আমি মনে করেছিলুম, ভাগবতের মূল শ্লোক আর কোন প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা বোধহয় পুঁথিখানায় আছে। ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করে জানলুম, তা নয়। মাঝে মাঝে কোথাও ভাগবতের মূল শ্লোক আছে, আর প্রায়শঃ নানা শাস্ত্রের প্রমাণ, উপাখ্যান আর তার সঙ্গে দৃষ্টান্তগুলির উল্লেখ করা হয়েছে। দেখলুম, কয়েকখানা পাতায় সমাসবহুল সুদীর্ঘ বাক্যাবলীর সমষ্টি আছে। সেগুলি মূল পুঁথির অংশ নয়, কিন্তু খোলা পাতা হিসাবে ঐ সঙ্গেই আছে। ঠাকুর বলেন, ঐগুলি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই পাতাগুলির মধ্যে কোনটা বনের বর্ণনা, কোনটা পর্বতের বর্ণনা আর কোনটা রাজসভা বা নগরের বর্ণনা। এই বর্ণনাগুলো কথা জমানোর জন্য খুব প্রয়োগ হয়ে থাকে।৭৫
পুরাণকাব্য থেকে সংগ্রহ, আবার সংগ্রহ থেকে নানাভাবে প্রসারিত ও যোজিত হয়ে কথকের পুথি—এই স্তরে উপনীত হবার প্রক্রিয়ায় যোজনার কয়েকটি সাধারণ সূত্র ধরা যেতে পারে। প্রথমত, আখ্যান বিন্যাসে আমরা লোককথা ও পৌরাণিক কাহিনীর মিশ্রণ দেখি, দৃষ্টান্ত হিসাবে লোকগল্পকে বার বার হাজির করা হয়। এই কায়দাকে অগ্নিপুরাণের ভাষায় বলতে পারে ‘কথান্তরম’, এক কথার মধ্যে অন্য কথা ঢুকিয়ে দেওয়া যাতে করে মূল কাহিনীটা জোরদার হয়। দ্বৈপায়ন ব্যাস বনে যাচ্ছেন। মায়ের কান্না শুনে থেমে গেলেন। মাতৃভক্ত। তাই মাকে গল্প শোনালেন। বলা হল কিন্তু ‘ইতিহাসং শৃণু’। ঠিক যেমন ঘটেছিল, ঠিক তাই। শুদ্ধমতি বামুন, তার বৃদ্ধা মা এবং হিংসুটে বউ। ‘ইতিহাসং শৃণু’র পরেই ভাষা বদলে গেলে, তার রওয়ানি হয়ে গেল অন্যরকম। মায়ের বিরুদ্ধে বৌ-এর হিংসা ও স্বামীকে উত্তেজিত করার নমুনা: ‘ওর স্ত্রী বলে মলো আমি কেয় নই। বানে ভেসে এসেছি। শাশুড়ি বুড়ি ঘরের বালাই। থাকতে সুখ হবে না। দূর করে দেবো। তবে বাঁচবো।’ আর রাত্রে স্বামীর পা টেপার সময়
চকের জল শুদ্ধমতির পায়ে পড়লো। ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। কেন? প্রিয়ে কাঁদ কেন। কি জন্যে স্ত্রী যদি কাঁদে পুরুষ টো ব্যস্ত হয়। কি চাই বল। আমি মলেই বাঁচি। আমার কপালে আর সুখ নাই। পাড়া প্রতিবেশিনীরে দুদে ভাত খায় একদিন দুগ্ধো অন্নে খেতে পেলাম না। আর শোনার কি রূপোর আঁচোড় গায়ে হলো না। বলে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। হাবি কাঁদিসনে, সব দেবো।
লোককথায় ঝগড়াটে বউ-এর রূপও এসেছে। স্বামী রোজগারে বেরুলে শাশুড়ির প্রতি স্ত্রীর মূর্তি,
প্রাচীনা বলে ও বৌমা বড় ক্ষুধা পিপাসা দেয় না খাই। ও ঘরে’ হতে বেরিয়ে ভিমরুলের চাকের মত মুক ফুলিয়ে বলে মাথা নেড়ে মরহ, আকন্দ ডাল [sic] মুড়ি দেরমোচো তোমার মরণ নাঞি মা ককুণ্ডর’ প্ৰেমাই পেয়েচো যম বা তোর পাঁজি পুতি ভুলে গেছে।
শাশুড়ি ডাইন, বনে ছেড়ে দেওয়া উচিত, তাই স্বামীকে বলা হয় ও তুক করা হয়,
ওমা কি হবে? মরণ কেন হলো না। পাড়ায় কাকে খেয়ে এসেছেন। নজ্জায় মুক পাততে পারি না। আমার সোনার ঠাকরুণকে কে আড়ি করে চোষকা মন্ত্র দিয়ে গেছে হে।… তুমি বাঁচালে হয়। সাবধানে থেকো। ওয়ো হলে নাকি আপনারই ঘরেই আসে। আমাদের কপালে জা থাক তুমি বেঁচে থাকো। হাতের কগাচি থাক।…এই বলে সাঁড়ের গোবর কেঁচোর মাটি পিদ্দিমের শিশ। কপালে দিলে আর ফু ২ করে বুকে ফুৎকুড়ি
স্বামীকে ভজিয়ে বনে শাশুড়িকে পাঠাবার পরে বউয়ের আনন্দ আর ধরে না।
দুর করেচি ঘরের আপদ। এখন একলা একেশ্বরি। সৃষ্টিধরী হয়ে বসেছি। খাবো দাবো নাচবো গাবো।…বার বার পথ দেকচে। স্বামি ফিরে এলে হয়। আর আহ্লাদে মাজখানাটা ভেঞে ২ ফেটে ২ পড়ছে।…জেন ফুটি ফটা কাঁকুড় ফাটা ফুটকড়াই আটখানা হয়ে দুটি বুড়ো আঙুলে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে পৃথিবী সরা দেখছে।৭৬
দ্বৈপায়নের জন্ম ও জীবনবৃত্তান্তের মধ্যে এই কাহিনী নিয়ে আসা হল মাতৃভক্তির মাহাত্ম্য প্রচার করতে; সত্যবতীর প্রতি ব্যাসদেবের চিরন্তন আনুগত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা উদ্দেশ্য। কিন্তু গল্পের ভাষা ও বস্তুর অভিমুখে ভাগবতী আখ্যানের বিপরীত, লোকগল্পের মেজাজ ও ছক স্পষ্ট। তাই মার্গ ও লোকের মিশ্রণ দেশজ রীতির জন্ম দেয়, সেই রীতিতে কথকতা করা হয়। আধুনিককালে দ্বিজরাজবাবুও এই রীতির ব্যতিক্রম নন। রামের সভায় লবকুশ রামায়ণ গাইতে এসেছে। সকালে তারা অযোধ্যানগরী ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন ময়রার দোকান থেকে বিনা পয়সায় মিষ্টি খাওয়ার যে ফন্দি লবকুশ বার করেছিল, তা আমাদের ছেলেবেলার শোনা গল্প: ‘বাবা, মাছি রসগোল্লা খাচ্ছে’ বা ‘পিঁপড়ে রসগোল্লা খাচ্ছে।’ আসরে বাচ্চারা গল্পটা শুনে হেসে ফেলে, আমাদেরও ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়, কাহিনীতে মৌতাত ধরে যায়। কিন্তু যতই কথান্তর হোক না কেন, সুতো যতই ছাড়া হোক না কেন, গোটাবার কায়দা জানতে হবে, মূলে ফিরতেই হবে।
আখ্যানের মধ্যে চরিত্রায়নের জন্য ছোট ছোট ‘চুটকির’ মতো রচনা থেকে যায়। এইগুলিতে থাকে লৌকিকের স্পর্শ, কথকের উদ্ভাবনা। কয়েকটা নিদর্শন দেওয়া যেতে পারে। দেবকীর প্রথম সন্তানকে ভাগবতী কংস বধ করতে অনীহা প্রকাশ করে। পরে নারদের কাছে দৈবী চক্রান্তের কথা শুনে সব ক’টি সন্তানকেই হত্যা করল। কথক এই সূত্রকে নিজের মতো করে সাজিয়েছেন। কংসের কাছে বসুদেব প্রতিশ্রুত, তাই দেবকীর গর্ভের প্রথম সন্তানকে নিয়ে এসেছেন।
