নাট্যশাস্ত্র একটি সংগ্রহ গ্রন্থ। এর শিকড় নিহিত আছে ব্যবহারিক ও লৌকিক অভিজ্ঞতায়। টীকায় অভিনবগুপ্ত চেষ্টা করেছেন তাঁর নিজের দর্শন চাপাতে।৯৮ লোকবৃত্তি বা লোকস্বভাবের অনুসরণে বিরামের জন্য কথকরা বলার ভঙ্গি চালু করেছিলেন, যে ভঙ্গির কথা নাট্যশাস্ত্রেও উল্লিখিত হয়েছে।৯৯ এই ভঙ্গি প্রসঙ্গে তারাশঙ্করের সাক্ষ্য হল,
নিশাপতি গম্ভীরভাবে বললে, দেবর্ষি নারদকে দেখে ব্যাস বললেন—অহো ভাগ্য! আসুন-আসুন-আসুন, দেবর্ষি সমস্কার।
নিশাপতি তখন ভাগবত কথকতার এ ষ্টান্টটুকু আয়ত্ত করেছে। সেকালে ভাগবতের আসরে এইভাবে অনেকজন আগন্তুক কথকের সাদর সম্বর্ধনায় আপ্যায়িত হয়ে বিনয় প্রকাশ করে অপ্রস্তুত হতেন। ১০০
স্বরক্ষেপণ ও স্বরভঙ্গি কথকরা অভ্যাস করতেন, আসরে সেইভাবে বলতেন। বিক্রমপুরের বাসাইলনিবাসী রাখালচন্দ্র গোস্বামী হলেন বংশগতগুরু, শিষ্যবাড়িতে তাঁকে পাঠ করতে হত, কথকতা করতে হত। গলার স্বরক্ষেপণে স্বাভাবিক নিপুণতা ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে একজন সাক্ষ্য দিয়েছেন যে ভাওয়ালে আসরে বসে বলার ঝোঁকে বলেছেন, ‘তোমার বাড়ী কোথায়?’ সামনে বসে থাকা শ্রোতা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছে, ‘হ্যাপার পরাণ গ্রাম।’১০১
এই কৃৎ-কৌশলকে মাথায় রেখে কথকরা পুথি লিখতেন। পুথির বিন্যাসে ও ভাষায় তার ছাপ আছে। পুথিসংলগ্ন হরিনাম মাহাত্ম্যের একটি চূর্ণীতি টানা বাক্য সমষ্টি লেখা আছে। অর্থ অনুযায়ী বিরামপূর্বক পড়া বিধেয়। যেমন,
ভাইরে বেদেয় হরি রামায়ণেয় হরি আদ্যে হরি অন্তে হরি হরি চলো কোন ভয় নাঞি কোন শ্রম নাঞি কোন ক্লেশ নাই মুখে হরি বললেই হয় রে অনাআশে, পরমপদ পাবে রে। ভেবে দেখো দেখি ছিলেই বা কথা এলেই বা কথা সেখানে কি কথা বলে এলে বিষয় পেয়ে ভুলে গেলে কিছু মনে নেই ধনোপার্যেণ করো গৃহ ব্যাপার করো স্ত্রী পুত্রাদির লালনপালন করো তা যত বারণ করেন নাঞি তায় করো আর থেকে ২ মুখে একাকার হরি ২ বলে ডাক গো জন্ম সফল হবে কুল পবিত্র হবে।১০২
লেখায় কোনও যতিচিহ্ন নির্দেশ নেই। অথচ পড়লেই বোঝা যায় কোথায় থামতে হবে, কোথায় বা শুরু করতে হবে। এইবার কথোপকথনের একটা নমুনা পেশ করা যেতে পারে।
এখানে দ্রৌ পাকগৃহে দ্বারে অঞ্চল পেড়ে সয়ন। নিদ্রা। এই সময় দুঃস্বা ছুটে গিয়ে চরণে পড়েছে। চোকবুজে উ॥ কেয় ঠাকুর পো? কেন? একি। চক্ষে জল কেন। উ॥ তামাদের সর্বনাশ হয়েছে। এলোকেশে সোনার প্রতিমা আঃ এই দণ্ড খানিক নিদ্রা হয়েছে কেন ঞেদের সঙ্গে বিবাদ হয়েছে। না। তবে কি মুখ ম্লান কিছু খাও নাই।… দুঃস্বা চকে হাত দিয়ে রোদন। ঘরে থেকে সাব করে বৌ এনেছিলাম। বৌরে বৌ। তাদের কেশ ধরে নিয়ে গেল। বৌরে বৌও ও। এনে দে তোর পায়ে পড়ি। বৌরে বৌ। উ॥ ভয় নাই।১০৩
উপযুক্ত অনুচ্ছেদে দ্রৌপদী ও দুঃশাসনের মুখোচ্চারিত বাক্য এক স্বরে পড়লে চলবে না, তাল ও বিরামে পার্থক্য আছে, তাই দিয়ে পরিচিতি অনুযায়ী চারিত্রিক মেজাজ বোঝা যাবে। বাক্যবন্ধ ও যতির মধ্যে রীতিনির্দেশ স্পষ্ট। পাঠ্যস্বর অনুযায়ী শ্রোতাদের কাছে বিশেষ আবেদন বিজ্ঞাপিত হবে, এই কথা মনে রাখা আবশ্যক।
বাঙালি কথকদের পাঠরীতিতে একটি বিশেষত্ব নজর এড়াবার নয়। সংস্কৃতবহুল বাক্যাবলী বা ‘সাট’ বা ‘চূর্ণীর’ প্রয়োগ বাঙালি কথকতার রীতি ছিল। অনুপ্রাস ও সংস্কৃতবহুল শব্দ পাঠের ঝোঁকে ঝংকার তোলে, অর্থ ব্যতিরেকে শ্রোতাদের অভিভূত করে থাকে। এই কায়দায় কথকরা নিপুণ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,
আমাদের দেশের কথকরা এই তত্ত্বটি জানিতেন, সেইজন্য কথকতার মধ্যে এমন অনেক কান-ভরাট করা সংস্কৃত শব্দ থাকে এবং তাহার মধ্যে এমন তত্ত্বকথাও অনেক নিবিষ্ট হয়, যাহা শ্রোতারা কখনই সুস্পষ্ট বোঝে না কিন্তু আভাসে পায়—এই আভাসে পাওয়ার মূল্য অল্প নহে।১০৪
সাটের সব শব্দের অর্থ বোধগম্য হয় না। সময় সময় অর্থও সামান্য, পুনরুক্তিতে ভরা। অথচ শব্দ ঝংকারে যে সৌন্দর্য আভাসে সৃষ্টি করে, তা শ্রবণ তৃপ্তিদায়ক। অর্থের বোধ সেক্ষেত্রে ততটা প্রয়োজনীয় নয়, হয়তো রস উপভোগের বাধক। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির বাল্য বয়সের অভিজ্ঞতাও রবীন্দ্রনাথের রসবিচারের অনুসারী। যোগেশচন্দ্রের জবানীতে,
মনে পড়ে, নয় বৎসর বয়সে রামায়ণ নিয়ে কাড়াকাড়ি করেছি। বছর পাঁচ ছয় পরে রামায়ণ কথা প্রথম শুনি। সে কি আনন্দ! কথক ঠাকুরের বাক্যচ্ছটা বুঝতে পারতাম না, কিন্তু তা-তে কিছুই এসে যেত না, খেই হারাত না।১০৫
উনিশ শতকে ‘কথকতার সুর’ বেশ চালু শব্দ। স্বরের সঙ্গে আছে সুর, গান বাঁধার কাজ। কিছু পালা তো সুরে ছন্দে লেখা হত, তাদের শিল্পীরা হতেন গায়েন। কথকদের বানানো গান বেশিরভাগ সময়ে পৃথকভাবে লেখা হত, পুথিতেও আলাদা সংযোজিত হত। গান নানা সূত্র থেকে নেওয়া হত, টুকে রাখা হত, প্রয়োজনে কাজে লাগতে পারে। কথক মহানন্দের হাতে লেখা গানের খাতা সবচেয়ে বড় প্রমাণ। শ্রীমদ্ভাগবতের পালায় লেখা থাকত হরি মাহাত্ম্য নিয়ে গান,
গৌড় শারং
হরে হর মম ভব যাতনাং নাশায়াসু বসুদেব বিশয় বশনাং। অহম্মদ মত্ত তব জ্ঞান বিহীনে দীন হীন রামধনে সদাবিষয় নিপুণে বিতর করুণাং। ১॥ আলিয়া। ইহ মে ভবে রাঘবে কিম্ভবে। অহমিহ সদামত্তো বিশয়াসবে। তব ভজন পূজন মনাদযত্য মম মনঃ॥ মুহ্যতি সতত মহং মামতি রবে॥ নিবাস সংসার বনে ছিদ্রবহুল ভবনে॥ নিত্যভয়ে কলিকাল চোর সম্ভাবে ॥ সদা মহা মোহনিশী তেন দীনোদ্ধব ত্রাসি রাম তব তব শুনৈশি পদপল্লবে ॥ ১ ॥
