এইরকম কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কথক প্রাণকিশোরের ছিল কিনা বলা মুশকিল। কিন্তু কথক ও শ্রোতার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে এতাবৎকাল বাংলা ভাষায় লেখা একমাত্র বইতে এই রকম পরিস্থিতিকে বাদ দেওয়া হয়নি, সেটা ভুললে চলবে না। সামাজিক মূল্যবোধের উপর গল্পের টানে কথক মতামত প্রকাশ করেন, গল্প ও কাহিনীতে মন্তব্য জুড়ে দেন। আসরের শ্রোতারা সমাজস্থ, তাতে তাদের প্রতিক্রিয়া হতে পারে, বাচকতা অভীষ্ট অর্থে না পৌঁছোতেও পারে।
আসরে নানা লোকের কাছে কথকতার গল্প নানা অর্থ নিয়ে আসে, শ্রোতারাও তাদের মত করে কথকের বয়ানের মধ্যে নিজের মানে খুঁজে পায়। শ্রোতা এ কথকের যৌথ চেষ্টার মধ্যে কথকতার বয়ান গ্রাহ্য হতে পারে। যোজিতের সঙ্গে ব্যবধান অতিক্রম করাই তো যোজকের কাজ।
লেখা থেকে বলার প্রক্রিয়া, কথার ঝোঁকে বাক্য বদলে যাওয়া, শ্রোতার দাবিতে গল্প বানিয়ে তোলা, এইসব রওয়ানির মধ্যে পড়ে। কিন্তু কোথাও এইরকম হলে চলবে না যে মূল রস বদলে যাবে, রাম হবে কাপুরুষ ও রাবণ হবে পরম সুশীল, দেশরক্ষায় রত। তাহলে কথকতায় অনৌচিত্য দোষ ঘটবে, রসাভাব হবে। সীমা যেখানে টানা হয়, বাঁধুনি সেখানে রওয়ানির সঙ্গে মেলে। এই ক্ষেত্রেও লেখা ও বলার সাম্য দরকার, টানাপোড়েন সেই সাম্যকে জোরদার করার জন্য, ভেঙে দেবার জন্য নয়।
কথকতার শৈলীতে আধুনিকতা ও ধারাবাহিকতা
কথকতা সম্পর্কিত একটি মূল্যবান প্রবন্ধে হরিপদ চক্রবর্তী মহাশয় বেশ জোরের সঙ্গে বলেছেন যে কথকতা ‘একটি অপরিবর্তিত শিল্পধারা।” যাত্রা, ঢপ গান বা পাঁচালিতে পরিবর্তনের তুলনায় প্রাচীন কথকতার সঙ্গে প্রচলিত আধুনিক কথকতার পার্থক্য খুব কম। কাঠামোর কোনওরকম তুলনামূলক আলোচনা তিনি করেননি। প্রবন্ধের উপসংহার তিনি মতামত জানিয়েছেন মাত্র।১২৪
হরিপদ চক্রবর্তীর মন্তব্য হয়তো তুলনামূলক বিচারে সঠিক। যাত্রা, পাঁচালির অনুষ্ঠান দলগত। অভিনয় ও মঞ্চেও নানা কৌশলের প্রয়োগ আজকে সিদ্ধ। ফলে পরিবর্তনের গতিও দ্রুত। পক্ষান্তরে কথকতার ব্যবহারিক শিল্প চাতুর্য কথকের উপর নির্ভরশীল। কণ্ঠস্বরের চড়াই-উতরাই দিয়ে এবং সংগীত ও শব্দযোজনা করে সব বোঝাতে হয়। কিন্তু কথকতাতেও বিবর্তনের ছাপ আছে। যতই ধীর গতিতে হোক, কথকতাও পরিবর্তন থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। পরিবর্তনের উৎস দুটি। এক, শ্রোচার রুচি ও আধুনিক প্রচার-মাধ্যমের প্রভাব। দ্বিতীয়ত, শিল্পীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
নব্বইয়ের দশকে দেখছি যে দ্বিজবাবু, বাসন্তীদেবী অথবা অবনী অধিকারী হারমোনিয়ম ব্যবহার করেন। উনিশ শতকের কথকের আসরের নানা বিবৃতিতে স্বভাবত হারমোনিয়মের উল্লেখ নেই, কারণ তখনও সেটা চালু হয়নি। এটা অবশ্যই একটি পরিবর্তন। মাইক্রোফোনও কথকরা ব্যবহার করেন।
যে সব আধুনিক কথকতার আসর শুনেছি বা তাদের পুথি দেখেছি, তাতে বলা যায় যে ‘চূর্ণীর’ প্রয়োগ আজকাল অনুপস্থিত। ওই জাতীয় বর্ণনা বা বিবৃতির সঙ্গে আধুনিক শ্রোতা আদৌ অভ্যস্ত নয়, তাদের কানই তৈরি হয়নি। কবে থেকে চুর্ণীর প্রয়োগ কমতে শুরু করল, বলা মুশকিল। কিন্তু কুমদবন্ধুর পুথিতে ‘সাট’ নেই। পঞ্চাশের দশকে ক্ষান্তিলতার খ্যাতি, ফলে তখন থেকে চুর্ণীর ব্যবহার কমে আসছে বলে অনুমিত হয়। হয়তো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে সাধারণের সামগ্রিক পরিচয় ও তার সঙ্গে সঙ্গে ভাষা প্রয়োগ প্রসঙ্গে রুচির বদল ‘চুর্ণীকে’ ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে।
প্রচার-মাধ্যমের চাপও এক-আধটু বদল আনে। দ্বিজবাবু যুগলমন্ত্রে দীক্ষিত, ‘সীতার পাতাল প্রবেশ’ পালা আসরে কোনওদিন করেননি। শুধু একবার বেতারে করেছিলেন। ধারক বা শ্রাবকও আজকাল দেখা যায় না। সবাই যে সব আসরে পুথি বা খাতা সামনে রেখে পড়েন, তাও নয়। সকলেরই একটি পাঠ লেখা আছে, তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু আসরে অনেকেই আজকাল স্মৃতি-নির্ভর। ধারাবাহিকতা থেকে যায় ভাব-বস্তুতে, রসবিন্যাসে। আধুনিক কথকদের রীতি লক্ষণীয়। দ্বিজবাবু প্রথাসিদ্ধ মঙ্গলাচরণ করেন। দ্বিজবাবুর মঙ্গলাচরণ এইরকম: সুরে পর পর পরিচিত সংস্কৃত শ্লোক আবৃত্তি; রামের বন্দনা স্তোত্র, বাল্মীকি বন্দনা, শিবস্তোত্র, ভগবতী স্তোত্র (সৰ্ব্ব-মঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সৰ্ব্বার্থ- সাধিকে ইত্যাদি), কৃষ্ণস্তোত্র (হে কৃষ্ণ করুণাসিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপতে ইত্যাদি), মারুতি বন্দনা (নমামি অঞ্জনাসুতং বায়ুপুত্ৰং মহাবলং ইত্যাদি), ব্রহ্মা বন্দনা, পর পর বলা হচ্ছে। এঁদের কৃপায় মূক বাচাল হয়, পঙ্গু গিরি লঙ্ঘন করে। তারপরে বাংলা গান, ‘রাম নাম বল, বল, এই নাম কর সার’ (কীর্তনাঙ্গ সুর)। বাংলা গদ্যে তুলসীদাসী বচন আবৃত্তি, পরে বচনটির বিস্তৃত অনুবাদ: রামায়ণ পাঠ সর্বমঙ্গলকর ও পাপহর, বৈতরণী পারের তরণীস্বরূপ। কৈলাসে শিবের মুখে পার্বতী অপূর্ব রামকথা শ্রবণ করছেন, সেইটা যেন কৃপাপ্রাপ্ত দ্বিজবাবু বলছেন। গদ্যে আবেগ মিশিয়ে দ্বিজবাবু বলেন, রামকৃপাতেই তাঁর পাঠ করা সম্ভব হচ্ছে, ‘যন্ত্র আমি, যন্ত্ৰী তুমি, রথ আমি, রথী তুমি, যেমন পরিচালনা করবে তেমনিই পরিচালিত হব, যেমন বাজাবে তেমনিই বাজবো’। আবার গান, ‘আমার হৃদয়-মন্দির মাঝে এসো রাম ধনুধারী’ ইত্যাদি। তার পরে আখ্যান শুরু।১২৫
