যদিও আপনি নিজে কিছুই করছেন না, আপনার জন্য সর্বস্ব বিপন্ন করতে আমি স্থিরপ্রতিজ্ঞ। আজ সন্ধের মধ্যেই আমি নদীর ওপারে পৌঁছে যাব। আপনি যদি পলাশিতে আমার সঙ্গে যোগ দেন তা হলে আমি মাঝপথ পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে আপনার সঙ্গে মিলিত হতে পারি….আমি আপনাকে শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই এর ওপর আপনার সম্মান ও নিরাপত্তা কতখানি নির্ভর করছে। আপনাকে আমি সম্পূর্ণভাবে আশ্বস্ত করছি যে এটা করলে আপনি তিন প্রদেশেরই (বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা] সুবাদার (নবাব) হবেন। কিন্তু আপনি যদি আমাদের সাহায্যার্থে এটুকুও না করেন তা হলে ভগবান আপনার সহায় হন। আমাদের কিন্তু পরে বিন্দুমাত্র দোষ দিতে পারবেন না।
মীরজাফর যাতে ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দেন তার জন্য একদিকে কী ধরনের প্রলোভন ও অন্যদিকে যে প্রচ্ছন্ন ভীতিপ্রদর্শন করা হয়েছিল, তার উৎকৃষ্ট নিদর্শন ওপরের চিঠিটি। শেষ পর্যন্ত ২২ জুন দুপুরের দিকে ক্লাইভের কাছে মীরজাফরের চিঠি এসে পৌঁছুল এবং বিকেলেই ক্লাইভ পলাশি অভিমুখে অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত মীরজাফরকে জানিয়ে দিলেন।২৬
এদিকে নবাবের শিবিরে তখন সম্পূর্ণ বিভ্রান্তি চলছিল। আমরা আগেই দেখেছি ইংরেজ ও ফরাসিরা উভয়েই তাদের সাধ্যমতো দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উৎকোচ দিয়ে নিজেদের দলভুক্ত করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু জাঁ ল’-র অর্থবল তেমন ছিল না, ফলে তিনি শুধু এমন সব ব্যক্তিদের হাত করতে পেরেছিলেন যাদের সম্বন্ধে ইংরেজদের বিশেষ আগ্রহ ছিল না। এরা ফরাসিদের উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি করেছিল। অন্যদিকে ইংরেজরা প্রচুর টাকাপয়সার জোরে ও উমিচাঁদের সহায়তায় মুর্শিদাবাদ দরবারে ফরাসিদের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল। চন্দননগরের পতনের পর সিরাজদ্দৌল্লা একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েন। বস্তুতপক্ষে এর ফলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসি-নবাব জোটবন্ধনের সম্ভাবনা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তাতে ইংরেজদের পক্ষে নবাবের বিরুদ্ধে জোরালো ব্যবস্থা নেওয়া অনেক সহজ হয়ে পড়ে। চন্দননগর বিজয়ের জন্য বিহ্বল সিরাজ ইংরেজদের ‘উচ্ছ্বসিত অভিনন্দন’ জানালেন২৭ ঠিকই কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কাশিমবাজারে জাঁ ল’-কে উৎসাহিত করতে বা ব্যুসিকে (তখন দাক্ষিণাত্য থেকে কটকের দিকে আসছেন বলে গুজব) চিঠি লিখতে বিরত থাকলেন না। তা ছাড়াও তিনি সৈন্যবাহিনীর একজন সর্দারকে (জমাদার) একশো জন গোলন্দাজ সমেত কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠি পাহারা দেবার জন্য পাঠিয়ে ছিলেন। ফরাসি কুঠির ওপরে নবাবের একটি পতাকাও টাঙিয়ে দেওয়া হল। সিরাজ ল’-কে খবর পাঠালেন, ভয়ের কিছু নেই, তিনি তাঁর সব সৈন্যবাহিনী নিয়ে ফরাসিদের রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত।২৮ ব্যুসিকেও নাকি নবাব লেখেন:২৯
ইংরেজদের বিশ্বাসঘাতকতার কথা আপনাকে কী আর বলব! তারা কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই মঁসিয়ে রেনন্টের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়েছে এবং যুদ্ধে ফরাসিদের পরাস্ত করে তাদের (চন্দননগর) কুঠি দখল করে নিয়েছে। এখন তারা আপনাদের কাশিমবাজার কুঠির প্রধান মঁসিয়ে ল’-র সঙ্গে ঝগড়া বাধাবার চেষ্টা করছে কিন্তু আমি তাতে বাধা দেব এবং তাদের বদ মতলব ভেস্তে দেব। আপনি যখন বালেশ্বরে পৌঁছুবেন তখন আমার আন্তরিকতার নিদর্শনস্বরূপ আমি মঁসিয়ে ল’-কে আপনার সাহায্যার্থে পাঠাব। এখন আমার কর্মচারীদের নির্দেশ পাঠাচ্ছি আপনাকে সবরকম সাহায্য দেবার জন্য।
এ-সব চিঠিপত্রের যাথার্থ্য সম্বন্ধে এখন প্রশ্ন উঠেছে সন্দেহ নেই, কিন্তু ল’ নিজে তাঁর ও সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে ব্যুসির চিঠিপত্রের আদানপ্রদানের কথা উল্লেখ করেছেন।৩০ আসলে সত্যিকারের ব্যাপার বোধহয়, সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের দাপট দেখে কিছুটা ভয় পেয়েছিলেন। আবার দরবারে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। তাই তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সঙ্গে আঁতাত করতে চেয়েছিলেন কিন্তু দুর্বলচিত্ত স্বভাব ও মানসিক স্থৈর্যের অভাবের জন্য দোনামনা করে শেষপর্যন্ত তা করে উঠতে পারেননি।
ইতিমধ্যে চন্দননগরের পতন ও সিরাজদ্দৌল্লার নিঃসঙ্গতার সুযোগে ইংরেজরা আরও সাহসী হয়ে উঠল এবং স্বমূর্তি ধারণ করল। ক্লাইভ এখন ওয়াটসকে এরপর কীভাবে চলতে হবে তার নির্দেশ দিলেন।৩১
এতদিন আমাদের নীতি ছিল নরমে গরমে যখন যে রকম দরকার সেভাবে নবাবকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাংলা থেকে ফরাসিদের তাড়ানোর ব্যবস্থা করা। এখন আমাদের তাঁকে বোঝাতে হবে আমরা যা করেছি তা আমাদের দু’ পক্ষের জন্যই সবচেয়ে উত্তম ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে যে যুক্তি সবচেয়ে কার্যকর হবে তা হল—করমণ্ডল উপকূলে আমাদের ও ফরাসিদের কার্যকলাপের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে নবাবকে বোঝাতে হবে ফরাসিরা কীভাবে নিজাম বাহাদুর সালাবৎ জঙ্গের হাত থেকে তাঁর রাজ্য কেড়ে নিয়ে তাঁকে পুরোপুরি ক্রীড়নক বানিয়েছে…. তা ছাড়া নবাবকে আশ্বস্ত করতে হবে যে আমরা সর্বদা তাঁর শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁকে সাহায্য করব। বিনিময়ে আমরা শুধু চাইব যে, আমাদের সঙ্গে নবাবের যে চুক্তি তা তিনি মেনে চলবেন এবং আমাদের স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে দেবেন। এটাও তাঁকে বোঝাতে হবে যে, ফরমানে আমাদের যে সুযোগসুবিধে দেওয়া হয়েছে তার বেশি কিছু আমরা চাই না। এখন থেকে আমরা শুধু বণিক হিসেবেই কাজকর্ম করব। কিন্তু তাঁর শত্রুদের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করার জন্য আমরা উপযুক্ত সংখ্যক সৈন্য এখানে রাখব। তাঁকে নিশ্চিত করতে হবে যে আমার সৈন্যবাহিনীর বহর দেখে ফরাসিরা আর কোনও ঝামেলা পাকাবার সাহস পাবে না। তবে তারা নবাবের কোনও একটি প্রদেশ দখল না করা পর্যন্ত অস্ত্রসংবরণ নাও করতে পারে। আমাদের দিক থেকে একমাত্র চাহিদা নবাবের সঙ্গে চুক্তি যাতে পুরোপুরি মেনে চলা হয়। এখন যে শুভ সূচনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ হওয়া একান্ত প্রয়োজন আর সেজন্য নবাব যেন যেখানে ফরাসিরা আছে তাদের সে-সব জায়গা এবং সব সম্পত্তি আমাদের হাতে সমর্পণ করেন।
