‘কংস উঃ সদ্যজাত সন্তান, অচ্ছিন্ন নাড়ী। রুধিরাক্ত এ সন্তান লএে সভায় কেনো। তুমি কি খেপেচো নাকি।
বসুদেব প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিলেন। তখন,
ওহে বসুদেব ও কথাটা আমার মনে নাই। মিথ্যাতে তোমার এতো ভয়। আমরাত প্রতিদিন কতো মিথ্যা বলে থাকি। ওহে বসুদেব তোমার বাড়িতে কি সত্যের গাচ আছে। তোমাকে আমার পণ্ডিৎ বলে জ্ঞান ছিলো। এখন জাল্লেম জে তোমার তুল্য মূর্খ আর জগতে নাই।…আকাশবাণি হয়েছিলো। দেবকীর অষ্টম গর্ভের পুত্র হতে আমার বিনাশ হবে। প্রথম জাতো শন্তান কি অপরাধ করে। তোমার হৃদীএে কি দয়া নাই। লএ জাও ২ গৃহে ললে যাও।
ভাগবতী কংস ও কথকতার কংসে প্রভেদ প্রচুর। কংসের মুখে এইরকম বিচারবোধ তাকে অনেক স্বাভাবিক করেছে, সত্য ও মিথ্যা দৈনন্দিনতার ছাপ লেগেছে। আবার ‘টাইপ’ চরিত্র হিসাবে নারদকে আনা হয়েছে, তার পরামর্শে কংস শিশুকে হত্যা করল। পরামর্শটাও একটি লৌকিক হিসাবের ধাঁধা। কথকতা পুথিতে বেশ বিস্তৃত করে লিখেছেন:
নারদ উ। বটে তুমি অষ্টম কারে বলো। কংস উ॥ সপ্তমের পর জে তারে অষ্টম বল্লি। নারদ উ॥ সপ্তমের পর তারে অষ্টম বলো। ভালো আট্টা মণি আনওয়েন করি দেখি। কংস মহারাজ তৎখনাৎ মণি আনওয়েন কল্লেন। নারদ উ॥ এখানে রক্ষ্যা করে গণনা করে দেখি। কংস গণনা করতে লাগলো। একো দ্বি তৃ চত্তূঃ পঞ্চ শষ্ঠ সপ্তম অষ্টম, এইটি অষ্টম হলো। নারদ বলেন বটে ওইটা বাদিকে রেখে গণনা করো। কংস পুনরায় গণনা করে। পূর্ববৎ এক দ্বি ত্তৃ চত্তু পঞ্চ শষ্ঠ সপ্তম অষ্টম। আজ্ঞা হল সপ্তমটা অষ্টম হলো জে।…এইরূপ পণপুরাণ নাত্রে দ্বারায় দেবর্শী নারদ শকলগুলোকে অষ্টম করে দেখালেন। পণপুরাণ ন্যায় কেমন। জেমন একগণ্ডা দুই গণ্ডা করে কুড়ি গণ্ডা করে এক পণ হলো। আবার সেই সকল একত্র করে পুনরায় গণনা কত্তে গেলে আবার এক গণ্ডাতে কুড়ি গণ্ডা হয় সেইরূপ সকলগুলি অষ্টম হলো।
শ্রোতার কৌতূহল উস্কে দিকে কথক নিজে লেখেন, ‘বলো দেব ঋষি-নারদ কংসকে এমন উপদেশ কেন কর্লেন।’ কারণ লোকবিশ্বাস ও দেবরোষ। ‘মৃতবৎশা’ স্ত্রী নাকি শীঘ্র গর্ভধারণ করে তাই ছটি সন্তান বিনাশ হলেই ‘অবিলম্বে বৈকুণ্ঠনাথ হরি ভূতলে অবতীর্ণ হবো।’ আর ‘কংস বালক বিনাশ করে প্রচুর পাপ সঞ্চার করুক। তাহলে শীঘ্রই জমালয়ে গমন করবে।’৭৭ যুক্তির ফাঁক নেই। পরিকল্পনাটিও নারদের লোকগ্রাহ্য কুঁদুলে স্বভাবের সঙ্গে মিলে যায়, তাঁর পাতা ফাঁদে বোকা কংস পা দেয়, দৈবী জগতের চক্রান্ত রূপান্তরিত হয় লৌকিক জগতের প্যাঁচ-পয়জারে। আর সেই বুনটটি কথক নিজেই বানিয়ে তোলেন, পৌরাণিক আখ্যানের টানেতে লোক অভিজ্ঞতা সহজে খাপ খায়।
পৌরাণিক আখ্যানের ধারার মধ্যে এই রকম ছোট বুনটের কাজ, গায়কীর মতো কথকী ‘গিটকিরি’ পালায় গতি সৃষ্টি করে, বৈচিত্র্যও বাড়ায় দৈবী চরিত্রের মহিমায় মানবিক মাত্রা যোগ করে। এই বুনটের কাজগুলি ঘটনা ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াভিত্তিক, মূল কাহিনীর ইতি-উতিতে আবদ্ধ। লঙ্কায় রাম সীতাকে অগ্নি-পরীক্ষার আদেশ দিয়েছেন। কথকের বর্ণনায় হনুমান সেই মুহূর্তে অকুস্থলে নেই, কুবেরের উদ্যান থেকে ফুল আনতে গেছে। ফিরে এসে সাজানো চিতা দেখে হনুমান চটে আগুন।
‘এই কথা শ্রবণ করে হনুমানের ভাবোন্মাদ হল। আমার মা অশতি। অশতি বলে রাম তারে ত্যাগ করেছেন আজ দেখিবো রাম কেমন বির।’
পুথিতে হনুমান বলে ‘রামং যমগৃহং নয়ামি।’ শালগাছ তুলে রামকে আক্রমণ করেন, লক্ষ্মণের সঙ্গে লড়াইয়ের প্রবৃত্ত হন। অনুযোগ করেন,
‘জদি মাকে প্রতিপালন কর্তে পারবে না আমায় কেনো বল্লে না। আমি ভিক্ষা করে মাকে খায়াতেম।’ রামের সব কৃতিত্ব হনুমান নাকচ করে এইভাবে।
‘জদি বলো রাম হরধনু ভঙ্গ করেছেন। শে ধনু বহুকালের পুরাতন জির্ন্ন হয়েছিলো।’৭৮
হনুমানের এই মূর্তি প্রচলিত তুলসীদাসী, বাল্মীকি বা কৃত্তিবাসী রামায়ণে নেই, সুত্রাকারেও উল্লিখিত হয়নি। কিন্তু ভক্ত হনুমানের এই প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক লোকগ্রাহ্য, ওই রকম এক পরিস্থিতিতে রামের অপ্রত্যাশিত আচরণে যে নাটকীয়তার সম্ভাবনা ছিল কথক সেই সুযোগ ছেড়ে দেননি। ভক্ত হনুমানকে দিয়ে রামের আচরণের প্রতিবাদ কথক করিয়েছেন। ন্যায়পরায়ণ ও সীতাভক্ত বলে হনুমান লোকগ্রাহ্য চরিত্রে মিশেও গেছেন।
এই রকমই আর একটি টুকরো ঘটনার কথাও কথক উল্লেখ করেছেন, একটি ভাবকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। স্বর্ণলঙ্কায় লক্ষ্মণ মোহগ্রস্ত, অযোধ্যায় ফিরতে ইচ্ছুক নন। তাই লঙ্কার বাইরে বেড়াতে গিয়ে দেখলেন যে মাথায় আগুনের পাত্র ও পায়ে লৌহবর্ম্ম পরে এক দল কৃষক চাষ করছে। মাংসাশী পাখি ও বিষধর সাপের উপদ্রবের জন্য তাদের ওই রকম বেশ। তখন,
লক্ষ্মণ উ ॥ এইস্থানে জদি এতো ভয় এস্থান ত্যাগ করে অন্যত্র বাশ করো না। কৃশকেরা বলেন শে শত্য। কিন্তু জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। এই নিমিত্ত আমরা এস্থান পরিত্যাগ করে অন্যত্র গমন করতে পারি না, লক্ষ্মণের মনে? আমারো জননী জন্মভূমি আছে।৭৯
এইভাবে নানা জায়গা থেকে শোনা, তুলনামূলকভাবে অপ্রচলিত সূত্র থেকে নেওয়া বা নিজেরই তৈরি করা গল্প কথার বুনটে ধরা থাকে, অভিযোজনের মধ্য দিয়ে কথকের বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়। আখ্যানগুলোর মার্গীয় কাঠামো, এই রকম সংযোজন ও কথান্তরের ফলে লোভাবনার নানা স্তরে প্রসারিত হয়। পরিবর্তিত হয়ে দেশজ রীতির অঙ্গ হয়ে ওঠে। হুতোমি ঠাট্টায়, কথকঠাকুর বস্তুত যা বলেন, ‘সকলি কাশিরাম খুড়োর উচ্ছিষ্ট ও কোনটা বা স্বপাক’।
