আপনার পক্ষে বিশেষ করে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারেও আপনি খুব একটা গা করছেন না দেখে আমি খুবই উদ্বিগ্ন হচ্ছি। এ ক’দিনের মধ্যে আমি যখন ফৌজ নিয়ে অভিযান করছি তখন আমি ঠিক কী করব বা কী ব্যবস্থা নেব সে-সম্বন্ধে আপনার কাছ থেকে কোনও ইঙ্গিত বা নির্দেশ পাইনি। আপনার কাছ থেকে কোনও সদুত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমি এখানেই অবস্থান করব আর এগুব না। আমার মনে হয় অতি সত্বর আমার ফৌজের সঙ্গে আপনার যোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ওপরের এই চিঠি থেকে স্পষ্ট, ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠাবার জন্য কতটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মীরজাফর ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা কিন্তু এ-ব্যাপারে পুরো মনস্থির করে ইংরেজদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েননি—তাঁরা দোনামনা করছিলেন। ২১ জুনও ক্লাইভ সিলেক্ট কমিটির কাছে জানতে চাইলেন, এ-অবস্থায় তিনি কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। যুদ্ধক্ষেত্রে মীরজাফর যদি শুধু নিরপেক্ষ থাকতে চান, তার বেশি কিছু করতে রাজি না হন, তা হলে তিনি কী করবেন তা নিয়ে খুব চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁর ভয় হল ইংরেজরা যদি নবাবকে আগে আক্রমণ করে তা হলে তাদের সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসবে না এবং ফলে ইংরেজ ফৌজ নবাবের সঙ্গে যুদ্ধে আটকে পড়বে। সুতরাং ওই অবস্থায় গাজিউদ্দিন খান বা মারাঠাদের বাংলা অভিযান করার জন্য আমন্ত্রণ জানানোই উচিত হবে।১৯
সে যাই হোক, সিলেক্ট কমিটিকে লেখা ক্লাইভের চিঠি ২৩ জুন আলোচনা করা হল। কমিটির দুই সদস্য, রজার ড্রেক ও রিচার্ড বেচার, মত দিলেন যে ক্লাইভ যা আশঙ্কা করছেন তার খুব একটা ভিত্তি নেই। কমিটি সিদ্ধান্ত নিল: ‘নবাবের সঙ্গে নতুন কোনও চুক্তির কথা ভাবা উচিত হবে না। আমাদের শক্তি যদি থাকে এবং সুযোগ যদি আসে, তা হলে এখনই আমাদের নবাবের বিরুদ্ধে অভিযান করা যুক্তিযুক্ত হবে।’ কমিটি এটাও স্থির করল যে আর বেশি দেরি করলে ইংরেজদের শক্তি দিন দিন কমে যাবে, অন্যদিকে নবাবের শক্তি বৃদ্ধি হবে, কারণ নবাব তখন চারদিক থেকে তাঁর অনুগত সৈন্যদের জড়ো করে ফেলতে পারবেন। তাই কমিটি ক্লাইভকে নির্দেশ দিল, যদি ক্লাইভ মনে করেন যে যুদ্ধে ইংরেজদের সাফল্যের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে তা হলে তাড়াতাড়ি নবাবের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করতে। অবশ্য কমিটির কোনও সংশয়ই ছিল না যে, নবাবকে যদি তাড়াতাড়ি আক্রমণ করা যায় তা হলে সাফল্য আসবেই।২০
কমিটির এই চাতুর্যপূর্ণ চিঠি ক্লাইভের কাছে পৌঁছয় ২৭ জুন। ততদিনে যুদ্ধ শেষ, ক্লাইভ বিজয়ী বীর। তিনি ওই চিঠির উত্তর দিলেন রীতিমতো ব্যঙ্গ করে— ‘আপনাদের চিঠির বক্তব্য এমন অসঙ্গতিপূর্ণ ও পরস্পরবিরোধী যে আমার মনে হয় এটা লেখার আসল উদ্দেশ্য, যদি আমার অভিযান ব্যর্থ হয়, তা হলে তার জন্য আপনারা আমার ওপর সম্পূর্ণ দোষ চাপিয়ে নিজেরা বেঁচে যাবেন।’২১ এর মধ্যে ক্লাইভ খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ২১ জুন যুদ্ধবিষয়ক কাউন্সিলের একটি মিটিং ডাকলেন। সিলেক্ট কমিটিকে লেখা একটি চিঠিতে ক্লাইভ এই মিটিং ডাকার কারণ হিসেবে লিখেছেন যে, কোনও দেশীয় শক্তির সাহায্য ছাড়াই নবাবকে আক্রমণ করা ঠিক হবে কি না বা মীরজাফরের কাছ থেকে সাহায্যের সঠিক প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত এগুনো উচিত হবে কি না এ-সব বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নেবার জন্য।২২ আয়ার কুট (Eyre Coote) কাউন্সিলের আলোচ্য বিষয় জানাচ্ছেন:২৩
কর্নেল [ক্লাইভ] কাউন্সিলকে জানান যে নবাবের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হলে তাতে মীরজাফর নিরপেক্ষ থাকবেন, তার বেশি কিছু করবেন বলে তাঁর মনে হয় না। এদিকে মঁসিয়ে ল’ কিছু ফরাসি সৈন্য নিয়ে নবাবের সঙ্গে যোগ দিতে আসছেন, তাঁর পৌঁছুতে দিন তিনেক লাগবে। ক্লাইভ এই সভা ডেকেছেন, এ-অবস্থায় নবাবের ওপর তক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত, না আমরা যেখানে আছি সেখানে আরও সুসংহত হয়ে বর্ষা শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করে তারপর মারাঠাদের নবাবের বিরুদ্ধে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো উচিত, তা জানতে।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে পলাশির যুদ্ধের মাত্র দু’দিন আগেও ক্লাইভ সিরাজদ্দৌল্লাকে গদিচ্যুত করার জন্য মারাঠাদের সঙ্গে হাত মেলাবার কথা চিন্তা করছিলেন। এতে এটাই পরিষ্কার বোঝা যায় যে সিরাজকে হঠিয়ে অন্য কাউকে নবাব করার যে-চক্রান্ত সেটা পুরোপুরি ইংরেজদেরই ‘প্রকল্প’ (‘project’)। এ-প্রকল্পের রূপায়ণের জন্য তারা যে-কোনও শক্তি বা গোষ্ঠীর সাহায্য নিতে প্রস্তুত—মুর্শিদাবাদ দরবারের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর ওপরই শুধুমাত্র তারা নির্ভর করে ছিল না।
যুদ্ধবিষয়ক কাউন্সিলে ক্লাইভ নবাবকে এক্ষুনি আক্রমণ করার বিরুদ্ধে ভোট দিলেন। কাউন্সিলের অন্য বারোজন সদস্যও এর বিরুদ্ধে ভোট দিল। পক্ষে ভোট মাত্র সাত। কিন্তু এই মিটিং-এর এক ঘণ্টা পরেই ক্লাইভ আয়ার কুটকে জানালেন যে পরের দিনই নবাবের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করা হবে,২৪ যদিও তখনও পর্যন্ত মীরজাফরের কাছ থেকে ইতিবাচক কোনও সংকেত বা নির্দেশ এসে পৌঁছয়নি। এতেই স্পষ্ট যে, বিপ্লব সংগঠিত করতে ইংরেজরা শুধু অস্থিরই নয়, খুব উদগ্রীবও হয়ে পড়েছিল। ২২ জুন ভোরবেলা ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজ বাহিনী পলাশি অভিমুখে অভিযান শুরু করল। কিন্তু সেদিনই সম্ভবত যাত্রা শুরু করার আগে ক্লাইভ আবার মীরজাফরকে তাঁর সঙ্গে এসে যোগ দিতে ব্যাকুল হয়ে চিঠি লিখলেন:২৫
