পুথি কথকের নিজস্ব কিন্তু সেই পুথি ধারা-বহির্ভূত নয়, পরম্পরায় বিধৃত। পাঠে পুথির সার্থকতা, পুরুষানুক্রমে পাঠের মাধ্যমে পুথি পোক্ত হয়। অবিরত পাঠে পুথির গৌরব বৃদ্ধি পায়, পুথি শুদ্ধ হয়। সেই জন্যই আসরে পুথির স্বচ্ছন্দ লেনদেন আছে। পুথি বলাটাই তো কথকতার একরূপ। কথক কালীপ্রসাদ দেবশর্মার চিঠির বয়ান হল, ‘এখানে আমার পুথি আরম্ভ হইয়াছে, কিছুকাল বিলম্ব হইবেক।’৬৮ আবার ১২৫৩ (১৮৪৬) সনের পৌষমাষে কথকতা করতে গিয়ে লক্ষ্মীনারায়ণ দেবশর্ম্মা ঠ্যাকায় পড়েছেন। শ্যামাচরণ ভট্টাচার্যকে অনুরোধ করে তিনি লিখেছেন, ‘কীন্তু লঙ্কাকাণ্ড পুস্তক এখানে অর্পাপ্ত হইআছে য়তেব ষুনিলাম জে আপকাদের গ্রামে এই পুস্তক আছে আপনি মম পিতি অনুগ্রহ পিকাস করিঞা ঐ পুস্তক এই লোক সমীভারে পাঠাইক্রে দিব।’৬৯
যেহেতু পুথি পাঠ করা হয়, তার চাহিদা আছে, তাই সবসময় মালিকের কাছে পুথি ফেরত যোগ্য। তাড়া খেয়ে ১২১৫ (১৮০৮) সনে মাণিকচন্দ্র দেবশর্ম্মা ‘যুদ্ধে মঞ্জরী ঠাকুর জীউ’ স্থানে একরারনামা লিখতে বাধ্য হচ্ছেন। ‘সন ১২০৫ পাচ সাল শ্ৰীযুত পিতা ঠাকুর আপনকার স্থানে হইতে শ্রীশ্রীভাগবৎ পুথী লইয়া আসীয়াছিলেন। সন ১২১৩ সালে সেহী পুথী নতুনবাজার মোকামে পাট করিয়া এখানে ছিল সে পুথী লইয়া সহরের সেবকবাটিতে রাখিয়াছি প্ৰকাষ করিয়া জাইবার কালে সহর হৈতে পুথী লইয়া আপনকার নিকট দিবো।’৭০
পুথি না হলে পাঠ হবে না। পুথি পরম্পরাগত কিন্তু পুথির মালিক আছে, তার উপরে কোনও না কোনও স্বত্ব আছে। পরম্পরার কাঠামোতে পুথির চরিত্র নির্ধারিত হচ্ছে, অথচ বিন্যাসে থাকছে বিন্যাসকারের দক্ষতা, নিজস্বতা। পাঠ সামূহিক, পুথিও সামূহিক পাঠের জগতে প্রোথিত, তার সার্থকতা সেখানে। তাহলে কথকের নিজস্ব মুনশিয়ানা কোথায়, তার সরহদ্দই বা কত দূর সেটা বিচার্য হয়ে ওঠে।
যেভাবে পাঠকের রূপান্তর ব্যাখ্যাকার ও কথকের মধ্যে হয়েছে, ঠিক সেইভাবে কথকের পুথি রচনাও, মূল গ্রন্থের অনুসারে, একটি মাধ্যমিক স্তরের মধ্য দিয়ে দানা বেঁধেছে। এশিয়াটিক সোসাইটিতে রক্ষিত আলোচনা প্রসঙ্গে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই জাতীয় রচনার কথা উল্লেখ করছেন। রামায়ণ, মহাভারত বা ভাগবত আয়তনে বিশাল, নানা শ্লোকে ও জটিলতত্ত্বে পরিপূর্ণ। ফলে কোনটা রাখব আর কোনটা বাদ দেব, সেটা কথকরা ঠিক করতেন, মূল গ্রন্থ থেকে বেছে বেছে আখ্যান ও শ্লোক সাজিয়ে একটা নির্বাচিত সংকলন তৈরি করতেন। রমাপতি এইভাবে উত্তরাকাণ্ডের কথা সংগ্রহ করেছেন, কেশব পঞ্চানন ভট্টাচার্য এইভাবে ভাগবতের কথা চয়ন করেছেন, গালভরা নাম দিয়েছেন ‘হরি-ভক্তি তরঙ্গিনী’। উনিশ শতকের গোড়ায় গণেশ বিদ্যাবিনোদ একই পদ্ধতিতে ৫৯০টি শ্লোকে রামায়ণের আদিকাণ্ডের কাহিনীর চুম্বক দিয়েছেন। এই সংগ্রহ গ্রন্থগুলি আখ্যানের মূল কাঠামো, কোন কোন বিষয় আলোচিত হবে তার নির্দেশ। এই কাঠামোর উপরে প্রলেপ দেওয়া হয়, তৈরি হয় কথা এবং আখ্যান। এই সংগ্রহগুলি লেখা হত সংস্কৃতে। মূল শ্লোক থাকত, সঙ্গে সঙ্গে সহজ সংস্কৃত গদ্যে গল্পসারও দেওয়া হত। সম্ভবত ওইগুলির উপর ভিত্তি করেই দিবাকালের পাঠকে প্রথমদিকের কথকরা সন্ধেবেলায় লোকের সামনে অনুবাদ করতেন; এই জাতীয় সংগ্রহ করার প্রথম উদ্দেশ্য হয়তো তাই ছিল।৭১ কথকের ভূমিকা প্রসারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে এই সংগ্রহের কাঠামোও পরিবর্তিত হয়।
‘আদিকাণ্ড’ কথা পুথিতে নানা আখ্যানের চুম্বক দেওয়া আছে, ‘কথকস্য কথা’ যেমন গঙ্গাবতরণ, ‘রামাদয়ো মিথিলায়াং চলিতাঃ।’ আবার তারই সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে জটায়ু-মারীচবধ অথবা ‘জনস্থানে রমতা রামেন শূর্পনখা বিরূপিতা।’ এমনভাবে বাক্যবিন্যাস করা হচ্ছে যাতে করে বাংলায় রূপান্তরিত করতে কোনও অসুবিধা না হয়, ‘সরযূতীরে কোষলো নাম জনপদস্তু অযোধ্যানাম নগরী’। আখ্যানের কাঠামোর সূত্রটি সাজানো হয়ে রইল।৭২
আবার এইরকম সহজ সংস্কৃতে আখ্যানভিত্তিক আরেকটি পুথির মাঝে জনকের মুখে একটা সংস্কৃতগন্ধী বাংলা শ্লোক জুড়ে দেওয়া হয়, বোধহয় শ্রোতাদের কাছে লাগসই শোনাতে পারে। যেমন,
‘জনক উঃ জগদম্বার শ্লোক
নম অন্নদা অন্নপ্রদান করা।
ত্বয়ী দিনদয়াময়ী দুঃখহরা।
হে শুভঙ্করী সঙ্কট শান্তিকরা।
জগদম্বে জগন্মাতা যোগধরা॥
হে কাশীশ্বরী শঙ্করি অন্নদাতা।
শমনস্য ভয়ে সদা রক্ষ মাতা॥
ত্বয়ি শিব সনাতনী শক্তি প্রদা।
এ অশক্তজনে বরদে বরদা ॥
অতি অকৃতি দুৰ্ম্মতি দিন হীনে।
ওগো দিনময়ি কর ত্রাণ দিনে।৭৩
আবার আরেকটি ‘সংগ্রহের’ পুথিতে ‘দেশে দেশে কলত্রাণি’র মতো রামায়ণের বিখ্যাত শ্লোকগুলির মধ্যে হঠাৎ কুম্ভকর্ণের একটি সংলাপ বিচ্ছিন্ন পাতায় দেওয়া হল: ‘কুম্ভ উঃ দিকপালান্ ভক্ষয়িষ্যামি ২ পাবকং। দেবান্ বিপ্রান্ বধিষ্যামি।…পাতয়িষ্যামি নক্ষত্রঞ্চ মহীতলে। শতক্রতুং বিজেষ্যামি পশ্যামি বরুণালয়ং। পবর্তন চূর্ন্তুয়িষ্যামি। দারয়িষ্যামি মেদিনীং। মহাদেবং বধিষ্যামি পশ্যাদা বিক্রমং মম।’ বলাবাহুল্য, পাঠের মজলিশে সংস্কৃতে লেখা এই ধরনের সংলাপকে মুখে মুখে বাংলায় করে দেওয়া আদৌ দুঃসাধ্য নয়। এই বিশেষ সংগ্রহ পুথিটিতে স্থানে স্থানে বিচ্ছিন্ন পাতায় বাংলায় লেখা সাটও আছে, যেমন, ‘অশ্বমেধ যজ্ঞাবসানে অযোধ্যা মণ্ডল মধ্যবর্তী সৌধ নিকর মণ্ডিত প্রাঙ্গণে বিবিধ ক্ষৌমরাদি [?] বসনোনির্মিতাসনোপরি নৃপ নৃপতিগণ স্ত্রিয়গণ দিব্যসিংহাসনোপবিষ্ট…গাওরে কি রামায়ণ গান শিখেছো।৭৪ সহজ সংস্কৃতে লেখা গদ্য সংলাপের পাশাপাশি বাংলা সাটও লেখা হচ্ছে, সংগ্রহের কাঠামোয় নানাভাবে যোজনা চলছে, যোজনা কাঠামোকে রূপান্তরিত করছে স্বতন্ত্র পুথিতে। এই রদবদলের প্রক্রিয়া ধরা পড়ে এক কথকের লেখায়:
