সময় সময় কথান্তরে যাবার খাতিরেও প্রশ্নোত্তর রাখা হত, যাতে করে বলাটা বেখাপ্পা না হয়ে যায়। যেমন কালিয়দমন পালার একজায়গায়,
রাজা উ॥ গুরো গা এ কেমন হলো। এই আপনি পূর্বে বললেন ফানী-এর বিশ তেজেতে জমুনার উভয় তীরে বৃক্ষলতা ঔষধি তৃণ পর্জন্ত জলিত হয়েছিলো। কিন্তু সে স্থানে কদম্ববৃক্ষ কিরূপে জীবিত ছিল। শুদেব উ॥ মহারাজ কি শ্রোতা॥ আপনি॥ আপনারে শ্রোতা পেত্রে আমি কৃতার্থ হলাম। মহারাজ শুন শুন। এই কদম্ববৃক্ষ কিরূপে জীবিত ছিল তাহার কারণ শুন..৯০
এই কথার পরে অন্য কথা শুরু হয়, গরুড়ের অমৃত আহরণ ও কদম্ববৃক্ষে রেখে ক্লান্তি অপনোদন। প্রাসঙ্গিক ভাগবতী শ্লোকে কদম্ববৃক্ষের উল্লেখ আছে, একটানে গল্পের ফাঁকে ঘটনাটি একটি শ্লোকে বলা হয়েছে। প্রশ্নোত্তরের রীতি ভাগবতে আছে, প্রথাসিদ্ধ। কথক ঠাকুর সেই রীতি ব্যবহার করে কথান্তরে গেলেন। ভাগবতে অনুষঙ্গ একটি শ্লোকে সারা হত, কথকতায় সেটা এক পাতা জুড়ে চলল, বেতালা মনে হল না। প্রশ্নের উত্তর হিসাবে যে আখ্যানটা বলা হয়েছে।
সংস্কৃত রসশাস্ত্রের বিচারে ‘কথা’ ও ‘আখ্যায়িকার’ বহিরঙ্গ নিয়ে ভামহ ও দণ্ডির কুটকচালি তর্ককে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছিলেন বাণভট্ট। একটি নিবন্ধে এই তর্কের বিবর্তন নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা করেন সুশীলকুমার দে। শেষপর্যন্ত ‘রসেই’ কথার পরিণতি। আলোচনা থেকে ‘কথার’ দুইটি নান্দনিক সূত্র পরিষ্কার।৯১ মহাভাষ্যের টীকাকারেরা আলোচনায় বার বার ‘গ্রন্থিক’ শব্দটিকে কথকের প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহার করেছেন, ধারণা গ্রন্থনের, কথনের।
বাঁধুনি ও ‘গাঁথনি’টা জরুরি। শ্রোতাদের মজলিশে ‘কথা’কে গেঁথে তোলা কথকের কাজ। সেইখানে কাহিনীর উৎসবিচার ততটা প্রাসঙ্গিক নয়। কথা জমাটি হচ্ছে কিনা, জমাটি কথা জমায়েতকে ধরে রাখতে পারছে কিনা, সেইটা বিচার্য। এই জমাট বাঁধার গুণ আবার নির্ভর করছে কথকের বুদ্ধিতে বিষয় কীভাবে অধিগত হল, তার উপর। কথকী রীতি কেবল গ্রন্থগত নয়, স্বকীয় বুদ্ধিতেও বটে।৯২
তাঁর বিচারে ভামহ জানিয়েছেন যে কথা হল পুরোটা রচা কিন্তু কথায় প্রবাহ থাকতে হবে।৯৩ প্রবন্ধের ‘ভাবিকা’ গুণ থাকে, তার প্রসাদে অতীত ও ভবিষ্যৎ মানসচক্ষে প্রত্যক্ষ হয়। এই ‘ভাবিকত্ব’ বা ভাবিকা সিদ্ধ হবার অন্যতম শর্ত ‘কথায়াঃ স্বভিনীততা’, কথাপ্রবাহ। উর্দুতে ‘স্বভিনীততার’ সুন্দর প্রতিশব্দ হল ‘রওয়ানি’। ‘বাঁধুনি’ ও ‘রওয়ানি’, এই দুটি গুণ যখন পরস্পরের প্রতি স্পর্ধা নিয়েও ‘সাম্যে’ অবস্থান করে তখন কথা হয়ে ওঠে শিল্প রসে ভরপুর। ‘কথায়াং সরসং বস্তুং গদ্যৈরৈব বিনির্মিতম্।’৯৪
ভামহী ধারণানুসারে সরসবস্তু গদ্যে লিখিত হলেও তাকে ‘শ্ৰব্য’ বা শ্রবণমনোহর হতে হবে। স্বর ও সুর সংযোগে শ্রবণীয় কথার চমৎকারিত্ব বা মনোহারিত্ব বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে সহযোগের, ঘটকালির চিন্তা কার্যকর। ‘সহিতের’ তত্ত্বে স্বর ও সুর সংযোগে শব্দ গ্রন্থনা ও তার পাঠ হয়ে ওঠে কথকতা।
স্বরের কথা, সুরের খেলা
মন্দিরের পুরোহিত ও টোলের অধ্যাপকের পদ নিয়ে দুই ব্রাহ্মণ যুবকের মধ্যে জবর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। লাজুক অম্বরনাথ এবং চতুর ও বাকপটু আদ্যনাথ। এই লড়ায়ের ক্ষেত্র হল কথকতার আসর। জমিদার কন্যা বাণী সমজদার, ছেলেবেলা থেকে কথকতা শুনে তার কান তৈরি। স্নানযাত্রা থেকে ঝুলন পর্যন্ত মাসাবধিক কাল আসর বসে, গ্রামবাসীরাও শোনার অভিজ্ঞতায় কম যান না, তাঁদের গ্রামে ভাগবতী কথকতা প্রতি বৎসরে অনুষ্ঠিত হয়।
‘মুখচোরা অম্বর’, নিজের চিত্তরঞ্জনের জন্য ‘শুধু নীরবেই পাঠকার্যে’ অভ্যস্ত। ফলে কথকতার আসরে বসে তার করুণ অবস্থা হয়। পাঠকার্যে অনভ্যাসের দরুণ,
সে ঘামিতে লাগিল। কথা বলিতে বলিতে মধ্যে মধ্যে সে থমকিয়া থামিয়া পড়ে, কণ্ঠ যেখানে তারায় তুলিতে হইবে, সেখানে উদারায় নামিয়া আসে, যেখানে হর্ষে উচ্ছ্বসিত হইয়া কহিতে হইবে, সেখানে কণ্ঠ বাধিয়া নবোঢ়া বধূর মত লজ্জায় অস্ফুটতর হইয়া আসিয়া হয়ত শেষে থামিয়ে যায়।… শ্রোতার দল প্রসন্ন হয় না, বক্তা লজ্জায় মাটি হইয়া যাইতে চাহে।৯৫
আদ্যনাথ দক্ষ কথক, তাঁর কথকতা স্বরক্ষেপণে সিদ্ধ। তাঁর কথকতা শুরু থেকেই জমে ওঠে।
স্ফীতবক্ষে টগর ফুলের মালা পরিয়া কন্ঠস্বর কখনো পঞ্চমে কখনো ভৈরবীতে কখনো বেহাগে কখনোও বা আবার ললিত রাগিণীতে উঠাইয়া নামাইয়া হাসাইয়া কাঁদাইয়া নদীতরঙ্গের মত অবলীলায় যে বাহিত করিয়া দিয়াছে, সে আদ্যনাথ।৯৬
ভুদেবের পরিবারের মেয়ে লেখিকা অনুরূপা দেবী, কথকতা তাঁর পরিচিত শিল্প। তিনি জানেন যে কথকী দক্ষতার অন্যতম উৎস হল স্বরের কুশলী নিয়ন্ত্রণ।
ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্রে ‘কাকুস্বররঞ্জক’ অধ্যায়ে স্বর প্রয়োগের রীতিনীতি নিয়ে আলোচনা আছে। ভাব সৃষ্টির সঙ্গে স্বর প্রয়োগের যোগ নিবিড়। ভাব অনুযায়ী, পরিস্থিতি অনুযায়ী, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন। কোথায় তা হবে মন্দ্র (কণ্ঠস্থ বিলম্বিত ধ্বনি), আবার কোথায় হবে দীপ্তা। প্রযোক্তৃদের প্রতি অনুপুঙ্খ নির্দেশ আছে। ‘ভাবেষেতেষু নিত্যং হি নানারসসমার্শয়াৎ।’ কণ্ঠস্বরের ওঠানামার সম গুরুত্বপূর্ণ বিরাম। বিরামের প্রযত্ন আবশ্যক, বিরাম অর্থসূচক। বিরামই ‘অর্থসমাপ্তি নিমিত্তং’ এইকথা অভিনবগুপ্ত তাঁর টীকায় মনে করিয়ে দিয়েছেন।৯৭ বিরামে গোলযোগ হলে অন্য অর্থ হবে।
