জবরদস্ত কথক নন, অলোচনার আসরে রসবোধের বিষয়ী হিসাবে অভাজন মানিকাকাই জাঁকিয়ে বসবেন। কিন্তু কীভাবে? আমাদের কথকরা কি এতটা জানতেন? রসের ধারণা কি তাঁদের আয়ত্তে ছিল? বেশির ভাগ কথকই বৈষ্ণব। ভাগবতী কথকতার বহু পুথিতে শ্রীধর স্বামী ও বিশ্বনাথ কবিরাজের টীকার উল্লেখ পাওয়া যায়। বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্ব রসতত্ত্বের নামান্তর, ভক্ত ও ভগবানের সম্পর্ককে নানা রসের মাধ্যমে বর্ণিত করা হয়েছে। সুতরাং কথক ঠাকুর রসতত্ত্বের ঐতিহ্য সম্পর্কে অনবহিত থাকতেন, একথা মনে করা সঙ্গত নয়। সরাসরি প্রমাণও আছে। কথকদের রচিত সংগ্রহ গ্রন্থে আখ্যানাংশ নির্বাচন ও ভাগ রস অনুযায়ী করা হত। যেমন:
‘রামায়ণ কথা সংগ্রহঃ’তে আরম্ভেই বিন্যাস এরকম: ‘নবরসঃ কিং। শৃঙ্গারোষথা সীতাহরণ শূর্পনখাঃ গমনাদি্ঃ ॥ ১ ॥ বীরো যথা রাবণ কুম্ভকর্ণবধাদয়ঃ ॥ ২॥ করুণো যথা রামস্য বনগমনাদিঃ ॥ ৩॥ অদ্ভুতো যথা সাগরবন্ধনাদিঃ ॥ ৪ ॥ হাস্যোযথা দশরথগৃহে রাম জন্ম ॥ ৫॥ ভয়ানকোযথা রাবণমারীচ সম্বাদঃ’ ইত্যাদি ॥১৩৬
আবার বর্ষীয়ান কথক কুমুদবন্ধু বলেন যে, ‘কথকতা খুব শক্ত বাবা, কথায় নবরসের বিন্যাস করতে হবে তো।’১৩৭
সরাসরি ঐতিহাসিক প্রমাণসূত্র ছাড়াও বলা যেতে পারে যে কথকতা একটা বিশেষ রকমের পাঠ। এই পাঠের মাধ্যমে কীভাবে সহৃদয় বা সামাজিক ভরতের হরিণ শিশুর হারানোর বেদনায় আকুল হন, লঙ্কায় হনুমানের কীর্তিকলাপে হেসে খুন হন? ভরত বা হনুমান কেউ পরিচিত নন, তাঁদের অভিজ্ঞতার তিনি সরাসরি শরিকও নন। শ্রোতার নিজের বোধ স্বগত, ভরত বা হনুমানের ভাব পরগত। লৌকিক ভাবের পরিমিতত্ব ছাপিয়ে যাওয়া যায় কীভাবে, কীভাবে কথকের উচ্চারিত শব্দের জোরে, পাঠের ঝোঁকে অন্য বিষয় ‘সহৃদয় হৃদয়-সংবাদী’ হয়, বিষয়ের ‘চমৎকৃতিতে’ সামাজিক-এর ‘তন্ময়ীভবনতা’ দেখা যায়, অতি সাধারণ শব্দ রসধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়? এই প্রশ্ন তাত্ত্বিক। নবম থেকে একাদশ শতকে, নানা প্রস্থানের নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে হারিয়ে যাওয়া পুস্তক হৃদয় দর্পণে-র লেখক ভট্টনায়ক অথবা ‘ধ্বন্যালোকের’ অজ্ঞাতনামা কারিকাকার, বৃত্তিকার আনন্দবর্ধন এবং লোচন, টীকাকার অভিনবগুরা সদলবলে এই প্রশ্নের মোকাবিলা করেছেন। এই প্রসঙ্গে কথকরা এই তত্ত্বের সব অনুপুঙ্খ সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন ছিলেন কিনা, তা অবান্তর, রসসৃষ্টির ক্ষেত্রে শ্রোতার ভূমিকার সাধারণ বিচারেই। রয়ে গেছে তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা।
তাঁদের রচনানুসারে, শব্দের সংকেতিত করার ক্ষমতা মান্য, বলা হয়েছে “ধ্বননং শব্দস্যৈব ব্যাপার॥” ‘শব্দজাঃ শব্দা’ ধ্বনি বলে অভিহিত। কিন্তু শব্দের মধ্য দিয়ে অভিধা ও লক্ষণার বা তাৎপর্যের শক্তি ছাপিয়ে যে ব্যঞ্জনাজন্য বোধ বা ব্যঙ্গ অর্থ সৃষ্টি হয়, ধ্বনিবাদীদের কাছে সেটাই ধ্বনির বিশেষ পারিভাষিক অর্থ। শব্দের নিজস্ব শক্তিতে এই ব্যঞ্জনার ক্ষমতা নিহিত আছে, ব্যঞ্জনার স্বতন্ত্র বোধে রস জাগ্রত হবার সম্ভাবনা থাকে। ‘শব্দনং শব্দঃ শব্দব্যাপারঃ, ন চাসাবভিধাদিরূপঃ, অপি ত্বাত্মভুতঃ, সোহপি ধ্বননং ধ্বনিঃ।’ বক্তার উচ্চারিত শব্দ ব্যঞ্জনা নামক বিশিষ্ট শক্তির দ্বারা শ্রোতার বা সহৃদয় বা সামাজিকের মনে অভিজ্ঞতাজনিত বাসনাদি সংস্কারের উদ্রেক করে, বর্ণিত বিষয়ের সঙ্গে তন্ময়ীভবনতার প্রাপ্তিযোগ হয়।১৩৮
কিন্তু এই স্তরেই ভট্টনায়ক বা অভিনবগুপ্ত ব্যঞ্জনার দ্বারা রসসৃষ্টির দুইটি ধারণার নির্দেশ করেছেন। এই তন্ময়ীভবনতা বা চিত্তবৃত্তির সঙ্গে একাত্মতা অলৌকিক, এই অনুভবনের আস্বাদনের সঙ্গে লৌকিক সুখ-দুঃখবোধের অনুভবের পার্থক্য আছে। রসচর্বণা লৌকিক ভাবের পরিমিতত্বকে অতিক্রম করে, শব্দ ব্যঞ্জনার এতই ক্ষমতা। বাল্মীকির আদি শ্লোক নিয়ে আলোচনাকালে বলা হল যে ‘ইহা লৌকিক শোক হইতে পৃথক (লৌকিকশোক ব্যতিরিক্তাং) এবং নিজের চিত্তবৃত্তির যে বিগলিত অবস্থায় ইহা আস্বাদিত হইতেছে, তাহাই ইহার একমাত্র সারবস্তু। পরিপূর্ণ কুম্ভ থেকে যেমন জল উছলাইয়া পড়ে (রসপরিপূর্ণকুম্ভোচ্চলন) তেমনই চিত্তবৃত্তির স্বাভাবিক নিঃষ্যন্দিতার জন্য বিলাপবাক্য ক্ষরিত হয়।’১৩৯ রসের এই উচ্ছলন প্রবণতার জন্য শোক আর ক্রৌঞ্চের একান্ত শোক নয়, বাল্মীকির নিজস্ব দুঃখ নয়, শোক সহৃদয়ের চর্বণযোগ্য। কিন্তু এই চর্বণা সম্ভব, লৌকিক অনুভবের পরহগত্ব বা আত্মগতত্ব অতিক্রম করা যায়, ‘রসাদি বিয়ে ভাবকত্বের দ্বারা’। রস ভাবিত হলেই ভোগ (অনুভব) করা সম্ভব। ভট্টনাকের মতে, ‘রসের সম্পর্কে যাহা বিভাবাদির সাধারণত্ব সম্পাদন করে তাহাই ভাবকত্ব।’১৪০ এই ভাবকত্বের ধারণাকে অভিনবগুপ্ত বাতিল করতে পারেননি। প্রচলিত পাঠ্যপুস্তক সাহিত্য দর্পণে বিশ্বনাথ কবিরাজ এই ‘ভাবকত্বের’ অপর পারিভাষিক নাম দিয়েছেন ‘সাধারণীকৃতিঃ’। উচ্ছলন প্রবণতা ও রসধ্বনির মাধ্যমে রসের অনুভবকে আদর্শায়িত করা ও ব্যাপ্তি দেওয়া হয়। ফলে রস সামাজিক হৃদয়সংবেদ্য হতে পারে, বহুজনীন হতে পারে। রসবোধের আলোচনায় শব্দের ব্যঞ্জনার শক্তির মাধ্যমে লৌকিক সীমা, নিছক ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার সীমাকে অতিক্রম করার বাসনা এই তত্ত্বে বার-বার স্বীকৃত হয়েছে।১৪১
