বাসন্তীদেবীর বৈশিষ্ট্য মঙ্গলাচরণে।১৩৪ তিনি এখানে নতুন ভঙ্গি উদ্ভাবন করেছেন। প্রথমে তিনি কোনও একটি দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে পালা আরম্ভ করেন। মালদহের এক সভায় গিয়ে আরম্ভ করেন যে তাঁর দামি জিনিস হারিয়েছে, চোরের নামও জানেন, কেউ খুঁজে দিতে পারবে কিনা। সভায় সাড়া পড়ে যায় তখন তিনি বলেন যে তাঁর হৃদয় হারিয়েছে, চোর শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং। আমার শোনা আসরে তিনি আরম্ভ করেন যে একজন পরিচিতের (রামবাবু) সঙ্গে তাঁর অনেকদিন দেখা সাক্ষাৎ হয়নি, কারণ তাঁর মেয়ের বিয়ে ছিল। সেই বিয়েতে অলঙ্কার দেওয়া হয়েছে, ‘কৃষ্ণ নাম শ্রবণ কুণ্ডল’, যাতে মেয়ে সবসময় কানে দিতে পারে। সেই বিয়ের অনুষঙ্গে বলেন যে শ্রোতারাও প্রত্যেকে কন্যাদায়গ্রস্ত, তাঁদের ঘরে দুইটি বয়স্থা কন্যা আছে। রতি ও মতি তাদের নাম, তাদেরও সুপাত্রস্থ করতে হবে। এইভাবে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে রূপক হিসাবে ব্যবহার করে তিনি পালার উপস্থাপনা করেন।
প্রণাম জানানো হয় গুরুকে, গ্রন্থকে, গ্রন্থ প্রতিপাদ্য শ্যামসুন্দর ও রাধারাণীকে, রচয়িতা ব্যাসদেবকে, বক্তা শুকদেব ও শ্রোতা পরীক্ষিৎকে। এবং অবশেষে অতীত ও বর্তমানের উপস্থিত ও অনুপস্থিত বৈষ্ণব ভক্ত শ্রোতাকে প্রণাম করে তিনি ভাগবতী কথা শুরু করেন। তাঁর এই রীতি প্রথানুগ।
বাসন্তীদেবীর কথকতাও ব্যাখ্যামূলক। গোবিন্দ অধিকারীর গান, মহাভারতের কাহিনী, লৌকিক দৃষ্টান্ত সবই আনা হয় তত্ত্ব প্রতিবেদনের উদ্দেশ্যে। বাসন্তীদেবীর পাঠে কিন্তু নাটকীয় সংলাপ কম। তার বর্ণনা গীতি-নাটিকার আকারে বিন্যস্ত নয়। বরং গীতি-কথিকার ঢঙে তিনি তাঁর বক্তব্য সাজান।
শৈলীতে আধুনিক কথকদের মধ্যে পারস্পরিক পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। ধরণীধর বা ক্ষেত্রমোহনের শৈলী কী ছিল, বলা যায় না। যাঁরা বর্তমানে কথকতা করছেন, তাঁরা কেউ উনিশ শতকের কথক পরম্পরার লোক নন। অতএব ধারাবাহিকতার কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। বহিরঙ্গে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু কথকতা পৌরাণিক আখ্যানমূলক, তার মূল রস ভক্তি। এই অন্তরঙ্গে বোধ হয় পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু শ্রোতা বদলেছে, ভাষায় রুচি একরকম নেই, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় নানা পরিবর্তন এসেছে। অনুষঙ্গ বোঝাতে গিয়ে, ‘ঘটকালি’ করার সময়, গান, পালার সংলাপ ও বিন্যাস, উদাহরণ চয়ন যুগোপযোগী না হলে আসর জমানো অসম্ভব। আজকের কথকরা এই কথা জানেন।
৪ শ্রোতার জগৎ
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পিতৃকুলের আর্থিক অবস্থা যে রকমই হোক না কেন, মামার বাড়ি বেশ সচ্ছল ছিল। মাতামহ ছিলেন হাওড়ার শিবপুরের ছোটখাটো জমিদার, ইংরেজ সওদাগরের হউসে বড়বাবু। এমন অবস্থায় যা হয়। উনিশ শতকীয় যৌথ পরিবারে জুটে গিয়েছিল এক গরিব পোষ্য জ্ঞাতি। সুনীতিবাবুর মানিকাকা। এই অর্ধপোয্য গরিব আত্মীয় সবার উপহাসের পাত্র। ফাই-ফরমায়েশ খাটা তাঁর অবশ্যকর্তব্য। যে কোনও বৃহৎ কাজ-কর্মে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ করার দায় বর্তাত মানিকাকার উপরই। সাদামাটা গেঁয়ো মানুষ, বিদ্যার দৌড়ও সামান্য। দুপুর বেলা একপাল বাচ্চাকে তিনি তাঁর গাঁয়ের গল্প বলতেন। জমাটি নিমন্ত্রণ রক্ষার মজাদার কাহিনী আর মাঝে মাঝে যাত্রায় দেখা, ‘কথকতায় শোনা পালা, অজামিলের কথা, রুক্মাঙ্গদ রাজার একাদশী, ধ্রুবের তপস্যা’ ইত্যাদি। সেই মুহূর্তে ভাইপো-ভাইঝি বা ভাগনে-ভাগনিদের কাছে মানিকাকাই কথক হতেন, ‘এ সব গল্প বেশ শ্ৰতিরোচক আর মনোমোহন করে শোনাতেন’। কথক ঠাকুরের দৌড় কেবল আসরে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানিকাকার মতো মানুষের মাধ্যমে একনিষ্ঠ শিশু শ্রোতাদের জমাটি আসর বসে।
মানিকাকা কথকতার আসরে হাজিরা দিতেন। কারণ ভাল ‘আক্ষেপের কথা’ শোনা তাঁর বাই ছিল। ‘চৌধুরি পাড়ায় কথকতার আসরে কথক ঠাকুর যখন কোন গম্ভীর বিষয় নিয়ে বাগাড়ম্বর করে বলে যেতেন, মানিকাকা নিবিষ্ট চিত্তে শুনতেন, আর অনেক সময়ে চোখ দিয়ে তাঁর ঝর ঝর করে জল পড়ত। তিনি তখন একাগ্র মনে, তাঁর বর্ণনা অনুসারে, দুটো “আক্ষেপের কথা” শুনছেন। তাঁর এই “আক্ষেপের কথা” শোনার আগ্রহ আমাদের কছে একটা রসিকতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’১৩৫
অবজ্ঞেয় মানিকাকা খুঁজে বেড়াতেন কোথায় ‘আক্ষেপের কথা’ শুনতে পাওয়া যাবে। বড়লোক আত্মীয়রা তাই নিয়ে ঠাট্টা করতেন। পরিবারের ক্ষমতা বিন্যাসের নিম্নতম বিন্দুতে অবস্থিত দুর্ভাগা বোকাসোকা মানিকাকা কিন্তু বার বার ওই রকম আসরে ছুটে যেতেন, এমনকি বাড়ির গুরুদেবকেও রেহাই দিতেন না। তাঁর কাছ থেকেও ‘গোটাকতক “আক্ষেপের কথা” শোনবার দাবি জানাতেন। ওই রকম আসরে তিনি তাঁর মনের আশ মেটাতে পারতেন, কাঁদতেন, তাঁর ‘একাগ্রতা’ তাঁর বিদ্রূপকারীদেরও চোখ এড়াত না।
বড়লোক আত্মীয়রা হাসতেই পারেন, কিন্তু ভট্টনায়ক, আনন্দবর্ধন, অভিনবগুপ্তদের কাছে এই জাতীয় অভিজ্ঞতার মূল্যের শেষ ছিল না। রস-সৃষ্টির আলোচনায় ভুক্তিবাদী, ধ্বনিবাদী বা রসধ্বনিবাদীরা সহৃদয়, সামাজিক বা রসজ্ঞকে আলোচনার কেন্দ্রে বসিয়েছেন। রসের প্রতীতি রসচর্বণ বা রস আস্বাদনে, সহৃদয় বা সামাজিক সেই রস আস্বাদনে সক্ষম। সহৃদয়ের রসচর্বণা ভিন্ন রসের অনুভব প্রকাশবেদ্য নয়। কাব্যরসের আধার কবিও নন, কাব্যও নয়, সহৃদয় পাঠকের মন। সঙ্গীত ও অভিনয় প্রসঙ্গেও একই কথা প্রযোজ্য।
