কথার অন্য লক্ষ্মণ বিচারে দণ্ডী নির্দেশ দিয়েছেন প্রাকৃতেও কথা গ্রাহ্য। ভারতের শ্রেষ্ঠ কথা সংগ্রহই তো লেখা হয়েছে, ‘ভূতভাষায়’। যে কোনও কথকতার পুথিতে নানা ভাষার সমন্বয় চোখ এড়াবার নয়। এক দিকে সমাসবদ্ধ দীর্ঘ বাক্য, বর্ণনা, সাট অন্য দিকে যথাস্থানে সুযোগ মতো পরিস্থিতি বুঝে একেবারে লোকজ সংলাপ। একটা নজির দেওয়া যাক:
ক্রমশ দেবকীর গর্ভ বর্ধিত হতে লাগিল। একদা মথুরাবাশিনী স্ত্রি শকল কুম্ভকক্ষে যমুনার জল আনয়ন করিতে গমন করিতেছে পথিমধ্যে মনে ২ ‘অ দিদি চল ন্না একবার দেখে যাই কারাগৃহে বসুদেব দেবকী কি কর্চে। অম্নি জাৎ লোকের ভাল্লয় হগ, আর মন্দই হগ, না দেখলে যাবেন না।’ পথিমধ্যে কুম্ব রক্ষ্যা করে কারাগৃহদ্বারে গমন করে দ্বারের উভয় পার্শ্বে হস্তার্পণ করে দাড়িএে দেখেন দেবকীর বশুদেবের রূপেতে করে কারাগৃহ জেন আলোকিত হএেচে। দেখে বলেন মাগো বসূদেব রূপেতে জেনো ফেটে মরচে। মাগির কিরূপ হএেচে। মাগিদিগে চাও জায় না। মিনশে জেন রূপের কাঁদি হয়েছে। কোন স্ত্রি বলেন তা অমন হয়। জতো বেটা বেটি মরে বাপ মাএের রূপ হয়, গতর লাগে।৮০
বর্ণনা সাধুভাষায়, তৎসম শব্দযুক্ত সংলাপে শব্দ প্রয়োগের ধরন একদম অন্যরকম ‘মাগি’, ‘গতর’, ‘রূপের কাঁদি’ ইত্যাদি প্রাকৃত শব্দ প্রয়োগে বাছ-বিচার নেই। যা কথায় স্বাভাবিক, পুথিতে হুবহু তাই বসানো হয়েছে। এই স্বচ্ছন্দ ‘গুরুচণ্ডালি’ কথকতার ভাষার জোর; কেবল স্ত্রীদের সংলাপেই নয়, পরিস্থিতি বর্ণনাতেও এর লাগসই প্রয়োগ দেখা যায়। বৃন্দাবন থেকে মথুরায় কৃষ্ণকে আনার জন্য দূত চাই; দূত খোঁজার আয়োজনের বিবৃতি লক্ষণীয়:
বৈষ্ণব না হলে বিশ্বাস করে আসবে না। একজনা বৈষ্ণব দেখ। এই সুনে মালা ছিঁড়ে তিলক পুছে সব পলায়ন। একজন দেখে বলেন ঐ বৈষ্ণব কিহে তুমি বৈষ্ণব নও। কোন পুরুষেই নই। অপ্রলাপ কথা জাকে জা নয় তাই বল। উুহু মসয় পাওয়া যায় না। একজন বলে অক্রূর মালা হাতে করে না। হাঁ হাঁ ডেকে আন। উনি শুনে বাড়ী গিয়ে লুক্কাইত। অক্রূরের স্ত্রী বলে বড় হাঁপিয়ে এলে জে। চুপ কর ২। তুমি হাতের কগাছি রাখবে না খুয়বে বলত। কংস দূত ধর্তে আসছে। তুমি জেন প্রকাশ করো না। আ মলো পোড়া কপালের দশা। তেমন মেয়ে নই বলবার জন্য মর্চ্চি। এমন কালে কংস দূত আগমন কোথা গো অক্রুর বাড়িতে আছ।৮১
সংলাপ ও ভাষার বিন্যাসে নাটকীয়তা সৃষ্টি করা হল। মথুরায় ত্রাস ও শোরগোল, সেই মেজাজের সঙ্গে তাল রেখে ভাষা ও সংলাপ সাজানো হচ্ছে যাতে করে বলার সঙ্গে সঙ্গে ওই ভাব কথার বাঁধুনিতে ধরা পড়ে। বিবৃতির বয়ানটা প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ নয়। ‘যদুশ্রেষ্ঠ’ কংস-পার্ষদ অক্রূর রূপান্তরিত হচ্ছেন ভক্ত কিন্তু ভীরু বৈষ্ণবে।
আবার আর্তির ও আসন্ন অপমানের ভয়ের মেজাজকে ধরা হয়েছে সরাসরি সংস্কৃত শ্লোক ও টেনে টেনে বাক্য রচনার মিশেলে। পাশাখেলায় পাণ্ডবরা পরাজিত হবার পর। একটি পুথিতে দ্রৌপদীর অবস্থা ও মানসিকভাবের পরিচয় দেওয়া হয়েছে এইরকম ছত্রে:
মহারাজ জন্মেজয় কি কর্বো। রাজসূয়াবভূমে জনেন মহাক্রতৌমন্ত্রপূতেন শিক্তাঃ। সা পাণ্ডবানাং পরিভূয়বীর্যবলাৎ প্রমূষ্যাধৃতরাষ্ট্রিয়েন। উ॥ মৃত্যু উপস্থিত বুঝি॥ কি হলো রে॥ বাড়িতে ডেকে এনে এই করলে। ধন নিলে॥ এই অপমান॥ গোবিন্দভিষিক্ত এ কেশ। কালশাপ দংশিলে সে বিষত্রাণ পাবি নে।৮২
কথকতায় ভাষা বদলের এই নজরকাড়া রীতি বঙ্কিমের সমজদারিতে ধরা পড়েছে। তাঁর মতে, কথকতায় নানা অঙ্গ, ব্যাখ্যা, বর্ণনা, পদাবলী ও গান। প্রথম অঙ্গে ভাষা সংস্কৃতানুসারী, জমাট ভাবকে শিথিল করে। পরিস্থিতি বর্ণনায় আবার ভাষা প্রয়োজন বোধে জমাটি, সংস্কৃত-অভিসারী। পদাবলীর উদ্দেশ্য ঝঙ্কার ও লালিত্য তৈরি করা; রসানুযায়ী গানের ভাষার রকমফের হয়। কিন্তু এই সবের মধ্যে কথকতার ভাষার নিজস্বতা দেখা যায় পরিস্থিতি বর্ণনায়, ‘রসোদ্দীপন’ যার লক্ষ্য। বঙ্কিমচন্দ্রের নিজস্ব কথায়:
ইহার বাক্য (Sentence)-গুলি ক্ষুদ্রাবয়বের হয়, অনেক ক্রিয়াপদ অনুক্ত থাকে, অনেক ক্রিয়া বিশেষণও অনুক্ত থাকে, ক্ষুদ্র বাক্যের পর দীর্ঘচ্ছেদ থাকে, কখন কখন কোন বিশেষ কথায় শ্রোতার (বা পাঠকের) মনঃসংযোগ করার জন্য পুনরুক্তি থাকে, আর কথকদের স্থানে এই ভাষার সহাকারী নানা ভঙ্গী থাকে। এই ভাষা হৃদয়চ্ছেদ করিয়া পাটে পাটে বসিতে থাকে।…ইহাতে ছোট ছোট জমাট বাক্যের গাঁথনি থাকে। জমাট পদগুলিকে পৃথক করিয়া লইলে সংস্কৃত পদ বলিয়া বোধ হইতে পারে, কিন্তু সমস্ত গাঁথনি ভাগবতের ন্যায় জটিল রীতি যুক্ত নয়।৮৩
কথকের মুনশিয়ানার আর একটি পরিচয় হল তত্ত্বকথা আলোচনা করা, নানাভাবে সামাজিক মূল্যবোধ ও আচারের সঙ্গে কাহিনীকে সংযুক্ত করা। সরাসরি কথক ব্যাখ্যার মাধ্যমে, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে, এই জাতীয় ক্ষেত্র তৈরি করতে পারেন বা অনেকসময় চরিত্ররা সংলাপের মাধ্যমে নানা পরিস্থিতির উপর মন্তব্য করেন। যাকে চিরন্তন ও শাশ্বত বলে মনে করা হয়, তাকে দৈনন্দিনতার মধ্যে মেশাতে হবে, তা না হলে কথকতার সামাজিক গ্রাহ্যতা বিপন্ন হবে, যৌথের ধারণার সঙ্গে কথকতার বিযুক্তি ঘটবে।
