এদিকে আবার যখন সিন্ধু সৌবীরের রাজা রহুগন তাঁহার স্বরূপ না জানিয়া রাজর্ষি ভরতকে শিবিকাবাহক নিযুক্ত করেন—তখন হইতে কৌতূহলে ও উৎকণ্ঠায় তাহার (অপুর) বুক দুরু দুরু করে, মনে হয় এইবার একটা কিছু ঘটিবে, ঠিক ঘটিবে।১৩০
ছোট ছোট ঘটনাগুলির নিজস্ব ভাব আছে। কোনওটা হাসির উদ্রেক করে, কোনওটা বা দুঃখের। এই সব টুকরো টুকরো ভাব মিলে গোটা পালাটার মধ্যে যখন এক সামগ্রিক রস ফুটে ওঠে, তখনই কথকতা শিল্পোত্তীর্ণ হয়, গল্প বলাটা হয়ে ওঠে আর্ট।
অবনীবাবুর কথকতাটা প্রথানুগ তবু শৈলীতে দ্বিজবাবুর ‘রামায়ণীর’ সঙ্গে তাঁর পার্থক্য আছে। অবনীবাবুর পাঠ অনেকটা পাঁচালির ঢঙে, আখ্যানে গানের চাইতে পয়ারে লেখা পদ্যাংশ বেশি।১৩১ অবনীবাবুর মূল উৎস জগৎরামী-রামপ্রসাদী রামায়ণ, অষ্টাদশ শতকে রাঢ় অঞ্চলের বিখ্যাত সাধকের লেখা। ‘অদ্ভুত-অধ্যাত্ম মত, একত্র করিয়া যুত, রচনা বিবিধ রসুধাম।’১৩২ মঙ্গলাচরণের বিন্যাস এক, খালি সংস্কৃত পদগুলির বেশিরভাগ বাংলা পয়ারে গীত। আখ্যান ছন্দে বিধৃত, সংলাপও প্রায়শ তাই। পালার আগে একটি দীর্ঘ বন্দনাগান আছে। তাতে পরিচিত সমস্ত মার্গীয় দেবতা আছেন, তদতিরিক্ত কেউ কেউ আছেন। দীর্ঘ বন্দনাগানের শেষ অংশ তুলছি,
পিতামাতা চরণকমলে প্রণাম জানাই।
পিতামাতার সম গুরুভাই এই জগতে আর কেহ নাই॥
আর শিক্ষাগুরু দীক্ষাগুরু বন্দিনু চরণ।
এই আসরে আসুন শ্রীরাম লক্ষ্মণ॥
এই আসরে এসো মাগো বীণাবাদিনী।
সঙ্গে করি লয়ে এসো ছয় রাগ আর ছত্রিশ রাগিণী॥
মাগো মা, তোমার কৃপাতে মাগো রামের গুণ গাই।
তুমি মুখ ফিরালে বাক্য নাহি পাই॥
… … …
কলিযুগের দেবতা বন্দি দেবী বিষহরি।
পদ্মফুলের উপর জন্ম হয় যার শিবের কুমারী॥
কোনও পরিশীলিত আসরে, হরিসভায়, রাময়ণী বন্দনাগানে মনসার প্রবেশ অপ্রত্যাশিত। কিন্তু অবনী অধিকারীর বন্দনা দেখায় যে রামায়ণী পালাতে, বন্দনার বিন্যাসে আঞ্চলিক সংস্কৃতির নানা সূত্রে, সবকিছু ঢুকে পড়তে পারে। গ্রামে যাদের ক্ষমতা স্বীকৃত, লৌকিক আসরের বন্দনাগানে তাদের বাদ দেওয়া বিপদজনক।
ইন্দ্র ব্রাহ্মণ নন, তাই গৌতম মুনি তাঁকে সামগান শেখাননি। তখন ছদ্মবেশী ইন্দ্র অহল্যার কাছে সামগান শেখেন। অবনীবাবুর পালায় শৃঙ্গার বা জৈবিক আকর্ষণ গৌণ। অবনীবাবুর পালার বিন্যাসও একটু আলাদা। ছোট কথা, মূল সংলাপ গানে, আবার ছোট কথা, নমুনা দেওয়া যাক,
এমন সময় দেবরাজ ইন্দ্র গৌতম মুনির বেশ ধারণ করিয়া অহল্যার কুটিরে এসে উপস্থিত হইল। আর এখানে,
অহল্যা গৌতম জ্ঞানে তারে করে সম্ভাষণ।
বলে, আজি কেন প্রাতঃকালে গৃহে আগমন॥’
দেবরাজ ইন্দ্র বলে।
‘ওগো তব রূপ হইল স্মরণ।’
তোমার গানের রূপ আমার মনে পড়ল।
তাই, ‘কেমনে করি বল তপস্যা আচরণ॥’
আমি শুনেছিলান ভগবান তিনি গানে বড় সন্তুষ্ট হন। …অভিধানে পণ্ডিতগণ অর্থ করেছেন সামবেদ মানে হল গান, গানের সুরে ভগবানকে ডাকা, এর নাম সামবেদ। দেবী তুমি আমাকে একখানি গান শোনাও।
‘একদিন এ কারণে দিলেন অহল্যাদেবী তারপরে গাহিলেন গান।
গানের সুর শিখন করি দেবরাজ ইন্দ্রপুরে যান॥’
অবনীবাবুর কথকতায় পাঁচালি গানের প্রভাব আছে। গান গদ্য সংলাপের অনুসারী নয়। বরং গানের মধ্যে ঘটকালির কাজ গদ্য করেছে।
ক্ষান্তিলতা দেবীর কথা গদ্যে। তাঁর কথার চলন আখ্যায়িকার ঢঙে নয়। দ্বিজবাবুর কথকতায় গল্পের আধারে ব্যাখ্যা থাকে। কিন্তু তত্ত্ব ব্যাখ্যার প্রমাণ ও দৃষ্টান্ত হিসাবে ক্ষান্তিলতা দেবী গল্পের উপস্থাপনা করতেন বা কুমুদবন্ধু পালা লিখতেন। দুইজনের ভঙ্গি ও মেজাজে পার্থক্য এইখানে।
‘কুন্তীস্তব’ পালায় ক্ষান্তিলতা দেবীর সব গুণ, কুমুদবন্ধুর লেখার সব বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। প্রসঙ্গ নির্দেশ, দীর্ঘ ব্যাখ্যা ও সংলাপ, শ্লোক ও নানা ভাষ্যের অংশ এবং নানা গান। পালার আরম্ভে তিনি বলেন যে কুন্তীদেবীর স্তবাবলীর মধ্য দিয়ে কুন্তীদেবীর বর প্রার্থনা প্রসঙ্গে ‘ভগবান লীলাগুণ কথা’ বিষয়ে ‘কিছু আলোচনা’ করবেন। এই ‘আলোচনাই’ হল তাঁর কথকতার বিন্যাস। অর্জুনের হাতে অশ্বত্থামার পরাজয় ও পরীক্ষিতের জীবনরক্ষা হল প্রেক্ষাপট। দ্বৈপায়ন হ্রদে দুর্যোধনের উরুভঙ্গ থেকে অশ্বত্থামার পাণ্ডব শিবিরে নিশি অভিযান ও পরাজয়, উত্তরার ভ্রূণরক্ষা ইত্যাদি একটানা গদ্যে বলা হয়েছে, প্রসঙ্গ নির্দেশ করা হয়েছে। যখন প্রভাতে কৃষ্ণ পাণ্ডব শিবির ত্যাগ করতে উদ্যত তখন তাঁর সঙ্গে কুন্তী কথোপকথনে লিপ্ত হলেন। বিবৃতিতে বোঝানো হয়েছে যে কেন কৃষ্ণ পাণ্ডববন্ধু, কেন কৃষ্ণ পরীক্ষিৎকে রক্ষা করলেন। কুন্তীর মুখে ধুয়ার মতো ফিরে এসেছে, কেবল একটি বিষয়: কৃষ্ণকে দেবার মতো পাণ্ডবদের দুইটি বস্তু আছে, ‘ব্যথা মাখা অশ্রুজল’ ও ‘অবনত মস্তকে প্রণাম’, এই দুইটিকে নানাভাবে নানাগানের সংযোগে ক্ষান্তিদেবী তাঁর কথায় ব্যাখ্যা করেছেন। ব্যাখ্যাতে প্রায়শই সংলাপ দীর্ঘ। কৃষ্ণের প্রতি সম্বোধনের উদাহরণ দেওয়া যাক, ‘হে আমার করুণানিধান, হে আমার বিপদভঞ্জন, হে আমার দীন দয়াল, হে আমার পাণ্ডবসখা, হে আমার কাঙ্গালের ঠাকুর’ ইত্যাদি।১৩৩
একই বিষয়ের নানা বিচার কথকতাকে ব্যাখ্যামূলক করে তোলে। গল্পের রওয়ানির চেয়ে ভাবের তাৎপর্য প্রতিষ্ঠা হয়ে ওঠে লক্ষ্য। ক্ষান্তিদেবীর কথকতার শৈলী তাই। একটি কেন্দ্রীয় ভাবকে নানা ভঙ্গিতে আলাপ করার মধ্যে নিহিত আছে তাঁর পাঠের আঙ্গিক। নানা টুকরো টুকরো ভাবকে নিয়ে অন্য এক সামগ্রিক ভাবের আবেদন ফোটানো তাঁর অভীষ্ট নয়।
