ক্লাইভের ওপরের নির্দেশ থেকে এটা স্পষ্ট যে ইংরেজদের পক্ষে শুধু চন্দননগরের পতন যথেষ্ট নয়। সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে চুক্তির বাইরে গিয়ে তারা চাইছিল যে, নবাবকে তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য করার অজুহাতে বাংলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ ফৌজ রাখতে এবং ফরাসিদের যাবতীয় কুঠি ও সম্পত্তি হস্তগত করতে। খুব সম্ভবত, চন্দননগরের পতনের পরও ফরাসি-বাঙালি আঁতাতের সম্ভাবনায় তারা আশঙ্কিত ছিল এবং ভাবছিল মঁসিয়ে ল’ যতদিন কাশিমবাজারে থাকবেন ততদিন মুর্শিদাবাদ দরবারে ফরাসি প্রভাব বজায় থাকবে। তাই মাদ্রাজ থেকে তাঁকে ফিরে যাবার জন্য জরুরি বার্তা পাঠানো সত্ত্বেও ক্লাইভ বাংলা থেকে ফরাসিদের সমূলে উৎপাটন করার জন্য বাংলায় থেকে যাওয়াই স্থির করলেন। মাদ্রাজের গভর্নর পিগটকে তিনি ২৯ মার্চ লিখলেন: ‘এখানে আগস্ট মাস পর্যন্ত থেকে যাওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। আমার মনে হয় তাতে করে আমরা এখানে কোম্পানির পক্ষে অত্যন্ত সুবিধেজনক শর্তে সবকিছুর মীমাংসা করতে পারব এবং ফরাসিদের সব কুঠিগুলি আমাদের হাতে সমর্পণ করার জন্য নবাবকে রাজি করাতে পারব। ফলে এখান থেকে ফরাসিদের সম্পূর্ণভাবে বহিষ্কার করা সম্ভব হবে।’৩২ ওই একই দিনে ক্লাইভ সিরাজদ্দৌল্লাকে জানান যে, ইউরোপে ইংরেজ ও ফরাসিরা পরস্পরের সঙ্গে যতদিন যুদ্ধে রত থাকবে বাংলায়ও ততদিন তারা যুদ্ধরত বলে গণ্য হবে। সুতরাং যতদিন না পর্যন্ত নবাব ফরাসিদের সব সম্পত্তি ও কুঠি ইংরেজদের হাতে তুলে দিচ্ছেন ততদিন তাঁর পক্ষে শান্তির কোনও আশা নেই। ক্লাইভ তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এ-সব ইংরেজদের দিয়ে দিলে এদেশে তাদের আর কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না এবং কেউ যদি দেশের শান্তি বিঘ্ন করার চেষ্টা করে তাদের শায়েস্তা করতে ইংরেজরা নবাবকে সাহায্য করবে।৩৩
সিরাজদ্দৌল্লা সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে রেষারেষি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা জিইয়ে রাখতে পারলেই তাঁর পক্ষে সবচেয়ে সুবিধেজনক হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ঘটনাক্রম তাঁর হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি ক্লাইভের প্রস্তাব মেনে নিতে কতগুলি অসুবিধের কথা জানিয়ে আপত্তি করেছিলেন—যেমন ফরাসিরা মুঘল বাদশাহের অনুমতি নিয়েই এদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করছিল, তাদের তাড়িয়ে দিলে বাদশাহের রাজস্বের ক্ষতি হবে। তাই তিনি ক্লাইভকে বললেন, ফরাসিরা তাদের সব কুঠিই ইংরেজদের হাতে তুলে দেবে এই মর্মে রেনল্টের কাছ থেকে একটি চিঠি জোগাড় করতে এবং ফরাসিরা চলে গেলে রাজস্বের যে ক্ষতি হবে ইংরেজরা তা পূরণ করে দেবে এই প্রতিশ্রুতি দিতে।৩৪ ক্লাইভ কিন্তু সিরাজের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেন এই বলে যে তিনি ফ্রেব্রুয়ারি চুক্তির শর্তাবলী মানেননি, যেটা আমরা আগেই দেখেছি, একেবারেই ভিত্তিহীন। এ-প্রসঙ্গে জাঁ ল’ মন্তব্য করেছেন যে ইংরেজরা হাজার রকমের নতুন নতুন দাবিদাওয়া নিয়ে সিরাজকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল।৩৫ ক্লাইভ আসলে এ-সব দাবিদাওয়ার অজুহাত তুলে নবাবের ওপরে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছিলেন। ইংরেজদের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাত এড়াতে সিরাজদ্দৌল্লা শেষপর্যন্ত তাদের অন্যতম দাবি মেনে নিলেন। তিনি ৭ এপ্রিল জাঁ ল’-কে মর্শিদাবাদ ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দিলেন। তারপরের ঘটনাবলীর বিবরণ ল’ নিজেই দিয়েছেন—যা থেকে পরিষ্কার, এ সময় নানারকমের বিপাকের সম্মুখীন হয়ে তরুণ নবাব একেবারে দিশেহারা ও অসহায় বোধ করতে থাকেন এবং নিজের কর্তব্য স্থির করতে দোদুল্যমান হয়ে পড়েন।৩৬
জাঁ ল’ জানাচ্ছেন যে ফরাসিদের বিতাড়ন করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নবাবের ছিল না। বরং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ইংরেজদের দাবিয়ে রাখার জন্য ফরাসিদের উপস্থিতি তার একান্ত প্রয়োজন ছিল। যা হোক, ১০ এপ্রিল নবাব ল’-কে দরবারে ডেকে পাঠান। ল’-র ধারণা, সম্ভবত নবাব তাঁকে বন্দি করে ইংরেজদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওই সময় ফরাসি সৈন্যের একটি দল সময়মতো ওখানে উপস্থিত হওয়ায় নবাব তাঁর মত বদলে ফেলেন। নবাবের সঙ্গে ল’-র যখন দেখা হল তখন নবাব তাঁকে পরামর্শ দিলেন, হয় ওয়াটসের প্রস্তাব অনুযায়ী কাশিমবাজারের কুঠি ইংরেজদের হাতে সমর্পণ করে কলকাতা চলে যেতে নয়তো তাড়াতাড়ি নবাবের রাজ্য ছেড়ে দিতে। ল’ জানাচ্ছেন সিরাজদৌল্লা তাঁকে বললেন: ৩৭
আপনাদের [ফরাসিদের] জন্যই ইংরেজদের কাছে আমাকে অপদস্থ হতে হচ্ছে। আপনাদের জন্য সমগ্র দেশে আমি অশান্তি ডেকে আনতে পারি না। আপনার মনে রাখা উচিত যখনই আপনাদের সাহায্য আমার প্রয়োজন হয়েছে তখন তা করতে আপনারা অস্বীকার করেছেন। এখন আমার কাছ থেকে আপনারা কিছুই প্রত্যাশা করতে পারেন না।
ল’ অবশ্য স্বীকার করেছেন যে নবাবের সঙ্গে তাঁরা যে আচরণ করেছেন তারপর নবাবের কাছে জবাব দেওয়ার মুখ তাঁর ছিল না। তিনি এটাও জানিয়েছেন যে, নবাব যখন তাঁকে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে যেতে বলেন তখন নবাব মখ নিচ করে ছিলেন—যেন নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই নবাব এই নির্দেশ দিলেন। তিনি যখন নবাবকে বললেন যে পাটনার দিকে যাওয়াই তাঁর ইচ্ছে তখন নবাব এবং খোজা ওয়াজিদ ছাড়া দরবারের বাকি সবাই প্রায় সমস্বরে চিৎকার করে উঠল—ওদিকে নয়, ল’-কে মেদিনীপুর বা কটকের দিকেই যেতে হবে। নবাব মুখ নিচু করেই রইলেন—কিছু উচ্চবাচ্য করলেন না। ল’ যখন জিজ্ঞেস করলেন, নবাব কি চান যে তাঁকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেওয়া হোক, তখন নবাব উত্তর দিলেন, ‘না না, আপনার যেদিকে ইচ্ছে যান, আল্লা আপনার সহায় হন।’৩৮ সিয়র-এর লেখক গোলাম হোসেন জানাচ্ছেন যে সিরাজদ্দৌল্লা ল’-কে বলেছিলেন, প্রয়োজন হলেই তাঁকে তিনি ডেকে পাঠাবেন। উত্তরে ল’ বলেছিলেন—‘আমাকে আবার ডেকে পাঠাবেন? জাঁহাপনা, আপনি আশ্বস্ত থাকুন, এই আমাদের শেষ দেখা। মনে রাখবেন আমাদের আর কোনওদিন দেখা হবে না। আমাদের দেখা হওয়া প্রায় অসম্ভব।’৩৯ তবে ল’ বা ওয়াটস কেউ এ ধরনের কোনও কথোপকথনের কথা বলেননি, যদিও ওয়াটস সর্বদাই প্রায় দরবারে উপস্থিত থাকতেন। ল’ শেষপর্যন্ত ১৬ এপ্রিল মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে পাটনা অভিমুখে রওনা হলেন। মাঝখানে ভাগলপুর অতিক্রম করার সময় তিনি নবাবের একটি পরোয়ানা পেলেন যে তাঁর যাত্রা স্থগিত করে নবাবের নির্দেশের জন্য ওখানে অপেক্ষা করতে। ল’পরের দিনই সে-নির্দেশ পেলেন—তক্ষুনি মুর্শিদাবাদ ফিরে আসতে এবং ইংরেজদের আক্রমণ করতে। কিন্তু তাঁর মনে সন্দেহ জাগল—হয়তো এ-নির্দেশ নবাবের নয়, এর মধ্যে ‘বিশ্বাসঘাতকে’র দল জড়িয়ে আছে। তাই সত্য যাচাই করার জন্য এবং মুর্শিদাবাদের হালচাল জানতে তিনি সাঁ ফ্রে-কে (M. de St. Fray) সেখানে পাঠালেন আর সিরাজদ্দৌল্লাকে লিখলেন যে তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে তিনি প্রস্তুত, তবে সৈন্যদের বেতন দিতে তাঁর অর্থের প্রয়োজন।
