ফুলের মালা দুলিতে থাকিত, এবং তিনি ধ্রুব, প্রহ্লাদ, জড়ভরত, দক্ষযজ্ঞ, রুক্মিনী হরণ, বৰ্কাসুর বধ প্রভৃতি কত পালা যে বলিয়া যাইতেন, তাহার অবধি ছিল না। তিনি কথায় কথায় ছবি আঁকিয়া যাইতেন; বর্ণনার ছটায় মেঘ, বৃষ্টি, বসন্ত সমীরণ এবং পদ্মবন যেন চোখের সম্মুখে উপস্থিত করিতেন, কখনও শ্রোতৃবর্গ অশ্রুসিক্ত হইয়াছে, কখনও হাসির স্রোতে ভাসিয়া গিয়াছে। এরূপ অপরূপ বক্তাকে পাইয়া ধর্মের কথায় পৌরাণিক প্রসঙ্গে মন হইতে শোক ধীরে ধীরে মুছিয়া যাইতে লাগিল।
…প্রায় একমাসের মধ্যে গগনবাবুর মন এরূপ লঘু হইয়া গেল যে যখন ক্ষেত্র কথক কথা বলিতেন, তখন গগনবাবু লুকাইয়া তাঁহার চেহারা ও ভঙ্গীগুলি আঁকিতেন।
ক্ষেত্রচূড়ামণির কথকতা হৃদয়সংবেদ্য হয়েছিল। বলার কারুকৃতিতে, পৌরাণিক গল্পের ব্যঞ্জনায় গগনবাবুর শোকসন্তপ্ত পরিবার সবাই রসের আস্বাদনে সমর্থ হয়েছিলেন, যাঁদের ব্যক্তিগত শোকভার ‘লঘু’ হয়ে গিয়েছিল এমন কী ক্ষেত্র কথক নিজে গগনবাবুর শিল্পের বিষয় হয়ে গেলেন। এই ক্ষেত্রে রসচর্বণার দ্বারা ব্যক্তি-শোকানুভবের সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছিল। এই অতিক্রম্যতা কেবল গগন বাবুর মধ্যেই সীমিত ছিল , তা জনগ্রাহ্য হয়েছিল, ‘ছেলেবুড়া সকলের মৌতাত ধরেছিল।’ ক্ষেত্র কথক বলেছেন আর রস আস্বাদনের ভাগীদার হয়েছেন বাড়ির আমজনতা।
এই আমজনতার সঙ্গে কথকের ঘটকালি কীরকম পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তার ছবি অনুরূপা দেবীর লেখাতেও ধরা পড়ে। নায়িকা বাণী রসজ্ঞ, তার দৃষ্টিতে কথকের অনুষ্ঠান দেখানো হচ্ছে। শ্রোতার প্রতিক্রিয়া, কথকের নৈপুণ্য সব কিছু বর্ণনায় ধরা পড়েছে।
…সেদিন কথকতার বিষয় ছিল ‘অভিমন্যুবধ’। ক্ষমতাশালী বক্তা…ভাষা প্রাণস্পর্শী, স্বর অনন্য-সাধারণ। বীর বালকের অতুল সাহস, অমিত পরাক্রম, শ্রোতৃদলকে উত্তেজিত করিয়া যেন রণক্ষেত্রে টানিতেছিল। তারপর সে কি উৎকণ্ঠা, কি বিপুল উদ্বেগ। খাস বুঝি কণ্ঠের মধ্যে চাপিয়া আসে। সপ্তরথী আসিয়া একা অসহায় বালককে একসঙ্গে ঘিরিল। পিশাচ, পিশাচ! দন্তে দন্ত নিষ্পেষিত ও হস্ত দৃঢ় মুষ্টিবদ্ধ হইয়া গেল। প্রতিকার নাই! ইহার কি প্রতিকার নাই! ধিক! যদি না অন্যায়কারী শত্রুপক্ষকে দলিত করিয়া সপ্তরথীর লৌহ-নিগড়-মধ্য হইতে সোনার হরিণটিকে উদ্ধার করিয়া আনিতে পারা যায়, তবে শতধিক এই জীবন। কিন্তু হায়! কোন উপায় রইল না, অন্যায় সমরে ভারতের ভবিষ্যরবি অকালে অস্তমিত হইল। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মাতুল, পিতা সব্যসাচী, পিতৃব্য মহাবল ভীম যাহার সহায়, সে আজ অসহায় অনাথভাবে সপ্তরথীর সপ্তশরে শোণিতরঞ্জিত বিক্ষতাঙ্গে বসুধা আলিঙ্গন করিল।…
দর্শকগণ নীরবে অশ্রুমোচন করিতেছিল। কোন কোন পুত্রশোকাতুরা জননী হৃদয়ের আবেগ সংবরণ করিতে না পারিয়া ডুকরিয়া কাঁদিয়া উঠিতেছিলেন। বাণী নীরবে চক্ষু মুছিয়া কথকের মুখে চাহিল। সে মুখে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য হইল না। চিত্রকরের তুলি যেমন চিত্রের ভাবপ্রদান করে, বর্ণ সমাবেশে ইন্দ্রালয় নন্দন কানন রচনা করে, নিজে সে ভাবসম্পদের ধারও ধারে না, যে এতগুলি লোকের বক্ষতলে শোকস্মৃতি জাগ্রত করিতেছিল, সে নিজে যেন তাহার মধ্যে ধরা ছোঁয়াও দেয় নাই।১৪৩
এই উদ্ধৃতিতে ফুটে উঠেছে বৈপরীত্য, পালার ধাপেধাপে, কী করে শ্রোতা তন্ময়তা পায় ও কীভাবে কথক নিরাসক্ত থাকে, ফলে কীভাবে আসর রসোত্তীর্ণ হয়।
উনিশ শতকের শেষের দিকে কথকতার বড় পৃষ্ঠপোষক ছিল কলকাতায় গড়ে ওঠা হরিসভা। আসর বসত সেখানে। বেহালার প্রাচীন হরিভক্তি প্রদায়িনী সভার পুরাতন কার্যবিবরণীর পাতা থেকে টুকরো খবর তোলা যাক।১৪৪
