সিরাজদ্দৌল্লার কাছ থেকে ল’ দ্বিতীয় পরোয়ানা পেলেন ৬ মে। এতে নবাব তাঁকে মুর্শিদাবাদ আসতে বারণ করে দিলেন। নির্দেশ দিলেন রাজমহলে গিয়ে অপেক্ষা করতে। এদিকে ফরাসি সূত্র থেকে কোনও খবর না পাওয়ায় ল’-র মন থেকে সন্দেহ দূর হল না। তাই তিনি পাটনার পথে মুঙ্গের যাওয়া সাব্যস্ত করলেন। তিনি মুঙ্গের পৌছুলেন ৭ মে। এখানেই তিনি মুর্শিদাবাদে কী ঘটছে তার বিস্তারিত খবর পেলেন। তিনি অবশ্য পরে বুঝতে পেরেছিলেন যে ইংরেজদের ব্যবহারে উত্ত্যক্ত হয়ে সিরাজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন এবং স্থির করেছিলেন যে তাদের আর বরদাস্ত করা হবে না এবং ফরাসিদের ডেকে পাঠাতে হবে। এদিকে বিপ্লবের পাকাপোক্ত ব্যবস্থা যেহেতু তখনও কিছু হয়নি, তাই ইংরেজ ও শেঠরা স্থির করল যে আপাতত নবাবকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে।৪০ ওদিকে জঁ ল’ ৩ জুন পাটনা পৌঁছুলেন, সেখানে বিহারের নায়েব সুবা রাজা রামনারায়ণ তাঁকে আন্তরিকতার সঙ্গে অভ্যথনা করলেন। তিনি বেশ কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে ভাবলেন, তেমন নতুন বা আশঙ্কাজনক কিছু ঘটলে সিরাজদ্দৌল্লা নিশ্চয়ই তাঁকে বিশদ জানাবেন। তিনি পরে লিখেছেন, এদিকে ইংরেজরা নবাবকে সম্পূর্ণভাবে প্রতারিত করে তাঁর মধ্যে একটা মিথ্যা নিরাপত্তার ভাব সৃষ্টি করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেল। ইংরেজদের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তখনও পর্যন্ত সিরাজের স্পষ্ট কোনও ধারণা ছিল না। কিন্তু ল’ জানাচ্ছেন—‘এই পুরো সময়টাতেই ইংরেজদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ছিল কীভাবে নবাবের সর্বনাশ করা যাবে এবং তাদের [বিপ্লবের] ‘বিরাট প্রকল্প’ সফলভাবে রূপায়িত হবে।’৪১ সিরাজদ্দৌল্লা ১০ জুন একটি চিঠিতে, যেটা ল’ পেলেন ১৯ জুন, ল’-কে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন পাটনাতেই অবস্থান করেন এবং তাঁর সম্বন্ধে কোনওরকম চিন্তা না করেন।৪২ ২০ জুন ল’ পাটনাতে গুজব শুনলেন যে ইংরেজরা মুর্শিদাবাদ অভিমুখে অভিযান করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তিনি ২২ জুনের চিঠিতে সিরাজদ্দৌল্লাকে অনুনয় করে লিখলেন, তাঁর আসা অবধি অপেক্ষা করতে, কারণ তাঁর ভয় হচ্ছিল যে নবাব তাঁর নিজের পক্ষে অসুবিধেজনক একটা সময়ে তাঁর ইংরেজ শত্রুদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে উদ্যোগ নেবেন।৪৩ কার্যত তাই হল—২৩ জুনের মধ্যে সব শেষ। সিরাজদ্দৌল্লাকে সাহায্য করার জন্য ল’ আর মুর্শিদাবাদ পৌঁছে উঠতে পারলেন না।
সিরাজদ্দৌল্লার দৃঢ় সংকল্পের অভাব ও দোদুল্যমান মনোভাবের একটা অন্যতম কারণ ছিল, খুব সম্ভবত, আহমদ শা আবদালির নেতৃত্বে আফগান আক্রমণের আশু সম্ভাবনা। ১৭৫৭ সালের প্রথম দিক থেকেই এ আক্রমণের আশঙ্কা তাঁর কাছে এক বিরাট দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর মনে হয় তিনি ঠিক করে হোক বা ভুল করে তোক ভেবেছিলেন, ইংরেজদের চাইতে তখন আফগানরাই বড় বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাই তিনি ইংরেজদের আপাতত খুশি রাখতে একের পর এক সুযোগ সুবিধে দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ পর্যন্ত ইংরেজদের প্রতি তাঁর আচরণ থেকে স্পষ্ট যে তাদের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাত এড়িয়ে চলাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। আবদালি দিল্লি ও তাঁর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল লুঠতরাজ করে ৩ এপ্রিল দিল্লি থেকে বিদায় নিলেও আফগানদের বাংলা আক্রমণের আশঙ্কা আগের মতোই প্রবলই ছিল, কিছুমাত্র কমেনি। নবাবের সবচেয়ে দক্ষ সৈন্যবাহিনী রাজা রামনারায়ণের নেতৃত্বে আফগান আক্রমণ প্রতিহত করতে বিহার সীমান্তে পাঠানো হয়েছিল। এতে বাংলায় সিরাজের সৈন্যবাহিনী অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। নবাবি ফৌজের যে-অংশ মুর্শিদাবাদে ছিল তাঁর সেনাপতিদের মধ্যে অনেকেই নির্ভরযোগ্য ছিল না।৪৪ সৌভাগ্যক্রমে এপ্রিলের শেষদিকে আফগান বাহিনী ভারতবর্ষ থেকে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে শুরু করল। তখন সিরাজদ্দৌল্লা ক্লাইভকে লিখলেন যে, আফগান আক্রমণের আশঙ্কা যেহেতু বিলীন হয়ে গেছে সেজন্য ইংরেজদের সাহায্য তাঁর আর প্রয়োজন হবে না। তা ছাড়া আবদালির আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়ায় তিনি এখন অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন এবং বেশ কিছুটা সাহস পেয়ে তিনি ক্লাইভকে জানালেন তিনি যেন মুর্শিদাবাদ অভিমুখে তাঁর যাত্রা বন্ধ রাখেন কারণ এটা আলিনগরের সন্ধির পরিপন্থী এবং এতে ওই চুক্তিভঙ্গই করা হবে।৪৫ একই সঙ্গে তিনি মীরজাফরকে পনেরো হাজার সৈন্য নিয়ে পলাশিতে রায় দুর্লভরামের সঙ্গে যোগ দিতে নির্দেশ দিলেন—দুর্লভরাম একমাস ধরে ওখানেই অবস্থান করছিলেন। মনে হয়, আফগান আক্রমণের বিপদ কেটে যাওয়ায় তরুণ নবাব তখন অনেকটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন এবং ইংরেজদের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য মনস্থির করে ফেলেছিলেন। ওয়াটস ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ক্লাইভকে ২৮ এপ্রিল লিখলেন: ‘নবাব [এখন] তুঙ্গে আছেন….আমি আপনাকে অনুরোধ করছি আপনার ফৌজকে এখন কলকাতা ফেরত পাঠান, শুধুমাত্র চন্দননগরে অল্পসংখ্যক সৈন্য রাখুন। এমন ভাব দেখান যে মাথা থেকে যুদ্ধের চিন্তা তাড়িয়ে দিয়েছেন, আপনার লোকজনদের এদিক ওদিক পাঠাবেন না—একেবারে চুপচাপ থাকুক।’৪৬
আসলে ইংরেজরা বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটানোর জন্য অত্যুৎসাহে তাদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে লাগল। সিলেক্ট কমিটির আলোচনায় বলা হল, ‘যেহেতু [দেশের] সবাই একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন চাইছে, সেজন্য আমরা সাহায্য করি বা না করি, বিপ্লবের একটা প্রচেষ্টা হবেই এবং খুব সম্ভবত তা সফলও হবে। ’পলাশির ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের ভূমিকার সমর্থনে কমিটি বলছে—‘এমন একটি ঘটনার অলস ও নির্বিকার দর্শক হয়ে থাকাটা রাজনীতিতে গুরুতর ভ্রান্তি হিসেবেই গণ্য হবে। অন্যদিকে যাকে মসনদে বসাবার পরিকল্পনা হচ্ছে তার মিত্র হিসেবে তার সাহায্যে এগিয়ে গেলে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এবং আমাদের দেশবাসীর প্রভূত লাভেরই সম্ভাবনা।’৪৭ তাই ইংরেজরা এখন সিরাজের প্রতি নরম মনোভাব দেখাতে শুরু করল এবং তাঁকে বেশ মিষ্ট ভাষায় চিঠি দিতে লাগল। পলাশির ষড়যন্ত্র তখনও পূর্ণরূপ না নেওয়ায় ক্লাইভও কিছুটা নরমভাব দেখাতে লাগলেন এবং কিছুটা পিছু হঠতে চাইলেন। তিনি সিরাজকে লিখলেন যে তাঁর অধিকাংশ ফৌজকে কলকাতায় ফেরত যেতে আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং সব কামানগুলিও ওখানে পাঠানো হবে। তিনি কায়দা করে এটাও নবাবকে জানিয়ে দিলেন যে বিনিময়ে নবাবও পলাশি থেকে তাঁর সৈন্যবাহিনী সরিয়ে নেবেন, এটা তিনি চান।৪৮ কিন্তু ততদিনে মিষ্টি কথায় ভোলার পর্যায় সিরাজ পেরিয়ে গেছেন—তাঁর সৈন্যবাহিনীকে পলাশি থেকে সরিয়ে নেবার কোনও চেষ্টাই তিনি করলেন না। এ সময়ই তিনি জাঁ ল’-কে মুর্শিদাবাদে ডেকে পাঠালেন। ল’ যদি ঠিক সময় পৌঁছুতে পারতেন তা হলে পলাশির যুদ্ধে ইংরেজরা আদৌ জয়ী হতে পারত কি না তাতে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে।
