মুজাফ্ফরনামা-র লেখক করম আলি বলেছেন যে, ওয়াজিদ নবাব আলিবর্দি ও সিরাজদৌল্লা উভয়কেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে উসকানি দিয়েছিলেন।১৩৮ এটা অবশ্য ওয়াজিদের প্রতি ক্লাইভসহ ইংরেজদের যে মনোভাব তারই প্রতিধ্বনি। এর ওপর নির্ভর করা যায় না। ক্লাইভ ওয়াজিদকে ফরাসিদের ‘এজেন্ট’ বলে মনে করতেন।১৩৯ নিজের স্বার্থ ওয়াজিদ ভাল করেই বুঝতেন এবং তিনি এটাও ভাল করে জানতেন, ইংরেজদের বিতাড়িত করে তাঁর কোনও স্বার্থসিদ্ধিই হবে না। তাঁর সোরা ও লবণের একচেটিয়া ব্যবসা বা আফিং-এর বাণিজ্য কিংবা তাঁর সমুদ্রবাণিজ্য, কোনওটাই ইংরেজদের তাড়িয়ে দিলে খুব কিছু লাভবান হবে না। তবে এ-কথা সত্য যে তিনি ইংরেজদের চেয়ে ফরাসি ও ডাচদের প্রতি বেশি অনুকূল ভাবাপন্ন ছিলেন। কিন্তু প্রথমোক্ত দু’জনের সঙ্গে তাঁর যে সম্পর্ক তা ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের পরিপন্থী ছিল না। জাঁ ল-’র মন্তব্যই সঠিক যে ওয়াজিদ সবার সঙ্গেই ভাল সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইতেন।১৪০ তবে তাঁর নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের যে সাম্রাজ্য তা বজায় রাখাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য—যে-কোনও মূল্যেই তিনি তা করতে প্রস্তুত ছিলেন। সম্ভবত এ জন্যই তিনি ১৭৫২ সালে মসনদের ভাবী উত্তরাধিকারী সিরাজদৌল্লার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি এবং দরবারে প্রতিপত্তি নবাবের আনুকূল্যের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। অচিরেই তিনি সিরাজের ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ পরামর্শদাতাদের মধ্যে অন্যতম বলে পরিগণিত হন।
জাঁ ল’-র সঙ্গে ওয়াজিদই সিরাজদৌল্লার পরিচয় করিয়ে দেন। ল’ তাঁর সম্বন্ধে যে বিবরণ দিয়েছেন তা শুধু আকর্ষণীয় নয়, অনেকাংশে সঠিকও বটে। তিনি লিখেছেন:
সবাই জানে ওয়াজিদ আমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী এবং তিনি হুগলির সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী। তবে তিনি খুবই দুর্বল প্রকৃতির লোক। খুব সম্ভবত তিনি শেঠদের পছন্দ করতেন না। তাঁদের ভয় করতেন। সেজন্য আমাদের দিক থেকে তাঁর প্রয়োজনীয়তা বিশেষ ছিল না।১৪১
অবশ্য বাইরে থেকে ওয়াজিদের সঙ্গে শেঠদের শত্রুতা বোঝা যেত না, যদিও তাঁরা যে পরস্পরের বন্ধু ছিলেন না সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। সম্ভবত এই কারণেই দরবারের ষড়যন্ত্রীদের মধ্যে জগৎশেঠরা মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন বলেই ওয়াজিদ যতদিন সম্ভব পলাশি চক্রান্তের বাইরে ছিলেন এবং নবাবের সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন।
ওয়াজিদ যে জগৎশেঠদের সঙ্গে নিজেকে প্রথম দিকে যুক্ত করেননি তার প্রমাণ দরবারে উমিচাঁদের ‘এজেন্ট’ হাজারিমলের ১৭৫৬-এর ২৩ নভেম্বরের চিঠিতে পাওয়া যায়। হাজারিমল লিখছেন, দরবারে জগৎশেঠরা ও ওয়াজিদ দুটো ভিন্ন দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং শেঠদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তিনি ইংরেজদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করছিলেন।১৪২
এখানে যে-প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসছে সেটা হচ্ছে, তা হলে ওয়াজিদ কেন শেষপর্যন্ত পলাশি চক্রান্তে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন? মনে হয় ইংরেজদের হুগলি আক্রমণের পর তিনি তাঁর বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা সম্বন্ধে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাই তিনি সিরাজদৌল্লাকে পরামর্শ দেন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সঙ্গে আঁতাত করার জন্য। ১৭৫৭ সালের ২৩ মার্চ ইংরেজদের হাতে চন্দননগরের পতনের পর ওয়াটস লেখেন যে, ফরাসিদের পরাজয়ের পর সিরাজদৌল্লা ওয়াজিদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন কারণ ওয়াজিদ নবাবকে বুঝিয়েছিলেন যে ফরাসিরা ইংরেজদের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ইংরেজরা তাদের বিরুদ্ধে কখনওই সফল হবে না।১৪৩ এ থেকে স্পষ্ট যে নবাবের সঙ্গে ফরাসিদের সম্ভাব্য আঁতাতের ওপরই ওয়াজিদ তাঁর নিজের বাঁচার একমাত্র উপায় বলে ভেবেছিলেন। সেটা তো হল না, কিন্তু তা সত্ত্বেও ওয়াজিদ সবার শেষেই পলাশির ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছিলেন। ১৭৫৭ সালের মে মাস পর্যন্ত তিনিই ছিলেন ষড়যন্ত্র সফল করার পথে অন্যতম অন্তরায়। তাই ওয়াটস ৩ মে ক্লাইভকে লেখেন:১৪৪
আমি শুনলাম যে খোজা ওয়াজিদের গোমস্তা শিববাবু আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।….তাঁর মনিব ফরাসিদের মঙ্গলার্থে আত্মোৎসর্গ করেছেন এবং প্রথম থেকেই তিনি দরবারে তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং তিনি সেখানে তাদের ‘এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করছেন। শুধু তাই নয়, তিনি ফরাসিদের ক্ষমতা ও সামরিক শক্তি সম্বন্ধে নানারকমের অতিরঞ্জিত গল্প বাজারে চালু করেছিলেন….সংক্ষেপে বলতে গেলে তিনি আমাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি শত্রুতা করেছেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন। নবাবের সঙ্গে আমাদের যে ঝামেলা চলছে তার জন্য তিনিই অনেকাংশে দায়ী। তিনি নবাবকে আমাদের বিরুদ্ধে সবসময় উসকে দেন এবং আমাদের সম্বন্ধে প্রায়ই নবাবের মনে ভীতি ও আশঙ্কা ধরিয়ে দেন….শিববাবু এবং তাঁর মনিব আমার আর স্ক্র্যাফ্টনের প্রতি অত্যন্ত বিরূপ এবং পারলে আমাদের শেষ করে দেন।
যদিও ওয়াজিদ অনেকদিন পর্যন্ত পলাশি চক্রান্তের বাইরে ছিলেন, তা সত্ত্বেও তিনি ভাল করেই জানতেন যে দরবারের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি এতে জড়িত ছিলেন। রবার্ট ওরম জানিয়েছেন যে, দেশীয়দের মধ্যে ষড়যন্ত্রের অন্যতম নায়ক উমিচাঁদ ছিলেন ওয়াজিদের বন্ধু এবং অনেক ব্যবসাতেই তাঁর অংশীদার।১৪৫ খুব সম্ভবত উমিচাঁদ তাঁর ঘনিষ্ঠ ওয়াজিদের কাছে যড়যন্ত্রের কথা গোপন করেননি। তা ছাড়া দরবারের অমাত্যদের সঙ্গে ওয়াজিদের যে ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং সারা দেশে তাঁর নিজের বিস্তৃত ব্যবসায়িক সংগঠনের যে-সব লোকজন ছিল তাদের মারফত তিনি নিশ্চয়ই ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে খবর পেতেন এবং একেবারে অন্ধকারে ছিলেন না। কিন্তু সুচতুর ও পাকা হিসেবি ওয়াজিদ একেবারে শেষ মুহূর্তে ষড়যন্ত্রে সামিল হন, যখন তিনি বুঝলেন যে, নবাবের পরিত্রাণের আর কোনও সম্ভাবনাই নেই। তিনি শেষ মুহুর্তে ষড়যন্ত্রে যোগ দেন কারণ তাঁর বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক আনুকূল্য। ততদিনে মুর্শিদাবাদ থেকে জাঁ ল-’র বিতাড়নের ফলে নবাবের পক্ষে ফরাসিদের হস্তক্ষেপের সব সম্ভাবনাই নষ্ট হয়ে যায়। আবার, তাঁর দেওয়া পরামর্শ—নবাব ফরাসিদের সঙ্গে আঁতাত করুন—ব্যর্থ হওয়ায় সিরাজদৌল্লাও তাঁর প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং তাঁকে পরিত্যাগ করেন। মে মাসের প্রথমদিকে দরবারে তাঁর অবস্থা এমন শোচনীয় হয়ে পড়ে এবং তিনি নিরাপত্তার এমনই অভাব বোধ করতে থাকেন যে সম্ভবত তিনি ইংরেজদের কাশিমবাজার কুঠিতে আশ্রয় নেন। ওয়াটস ক্লাইভকে ৯ থেকে ১৩ মে-র মধ্যে কোনও এক সময় লেখেন, ‘খোজা ওয়াজিদ এখন নবাবের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত। উমিচাঁদকে দিয়ে আমার কাছে খবর পাঠিয়েছেন আমি যেন তাঁকে আমাদের কুঠিতে লুকিয়ে আশ্রয় দিই।’১৪৬
