শিবের বিবাহের পর শিব বাড়ি যান না, ঘর জামাই হয়ে থাকেন, মেনকার জ্বালার অন্ত নেই। কথক রামপদ ভট্টাচার্য নিজে একটি বাক্যে প্রেক্ষিত ঠিক করেন, পরে মেনকার উক্তি বসান:
এখন শশুর বাড়িতে অধিককাল থাকলে সকলে বিরক্ত হয়। একদা মেনকা উ॥ আমি একলা মেয়েমানুষ কদিক করবো। প্রত্যহ আর জামাই আদর কর্ত্তে পারি না। উমাও ঘরের একখানি কাজ করবে না। কেবল দুজনে খাবেন আর ঘরের ভিতর রাতদিন বসে থাকবেন, দেখে দেখে গা জ্বলে যাচ্ছে। জামাইটি মানুষ হয় না। কেবল ভাঙা ধুৎরা খাবে আর চিরকাল শশুরবাড়ি বসে থাকবে। এদের উপায় হবে কি।৮৪
‘ইতিহাস শৃণু’, এই বললেন একজন কথক। ‘এখন শশুর বাড়িতে অধিককাল থাকলে সকলে বিরক্ত হয়’, এই কথা লিখলেন আর একজন। অতীত ও বর্তমান দুটোই বলা যেতে পারে, পৌরাণিক সময়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বর্তমানকে মাথায় রেখে মেনকা উচ্চারণ করেন লাখ কথার এক কথা ‘এদের উপায় হবে কি? উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে গ্রাম বাংলার বা মফস্বলী শ্রোতার কাছে প্রশ্নটা পরিচিত, তাৎক্ষণিক। পৌরাণিক আখ্যানের মধ্যে বাস্তব উঁকি মারে।
আবার কতকগুলি আখ্যানের ঝোঁক এইরকম, যে তত্ত্বকথা আনতে হয়, না হলে মূল্যবোধের সঙ্কট দেখা যাবে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে লালিত নৈতিকতা মার খাবে। ‘রাসলীলা’ কথকতার অতি জনপ্রিয় আখ্যান, বৈষ্ণবীয় তত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দু অথচ লৌকিক ক্ষেত্রে তার তাৎপর্য ‘উচ্ছৃঙ্খলতার’ জন্ম দিতে পারে। নানাভাবে কথকতার পুথিতে এই সমস্যাকে মোকাবিলা করতে হয় কারণ শ্রোতাদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা তো আর কম নয়। তাই পুথিতে সরাসরি সমস্যা উত্থাপন করতে হয়, পূর্বপক্ষ ও সিদ্ধান্ত পক্ষের ধাঁচে তাকে নিরসনও করতে হয়। উদাহরণ দেওয়া যাক।
এক উপপতি শেবা অতি ভয়াবহ কৰ্ম্ম। কোন গৃহস্থের গৃহে গমন করলে পর তাকে সমাদর করে না। নিকটে বশতে দেয় না। সকলের নিকট খাটো হয়ে থাকতে হয়। অধিক কি বাড়ির কর তাকে বলতে হয় চাকর বাবা ভাৎ খাও এসে। সে বলে জায় না ঠাকরুণ তোমার স্বভাব ভালো নয় তোমার হাতের অন্ন ব্যঞ্জন ভোজনে ইচ্ছা হয় নাই। দেখোদেখি এমনি কর্ম্ম চাকরের নিকট খাটো হয়ে থাকতে হয়।৮৫
এইরকম সামাজিক অবস্থায় গোপীদের প্রেম কেন সমর্থনীয়? যুক্তি দেওয়া হচ্ছে:
এক জে অমৃত তারে বিশ জ্ঞানে পান কল্লেও অমর করে। এক অমৃতজ্ঞানে পান কল্লেও তাতেও অমর করে। অমৃতের কার্জ যে অমরত্ব প্রদান ত্তাই করে থাকে। তেম্নি পরমাত্বা জে হরি তাকে গপি শকল উপপতি বুদ্ধিতেও চিন্তা করেও গুণময় দেহ ত্যাগ করে নিত্য দেহ পেয়ে কৃষ্ণ নিকটে সর্বাগ্রে গমন কল্লেন। …জে কাম নরকপ্রদ সেই কাম জদি ঈশ্বরে অর্পণ করতে পারো তাহলে সে মুক্তি লাভ করে। জে জেভাবে চিন্তা করুগ। তা হল্লেও তো ঈশ্বর চিন্তা হয়॥৮৬
কিন্তু কৃষ্ণের তরফে যুক্তি কী? সমস্যা প্রশ্নাকারে রাখা হল, পূর্বপক্ষ স্থাপিত হল।
পর স্ত্রি জে গোপীসকল তাহার সহিৎ রাশ ক্রিড়া কল্লেন। এতে ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ হলো। জদি বলেন আপ্তকাম পুরুষের ইহা অধর্ম্ম নয়।… আমার এই জিজ্ঞাশ্যো। জদি। জদুপতি শ্রীকৃষ্ণ আপ্তো কাম তবে কি অভিপ্রায়ে নিন্দিত কৰ্ম্ম করলেন। এ বিষয়ে আমার সংশয় উপস্থিত হয়েছে।৮৭
সংশয় নিরসন করা হল, পূর্বপক্ষের আপত্তি খণ্ডন করা গেল।
ধর্ম ব্যতিক্রমো দৃষ্ট।…জেমন শর্বভুক অগ্নি সকল ভোজন করেন বিষ্ঠাও ভোজন কর্চ্ছেন এবং গো-মহিশাদি ভোজন কর্চ্ছেন। তা বলে কি তিনি অপবিত্র হন। সেই অগ্নি আবার যজ্ঞিয় হবি ভোজন করে থাকেন।
…জদি বলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আপ্তকাম হয়েও॥ তিনি এরূপ কার্জে কেননা প্রবিত্ত হয়েন ॥ এ বিষয়ে আপনি শ্রবণ করন। জদিও ভগবান আপ্তকাম তথাপি ভক্তজনের প্রতি অনুগ্রহ করার নিমিত্ত মনুষ্যদেহ আশ্রয় করে এইরূপ রাশক্রিড়া করেন।৮৮
আর শেষ কথা হল সব কাজ সবার সাজে না, ক্ষমতার তারতম্য আছে। দেবতা বলে কথা। ক্ষমতার ভাষাকে শেষপর্যন্ত রূপান্তরিত করা হয় যুক্তিতে,
…জেমন রুদ্র মহাদেব ব্যতিরেকে অন্য ব্যক্তি বিশ পান কল্লে তৎক্ষণাৎ মুত্যু হয় তেমনি কোন মূঢ় ব্যক্তিরা জদি মনে করেন ॥ জে কৃষ্ণ রাসলীলা করেছেন এবং বস্ত্রহরণ করেছেন আমরা তাই করবো অই কথা মনে করো॥ জদি সেই কার্যে প্রবৃত্ত হয় তৎক্ষণাৎ তার মৃত্যু হবে।৮৯
যুক্তিগুলি আদৌ নতুন নয়। ভাগবতে রাসলীলা প্রসঙ্গে অনুরূপ কথা বলা হয়েছে। পরীক্ষিৎ প্রশ্ন করেছেন, শুকদেব বলেছেন; আত্মকামত্ব, অগ্নির সর্বভুকত্ব, রুদ্রের বিষপান ইত্যাদি অনুষঙ্গগুলি উল্লেখ ভাগবতসম্মত। কিন্তু ভাষার প্রয়োগে বলার ঝোঁকে তারতম্য ধরা পড়ে। শাপমন্যি নতুন করে পাঠক্রমে ঢোকানো হলে। ভূত্যরা যে গিন্নির হাতে খেতে চায় না, ঠাকরুনকে অমর্যাদা করে, এটা সংযোজিত। থাকবন্দী সমাজে কর্ত্রীর মর্যাদা, অধিকারভেদ যে ভক্তির পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে, ভাগবতী আখ্যানের এই সূত্রকে বিশেষভাবে নজরে আনাটা কথকের কাজ। তত্ত্বকথা পরিবেশনের ক্ষেত্রে ভাষ্যকার ও টীকাকারের সঙ্গে কথক মিশে যাচ্ছেন।
সমাজে পাতিব্ৰত্য এবং গোপীদের পরকীয়া প্রেম, এর মধ্যেকার দ্বন্দ্ব মেটাতে কথায় নানা যুক্তি আনতে হয়, উপমাকে, দৃষ্টান্তকে ব্যবহার করা হয় যুক্তি হিসাবে, শেষে শাপের ভয়ও দেখাতে হয়। কথক ধর্মবক্তাও বটে, তাকে পরম্পরাগতভাবে গল্পও বলতে হবে আবার লক্ষ্য রাখতে হবে যে সামাজিক স্থিতি না ভেঙে যায়, তাহলে শ্রোতার সমাজই বদলে যাবে, আসরের উদ্দেশ্য মার খাবে।
