রামপদ ভট্টাচার্য গানটা লিখেছেন, ‘রাম’ কথাটি ভণিতায় আছে।১০৬ কিন্তু গানটা লেখা আছে আলাদাভাবে, পালার কোনও অনুচ্ছেদের সঙ্গে যুক্ত নয়। ভাগবতী পালা। ফলে চূর্ণীর মতো সময় বা জায়গা বুঝে গানটা গাওয়া যাবে, বেমানান হবে না।
আবার সময় সময় পালার সংলাপের মধ্যে গান রাখা হত।
কোন গপি রাধিকারে বলছেন শখিরে আর কালার প্রেমে কাজ নাই। তখন রাধিকা শখিরে অমন কথা বলিশ নে। শখী॥
গান॥ শে কালো সামান্য কালো নয়। বেদাগমে কয়॥ মহাজোগী মহাকালো কালোভবে জোগী হয়॥ কিবা দিবা রাত্রো কালো না ভাএে কালাকালো সর্বদা জে ভাবি। কালো নাহি তারো কালো ভয় ॥১০৭
দ্বিজরাজ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি কথকদের আসরে বসলে মনে হয় সে আখ্যানে গানের ভূমিকা সবসময় গল্পের অঙ্গ নয়, বরং অলঙ্কার। কাহিনী বলার ফাঁকে ফাঁকে বিরতির জন্য, গান দেওয়া হয়, বৈচিত্র্য আনা হয়, তা না হলে বিবৃতি একঘেয়ে লাগতে পারে। কথা থেকে গান, গান থেকে আবার কথায় যাওয়া যেতে পারে। হনুমান ভরদ্বাজের আশ্রমে যাচ্ছেন, যেতে তো সময় লাগবে, ওই সময়ে আকাশপথে বর্ণনা না দিয়ে, হনুমানের মুখে দ্বিজবাবু গান বসিয়ে দিলেন,
‘বিমল আনন্দে, সুললিত ছন্দে জগদানন্দে ডাকোনারে’১০৮
আবার লঙ্কায় হনুমান বৃদ্ধবেশে শিবভক্ত রূপে প্রবেশ করবেন, তখন মুখে শিবস্তোত্র স্বাভাবিক, হনুমান শিবস্তোত্র আবৃত্তি করতে লাগলেন, দ্বিজবাবুও স্তোত্র সুরে গেয়ে উঠলেন,
‘শঙ্কর হর পরমেশ, পতিত পাবন দীনেশ।’১০৯
কিন্তু কোনও কোনও সময় গানের মাধ্যমে তত্ত্বকথাও বলা হয়। কাহিনীর অন্তর্নিহিত ভাব সুরেলা কথায় যত সহজে গ্রাহ্য হবে, আর অন্যরূপে হওয়া সম্ভব নয়। বাসন্তী দেবী এই রীতিতে সিদ্ধা, দ্বিজবাবুও প্রয়োজনে গানের এইরকম ব্যবহার করেন। হনুমান তাঁর বুক চিরে রাম-সীতার যুগল মূর্তি দেখাচ্ছেন, সেটা রূপক, তার তাৎপর্য গানে ব্যাখ্যা করা হল, ‘জয় মহাবীর জয়॥’ কথকতায় গান এখানে যাত্রার প্রচলিত বিবেকের কণ্ঠে সঙ্গীতের ভূমিকা পালন করেছে।১১০
গান সংগ্রহ করা রীতি, একজনের লেখা গান অন্যে গাইতে পারতেন। গানও নানারকম, রামপ্রসাদী, কীর্তন, বাউলাঙ্গ, রাগপ্রধান, স্তোত্র ইত্যাদি। সব সুরই যে সহজ সরল, এই কথা মনে করার কোনও সঙ্গত কারণ নেই। অধুনা নিব্রত ব্রহ্মচারী তাঁর। ভাগবত পাঠে স্বচ্ছন্দে রজনীকান্তের গান সুযোগ মতো ব্যবহার করেন।১১১ মহানন্দও গান প্রযোগে উদার মতাবলম্বী ছিলেন। দাশরথি রায়ের গান কথকরা গাইতেন কারণ ভাব ও সুরের ক্ষেত্রে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, জনপ্রিয়ও বটে।১১২ পুথিতে দেখা যায় যে গান যেন শুনতে শুনতে লেখা হচ্ছে, আঁকাবাঁকা লেখা, আবার অপর পৃষ্ঠায় একই গানের পরিষ্কার অনুলিপি করা হচ্ছে। এক পাতায় এক পিঠে চূর্ণীর কয়েকটা ছত্র, ‘পরমধার্মিক দ্বের্দণ্ড প্রবল বল প্রতাপান্নিত, দুষ্টদমন শিষ্টপালন’ ইত্যাদি বলে পরীক্ষিতের বর্ণনা, অপর পিঠে গানের কয়েকটা টুকরো ছত্র ‘সোনার চাঁদ গোঁড়াচাঁদকে পাণল করিলে’ ইত্যাদি।১১৩ এইগুলি নানা জায়গা থেকে চলতি অবস্থায় নেওয়া হচ্ছে, এইটা স্পষ্ট। ষষ্ঠীর দিনে স্থানীয় কথক এসেছেন, তম্বুরা নিয়ে প্রচলিত আগমনী গীত গাইলেন। ফরমায়েশ মতো একটি নতুন গান গাইলেন, গানটি ওই আসরের এক ১৪/১৫ বৎসরের কিশোরের লেখা, কিশোরটির নাম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।১১৪
গান যাই হোক না কেন, যেই শিক্ষক হোক না কেন, কথকতার আসরে গানের আবেদন সামগ্রিক। পাঠক্রমে স্বরগুলির একক প্রয়োগ বিবেচ্য। কিন্তু যখন সংগীতের মাধ্যমে রসসৃষ্টি হবে, তখন প্রযুক্ত স্বরগুলির সামগ্রিক আবেদনে ভাবটি ধরতে হবে। স্বরলিপি কাঠামো মাত্র। গায়কী, কণ্ঠ, পদ ও সুর মিলিয়ে ভাব রূপপরিগ্রহ করে, শ্রোতাকে মগ্ন করে। কথকের আসরে সংগীতের সামগ্রিকতা অনুভবের বিষয়, লেখা বা বলার মধ্যে সব ধরা যায় কিনা সন্দেহ। তবুও রসভুক্তির একটি পরিস্থিতির বর্ণনা দেওয়া যেতে পারে। অনুরূপা দেবীই আমাদের ভরসা।
সেদিন কথা শেষে সঙ্গীত হইয়া সভা ভঙ্গ হইল। সেই তাল লয় যুক্ত স্বর ও সঙ্গীতের উদ্দীপনা সঙ্গীত শেষ হইলেও বাণীকে অনেকক্ষণ অবধি মন্ত্রমুগ্ধ করিয়া রাখিল। ভ্রাতৃরূপে পরিকল্পিত শ্রীভগবানের উদ্দেশ্যে সদ্য-পুত্র-শোকাতুরা সুভদ্রার গীত, গীতটির মর্ম্ম এইরূপ…জান নাকি তোমার দেওয়া এ জীবন সকল আলোক যদি নিবিয়া যায় তথাপি তোমার আলো এ জীবন হইতে নিমেষের তরেও নিবিবে না। তুমিই আমার অভিমন্যু, তুমিই আমার অর্জুন, তুমিই আমার বাসুদেব, তুমিই আমার সব, আমার সবই তুমি প্রভু।…সঙ্গীতের শেষ কম্পন বৃহৎ খিলানের মধ্যে বিলীন হইয়া গেল। ইহার পরও কিছুক্ষণ কেহ বাক্যোচ্চারণ করিল না।…কথক থামিয়া গিয়াছে, সে (বাণী) এতক্ষণ কিছুই জানিতে পারে নাই। এতক্ষণ সে মন্ত্রমোহে আচ্ছন্নবৎ হইয়া সুভদ্রার কথাই ভাবিতেছিল।১১৫
কথকতায় তাৎক্ষণিকতা
উনিশ শতকের প্রথমদিকে রাইপুর থেকে নীলকণ্ঠ দেবশর্মা নানুরে জানাচ্ছেন:
নিবেদনমিদং, শ্রীযুক্ত দাদামহাশয় ৮ রোজ এ বাটিতে পৌচিআছেন এবং ৯ রোজ পুরাণ আরদ্ধ বাবুদিগ্যের বাটিতে হইআছে জানিবেন লাভাদির কিছু হয় নাই কথকথা উত্তম হইতেছে সকলের মনহিৎ হইআছে আর উত্তর উত্তর ভাল হইতেছে…১১৬
