আসর বসতে পারত নানা উপলক্ষে। উৎসবে তো বসতই। আবার তীর্থ পর্যটন সমাধা করে, ছেলের অন্নপ্রাশন, বা শোক দুঃখ উপশমের উদ্দেশ্যে কিছু দক্ষ কথক চাই, আর মুমুক্ষু পাঠক চাই। আদর্শ পাঠক শুকদেব আর শ্রেষ্ঠ শ্রোতা পরীক্ষিৎ।৬২ আসর জমাতে গেলে কিছু তৈরি শ্রোতাও চাই। দুঁদে কথক তাই লেখেন,
…এর মধ্যেই দেখুলম, কোনো ভক্তের চক্ষে জল গড়াবার উপক্রম হয়েছে। এদের বড় তাড়াতাড়ি ভাব হয়ে যায়। এসব লোক কথক ঠাকুরের খুব প্রিয়। তিনি গুটিকয়েক এরকম ভক্ত খুব কাছে নিয়ে বসেন।
তিনি বলেন, এরাই তাঁর যথার্থ সমজদার শ্রোতা। এদের মুখ না দেখে তিনি কথাই বলতে পারেন না।৬৩
কিন্তু আসর যতই সাজানো হোক না কেন, শ্রোতারা যতই উন্মুখ থাকুক না কেন, শেষপর্যন্ত জমানোর দায়িত্ব গিয়ে পড়ে কথকের উপরই। একদিন ঠাকুরবাড়িতে জসীমউদ্দীন এই কথা মর্মে মর্মে বুঝেছিলেন। ‘গল্পের আসরের উপলক্ষ করিয়া হলটিকে একটু সাজান হইয়াছে। কথক ঠাকুরের মত সুন্দর একটি আসনও রচিত হইয়াছে আমার জন্য!’
সেইদিন আসরে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া হাজির ছিলেন সবাই। অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, দীনেন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ, এবং ঠাকুরবাড়ির সুসজ্জিতা বধূরা। আর গ্রামদেশের জসীমউদ্দীন এই রকম আসরে যেন ‘বলির পাঁঠা’।
গল্প বলিতে বলিতে গল্পের খেই হারাইয়া ফেলি। পরের কথা আগে বলিয়া আবার সেই ছাড়িয়া-আসা কথার অবতারণা করি। দশ পনের মিনিট বাদে দিনুবাবু উঠিয়া গেলেন। সামনের শাড়িতে ঝকমকিতে দোলা দিয়া কৌতুকমতীরা একে অপরের কানে কানে কথা বলিতে লাগিলেন। কেউ কেউ উঠিয়া গেলেন।৬৪
গ্রামের কবি জসীমউদ্দীনের বলার ধরন ঠাকুরবাড়ির শহুরে মনের হৃদয়-সংবাদী হয়নি। আসর জমল না, যদিও বহিরঙ্গে ত্রুটি ছিল না। আবার এই আসরই মহিম কথক বা ক্ষেত্র কথকের কথায় কীভাবে জমে উঠত তার স্বীকৃতি আছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণায়।
এ যে মহিম কথকের পুঁথি, একটি একটি পাতা পড়ে যেতেন কথক ঠাকুর আর একটি একটি ছবি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠত। লাল বনাত একখানা গায়ে দিয়ে বসতেন পুঁথি হাতে, হাতে রূপোর আংটি, হাত নেড়ে নেড়ে কথকতা করতেন। রূপোর আংটির ঝকঝকানি আজও দেখতে পাই।…
ক্ষেত্ৰনাথ কথকের বলার ধরন চমৎকার, গলাটাও ছিল সুমিষ্ট। দক্ষিণের বারান্দার গায়ে নাচঘরটা তখন অস্তমিতমহিমা গন্ধর্বনগরের মধ্যে ম্লান শোভা ধারণ করেছে। তারই মধ্যে ক্ষেত্ৰনাথ কথক মায়ের মনের অবস্থানুযায়ী এক একটি কথা ভাগবত থেকে বলে চলেছেন, এইভাবে গেল প্রায় একবছর।৬৫
গল্প ফাঁদার মুনশিয়ানা
চাঁইবুড়োর সাতরাজার ধন যে একমানিক, সেটা যে পুথি এই কথা সবাই জানে, পুষ্পিকাতেও বার বার তাই লেখা আছে। তাই নানা ঝামেলা, নানা নিষেধ। যেমন,
পুস্তক পড়িতে দিবে সুবুদ্ধির ঠাই।
সবাগুনা গ্রন্থ জেন গোবরায় নাই।
মাতুলমহাশয়ের বাহির বাটির মণ্ডপে বসিয়া পুথির অনুলিপি করা হয়েছে, ‘ঘাড়ের মধ্যে সাল হইয়া বড় বেতা পাইয়া এহি পুস্তক সমাপ্ত করিলাম—এহি পুস্তক আর কেহর এলাকা নহি,’ ১২৪০ (১৮৩৩) সনে শ্রীকৃষ্ণকান্ত এই কথা লিখেছেন। তাই আর এক জনের ভাষায়, ‘দুঃখেন লিখিতং গ্রন্থং পুত্রবৎ পরিপালয়েৎ।’ তাই এরকম কোনও পুথি অপহরণ করার পাপ প্রসঙ্গে অভিশাপ স্পষ্ট: ‘এ পুস্তক জে চুরি করে সে শাশুড়ির শৃঙ্গার করে’ বা ‘শাশুড়্যা হইবেক’। কিন্তু পুথি তো লেখা হয় পাঠের জন্য। ১১৮০ (১৭৭৩) সনে জগন্নাথ ঘোষ গদাপর্ব লিখতে গিয়ে বলছেন, ‘শ্রবণ কারণ ইহা লিখিলাম সব।’ ‘সঙ্কর ঘোষ’ তাঁকে দিয়ে প্রতিলিপি করাচ্ছেন: ‘জত্ন কড়ি লেখাইলে কড়ি করে ব্যয়॥’ ১২৩০ সনে শ্রীমদ্ভাগবত (১৮২৩) ‘মহাপৌরাণ’-এর পঞ্চম স্কন্ধের প্রতিলিপি করতে গিয়ে রামপ্রসাদ দাস বোস বলেন, ‘কিন্তু এক নিবেদন। বক্তা ঠাকুর মহাশয়দিগকে আমার শতং কোট নমস্কার। আমার দোশাদোশ ক্ষমা করিবা।’৬৬
পুথি লেখাতে পুণ্যও আছে, অর্থ প্রাপ্তিও আছে। লিপিকররা জানে পুথিতে ‘দোশাদোশ আছে’, ‘বক্তা মহাশয়েরান’ ‘তাহাকে সুদ্ধ করিবেন।’ লেখা শুদ্ধ হবে পাঠে, পাঠ প্রধান, লেখা পড়া নয়, পড়ালেখা। তাই সুবুদ্ধিই পড়তে পারবেন, অন্যরা পড়তে গেলে হয়ে যাবেন গোবর-গণেশ। আগে জানতে হবে কী লেখা আছে, হৃদয়ে ভক্তি থাকতে হবে, তবে তো পড়া-লেখা হবে। শুদ্ধ মনে পাঠ করতে হয়। তাই একসময়ে পুথিকে পুজো না করে কথকতার আরম্ভ বা শেষ অকল্পনীয় ছিল। এ হেন কথকতা করার অধিকারের একটা সূত্র পরম্পরা, পেশার ধারাবাহিকতা, এক কথক ঠাকুরের চেখে পুথির মাহাত্ম্য ধরা পড়েছে এইভাবে,
দেখলুম কথক ঠাকুর নবীন হলেও তাঁর পুঁথিখানা নতুন নয়। অনেক দিনের হাতে লেখা পুঁথি…ভাগবতের সবখানি এই পুঁথির মধ্যে ললিতাক্ষরে লেখা আছে। ধারে ধারে তিনপুরুষের হাতের লেখার নিদর্শন, ক্ষুদ্র টিপ্পনী। কোথাও শ্লোকের একপাদ, কোথাও পূর্ণশ্লোক আর কোথাও কোনো দৃষ্টান্তের সংকেত। যারা এই পুঁথি নিয়ে কথকতা করেছেন, তাদের রুচি ও শিক্ষা অনুসারে নানা শাস্ত্রের প্রমাণ পাশে পাশে সংগৃহীত।
গুরুদেব বলেছেন, পুরাণ যেমন ষট সংবাদ না হলে রুচিজনক হয় না, তেমন পুঁথিও তিন পুরুষের না হলে শোধন হয় না। এ সব পুঁথিও তিন চার হাত বদল হয়ে অনেক তথ্য পূর্ণ হয়, আর লিপিকর প্রমাদও সংশোধিত হয়ে যায়।৬৭
