ওয়াজিদ একদিকে নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যদিকে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলিকে পণ্যসরবরাহের সূত্রে বাংলার অন্তর্বাণিজ্যে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ফরাসি ও ডাচ কোম্পানির সঙ্গে এবং উমিচাঁদের মাধ্যমে ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গেও তাঁর ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। দরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি কিছু কিছু পণ্যের একচেটিয়া ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন। এভাবে তিনি বাংলায় সোরা ও লবণের ব্যবসা কুক্ষিগত করেন।১২৫ তিনি বিহারের আফিং-এর ব্যবসাও নিজের একচেটিয়া আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেছিলেন। ওখানেও দরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি এ-সব করতে সক্ষম হন।১২৬ এভাবে বাংলার অন্তর্বাণিজ্যে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে তিনি সমুদ্রবাণিজ্যে অংশ নিতে শুরু করেন। ডাচ কোম্পানির রেকর্ডস থেকে জানা যায়, ১৭৪০-এর দশকের মাঝামাঝি ওয়াজিদের বাণিজ্যতরী বাংলা থেকে পণ্যসম্ভার নিয়ে সুরাট যাচ্ছে আর পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে তাঁর বেশ কয়েকটি বাণিজ্যতরী বিভিন্ন দিকে পাড়ি দিচ্ছে। ওই সব রেকর্ডস থেকে ওয়াজিদের এরকম অন্তত ছয়টি বাণিজ্যতরীর হদিস আমরা পাই যেগুলি হুগলি থেকে জেড্ডা (Jedda), মোখা (Mocha), বসরা (Basra), সুরাট ও মসুলিপট্টনমে পণ্যসম্ভার নিয়ে যাতায়াত করত। বাংলায় ডাচ কোম্পানির প্রধান ইয়ান কারসেবুম (Jan Kerseboom) ও কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল সুরাটে ওয়াজিদের বাণিজ্য কুঠির উল্লেখ করেছেন।১২৭
সুতরাং ১৭৫০-এর দশকের সংকটপূর্ণ সময়ে এ হেন ওয়াজিদ যে বাংলার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবেন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। প্রায় সমসাময়িক ঐতিহাসিক ইউসুফ আলি খান লিখেছেন যে, ওয়াজিদ নবাব আলিবর্দির বিশেষ প্রিয়পাত্র এবং ব্যক্তিগত বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। হুগলির সবচেয়ে বড় সওদাগর ওয়াজিদের ব্যবসা-বাণিজ্য এতই সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে যে তিনি তা থেকে বিশাল সম্পদের অধিকারী হন। তিনি সাধারণত ফখর-উল-তুজ্জার (সওদাগরের গর্ব) হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।১২৮ তাঁর প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার আরও ইঙ্গিত পাওয়া যায় ডাচ ও ইংরেজ কোম্পানির নথিপত্র থেকে। ডাচ কোম্পানির প্রধান হাউখেনস (Huijghens) ১৭৫০-এর প্রথমদিকে তাঁর Memorie-তে লেখেন যে, ওয়াজিদের সঙ্গে ডাচ কোম্পানির ভাল সম্পর্ক রেখে চলা উচিত কারণ মুর্শিদাবাদ দরবারে তাঁর সম্মান ও প্রতিপত্তি অত্যন্ত প্রবল।১২৯ বস্তুত বাংলায় ডাচ কোম্পানির প্রায় সব ডাইরেক্টর মুর্শিদাবাদ দরবারের সঙ্গে ওয়াজিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে কথা ও সেখানে তাঁর বিশিষ্ট স্থান সম্বন্ধে মন্তব্য করে গেছেন। ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীরাও দরবারে ওয়াজিদের প্রভাব দেখে একাধিকবার বলেছেন যে, তিনি একজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী কিংবা তিনি ‘নবাব সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।’১৩০ বাংলার রাজনীতিতে ওয়াজিদ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তা ডাচ কোম্পানির ডাইরেক্টর ইয়ান কারসেবুমের লেখা থেকেও স্পষ্ট। কারসেবুম তাঁর ‘মেমোরি’-তে ১৭৫৫ সালে লেখেন :১৩১
বাংলায় যে-সব গণ্যমান্য ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের কোম্পানির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন, তাদের মধ্যে খোজা ওয়াজিদ অন্যতম। সম্প্রতি তাঁকে ফখর-উল-তুজ্জার উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। এর অর্থ তিনি ‘সম্পদের পূজারি’। প্রকৃতই তিনি শাসককুলের ধনসম্পত্তির রক্ষকের ভূমিকা নিয়েছেন। তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এঁদের প্রয়োজনমতো অর্থ সাহায্য করেন, কোনও রকম জোরজুলুমে বাধ্য হয়ে নয়।
সেই বছরই কারসেবুমের পরবর্তী ডাইরেক্টর টেইলেফার্ট (Taillefert) মন্তব্য করেন যে, কোম্পানির উপনিবেশ চুঁচুড়াতে ওয়াজিদের মতো এমন সব সম্মানিত ও প্রতিপত্তিশালী সওদাগরকে বসবাস করার অনুমতি দেওয়া ঠিক হয়নি। কারণ এঁরা একদিকে সমুদ্রবাণিজ্য করেন অন্যদিকে অন্তর্বাণিজ্যেও লিপ্ত। ফলে এঁদের ডাচ কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী বলেই গণ্য করা যায়। এঁরা নিজেদের ডাচ কোম্পানির ডাইরেক্টরদের থেকে বড় না ভাবলেও তাদের সমকক্ষ বলে মনে করেন। ১৩২
উপরোক্ত বর্ণনা থেকেই প্রাক্-পলাশি বাংলার রাজনীতিতে ওয়াজিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে পড়ে। মুর্শিদাবাদ দরবারে ওয়াজিদের প্রভাব যে কতটা প্রবল তার প্রমাণ, সিরাজদৌল্লা মসনদে বসার পর তাঁকে ইংরেজদের সঙ্গে আপস-মীমাংসার দৌত্যে নিযুক্ত করেন। জাঁ ল’ মন্তব্য করেছেন যে ওয়াজিদ ইউরোপীয়দের সঙ্গে নবাবের কটনৈতিক আলাপ-আলোচনার দায়িত্বে ছিলেন।১৩৩ ইংরেজরা কলকাতা থেকে বিতাড়িত হবার পরে মাদ্রাজ থেকে সৈন্যসম্ভার নিয়ে রবার্ট ক্লাইভ ও মেজর কিলপেট্রিক (Killpatrick) বাংলায় এসে ওয়াজিদকে (অবশ্য অন্য দু’জন বণিকরাজাকেও) অনুরোধ করেন, কোম্পানি ও নবাবের সঙ্গে একটা মিটমাটের ব্যবস্থা করতে।১৩৪ আবার ইংরেজরা হুগলি বন্দর আক্রমণ ও লুঠ করার পর নবাবের সঙ্গে শান্তিচুক্তির শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা করার জন্য ক্লাইভ ওয়াজিদকেই পাঠান ২২ জানুয়ারি ১৭৫৭। ওয়াজিদ ক্লাইভকে জানিয়েছিলেন যে এই শর্তগুলির মধ্যে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের সংস্কার ও দুর্ভেদ্যীকরণ নবাব মেনে নিলেও, অন্য শর্ত যে তাদের মুদ্রা তৈরির স্বাধীনতা দিতে হবে, সেটা নবাব কিছুতেই মেনে নেবেন না।১৩৫ এই থেকেই বোঝা যায় যে ওয়াজিদ তদানীন্তন বাংলার আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি জানতেন জগৎশেঠরা টাঁকশালে মুদ্রা তৈরির একচেটিয়া অধিকার ভোগ করছিলেন এবং তাঁরা কোনওমতেই এটা হাতছাড়া হতে দেবেন না।১৩৬ সমসাময়িক নথিপত্র থেকে এটা স্পষ্ট, ইংরেজদের হুগলি আক্রমণের ফলে ওয়াজিদ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তিনি কিন্তু নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার জন্য যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন।১৩৭
