পালার শেষও প্রথাগত। ‘রাম বল মন’ গানের কলি। তারপরে চিরপরিচিত,
যে গায়, যেবা গাওয়ায় যেবা করায় শ্রবণ,
অনায়াসে হয় তাদের পাপের বিমোচন।
চিরজীবী হনুমানকে সেইদিনের মতো বিদায় দেওয়া হয়, তিনি তো আসরে হাজির ছিলেন। (‘নিজস্থানে গমন করুন পবন নন্দন।’) কৃত্তিবাস পণ্ডিতের জন্ম শুভক্ষণ, তাঁকে প্রণাম জানানো কর্তব্য। এরপরে আগামী দিনের পালার বিষয় বলা হয়। সবার শেষে আসরে ‘ভক্তজনের’ সম্মিলিত কণ্ঠে ‘রামধুন’ দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি করা হয়। ‘ঈশ্বর আল্লা তেরে নাম’ এই ছত্রটি গাওয়া হয় না।
একভাবে বিন্যস্ত মঙ্গলাচরণ ও সমাপ্তিকরণ-এর মাধ্যমে দ্বিজবাবু প্রত্যেকটি পালার ‘ফ্রেমটি’ বেঁধে দেন। এই সরহদ্দটি প্রথাগত। ‘রামধুন’ অবশ্য সংযোজিত, বাঙালি কথকতায় এর প্রয়োগ ঊনবিংশ শতকে ছিল কিনা সন্দেহ। কিন্তু দ্বিজবাবুর উদ্দেশ্য স্পষ্ট। পালাটি রামময়, রাম-পরিকররা সবাই আছেন, আছেন ভক্ত কবিরা, আদি কবি বাল্মীকি, গোস্বামী তুলসীদাস ও পণ্ডিত কৃত্তিবাস। এঁদের বার বার দ্বিজবাবু ছুঁয়ে যান, ‘সনাতন কাব্যবীজ’-এর আধার তো এই মহাকবিরা।
দ্বিজবাবুর কথকতা গল্পপ্রধান। আখ্যানটা বড় কথা, তত্ত্বকথা মাঝে মাঝে থাকে, গান ফাঁকে ফাঁকে আসে।কথা ভক্তিরসপ্রধান। রাক্ষস বা হনুমান চরিত্র দিয়ে প্রয়োজনমাফিক দ্বিজবাবু হাস্যরস আনেন। রামের সেতুবন্ধনে কাঠবেড়ালিকে হনুমানের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ও তাই নিয়ে কাঠবেড়ালির অভিযোগ, দ্বিজবাবু গম্ভীর স্বরে বলেন ও আসরে বাচ্চারা হেসে উঠছে, এইটা আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।১২৬ দ্বিজবাবুর সূত্রও বিভিন্ন, তুলসীদাসী কৃত্তিবাসী থেকে যোগবাশিষ্ট রামায়ণ, রামরসায়ন ইত্যাদি। কিন্তু আখ্যানে লম্বা সংস্কৃত শ্লোক তিনি বলেন না, কথায় দীর্ঘ বাক্যও নেই। রামায়ণের মধ্যে প্রয়োজনে মহাভারতের গল্প এনেছেন, শবরীর উপাখ্যানে বিদুরের কৃষ্ণ সেবার কথা সাজিয়েছেন।১২৭
একটি দেশজ উপাখ্যানে কীভাবে অভিযোজন করা হয়েছে, দেখা যেতে পারে। তরণীসেন কৃত্তিবাসের নিজস্ব সৃষ্টি। রামের প্রশ্নের উত্তরে বিভীষণ ঠারে-ঠোরে তরণীর পরিচয় দিয়েছেন, ‘প্রকারেতে দিলেন প্রকৃত পরিচয়।’ এর পরে যুদ্ধ। কৃত্তিবাসের আখ্যানের মাঝে দ্বিজবাবু নিজের কথা জুড়লেন, ‘এই হল ত্যাগ…ঘর-দোর নেই, বিয়ে থা হল না, সংসার ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলাম, আর মহাপ্রভুর মত সংসারত্যাগ, বুদ্ধদেবের মত রাজ্যধন ঐশ্বর্যপূর্ণ সংসার ত্যাগ, এ দুটো সংসারত্যাগে পার্থক্য নেই? আজ একমুঠো অন্নের সংস্থান করতে পারলাম না, বহু চেষ্টা করলাম, ভাঁড়ে ভবানী, বললাম আজকে আমি আহারে সংযম করেছি আর চতুর্বিধায় [?] সামনে পড়ে আছে তবু আহারে সংযম করেছি, এ দুটোর পার্থক্য নেই?’১২৮ দ্বিজবাবু তত্ত্বের প্রসঙ্গে বেশি বাক্য ব্যয় করেন না। কিন্তু গল্পের নাটকীয়তা ও নিগূঢ়ার্থ বাড়াবার জন্য কাহিনীতে মোচড় দেন, কৃত্তিবাসের রওয়ানির রদবদল করেন। বিভীষণের পরামর্শে রাম ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করেন ও তরণী মারা যাবার পর বিভীষণ কাঁদেন, বলেন,
প্রভু করি নিবেদন।
মরিল তরণীসেন আমার নন্দন।
রাম সান্ত্বনা দিলেন। তখন বিভীষণ বলেন,
বিভীষণ বলে, প্রভু, নিবেদি চরণে।
পুত্রশোকে কান্দি হেন না ভাবিহ মনে॥
ধন্য ধন্য পুণ্যবন্ত আমার সন্তান।
মরিয়া তোমার হস্তে পাইল নির্বাণ।
…. …. ….
শত্রুভাব করি সবে পাইলা উদ্ধার।
শ্রীচরণ সেবা করি কি লাভ আমার॥
যদি পারিতাম দেহ করিতে পাতন।
বৈকুন্ঠনগরে মম হইত গমন ॥১২৯
পালায় দ্বিজবাবু বিভীষণের আক্ষেপকে অন্যভাবে রেখেছেন। পুত্রের মৃত্যুর পর সরাসরি বিভীষণ ধনুর্বান হস্তে রামকে আহ্বান করেছেন। ‘তরণীর যুদ্ধ শেষ—এবার আমার পালা। তরণী বালক, সে যুদ্ধ শেখেনি, ধরো ধনুর্বাণ, যুদ্ধ করো মোর সনে,…না তুমি আমার মিতা নয়, তুমি আমার পুত্রহন্তা॥’ পালায় রাম বিভীষণকে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তরণীকে তিনি বাঁচিয়ে দেবেন। বিভীষণ তখন জানালেন যে, অন্তর্যামী হলেও রাম ভক্তহৃদয়ের মর্ম বুঝছেন না। রামের মিত্রতায় লাভ নেই, লাভ শত্রুতায় আছে, কারণ শত্রুতা করেই তো তরণী বৈকুণ্ঠে গেল। কৃত্তিবাসে বৈকুণ্ঠে না যাবার জন্য রাম বিভীষণকে সান্ত্বনা দেন এই বলে,
শ্রী রাম বলেন দুঃখ ত্যজ বিভীষণ॥
যেই তুমি সেই আমি ইথে নাহি আন।
সাধুর জীবনমৃত্যু একই সমান॥
যতদিন রবে তুমি অবনীভিতরে।
আমার সমান দয়া তোমার উপরে॥
দ্বিজবাবুর পালায় রাম বিভীষণকে বলেন—‘বৈকুণ্ঠ যে তোমার মধ্যে এসে গেছে। বিগত কুণ্ঠা যেখানে, সেখানেই তো বৈকুণ্ঠ।’ তরণীসেনকেও ছাপিয়ে যান বিভীষণ। দ্বিজবাবুর তরণীসেন বধ পালা প্রকৃতপক্ষে বিভীষণের ভক্তির পরীক্ষার ইতিবৃত্ত। কৃত্তিবাসের মূল রসকে ব্যাহত না করে বিভীষণের ব্যবহারকে একটু বদলে দিয়ে দ্বিজবাবু গল্পে প্রতিসরণ আনলেন।
দ্বিজবাবুর পাঠভঙ্গির সঙ্গে বেতারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহাভারতের গল্প বলার ভঙ্গির মিল আছে। প্রভাবের কথা বলছি না, সাযুজ্যের কথা আনছি। দ্বিজবাবু গান করেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ গল্পে আদৌ গান গাইতেন না কিন্তু উভয়ে ভাষাকে এক তারে বাঁধেন। শিষ্ট, সাধু অথচ সহজ ভাষা। চরিত্রানুযায়ী যে ভাষার রদবদল হত তা কিন্তু নয়। স্বরে অভিনয়াংশ কম, মেয়েদের সংলাপও এক স্বরে বলেন, কোনও ‘মেয়েলি’ ভাব আনেন না। দ্বিতীয়ত ঘটনানুযায়ী ছোট ছোট ভাগে আখ্যানকে বিভক্ত করে বলা হয়। নিজের মন্তব্য, প্রশ্ন বা গান (দ্বিজবাবুর ক্ষেত্র) এই ছোট ছোট ভাগগুলির সংযোজক। ফলে গল্পের রওয়ানি তৈরি হয়, পরের ঘটনাটি শোনার জন্য কৌতূহল উসকে দেওয়া হয়। বিভূতিবাবু কথকতার ও গল্প বলার এই শৈলীকে ধরতে পেরেছিলেন। বাবা হরিহরের পাঠ শোনে অপু,
