সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে ওয়াজিদ নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের সাম্রাজ্য বাঁচাতে অনন্যোপায় হয়েই একেবারে শেষ মুহুর্তে পলাশি চক্রান্তে যোগ দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁর এবং তাঁর মতো অন্য দু’জন বণিকরাজারও কপাল খারাপ— পলাশি, কিছুটা আগে-পরে, বাংলার এই তিন বণিকরাজারই পতন ডেকে আনে। ১৭৫৮ সালেই ওয়াজিদের পতন সম্পূর্ণ হয়ে যায়—তিনি ঘোষণা করেন যে ইংরেজরা তাঁর ব্যবসাবাণিজ্য ধ্বংস করেছে এবং তাঁকে সর্বনাশের পথে ঠেলে দিয়েছে। এটা পরিষ্কার যে ওয়াজিদের পতন পলাশিতে ইংরেজবিজয়ের প্রত্যক্ষ ফল। অবশ্য জাঁ ল’ বলছেন যে, ওয়াজিদ তাঁর কূটনীতি ও হঠকারিতার শিকার হয়েছেন।১৪৭ এটা ঠিক মানা যায় না। যদি কোনও একটা বিশেষ কারণকে ওয়াজিদের পতনের মুখ্য কারণ হিসেবে ধরতে হয়, তবে তা হল তাঁর প্রতি ক্লাইভের প্রচণ্ড রোষ। ক্লাইভ তাঁকে ‘ভিলেন’ বলে মনে করতেন কারণ তিনি সন্দেহ করতেন ওয়াজিদ ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সাহায্য করছিলেন। তা ছাড়াও ক্লাইভের ঘোরতর সন্দেহ ছিল যে পলাশির পর ১৭৫৭ সালে ফরাসিদের বাংলায় হস্তক্ষেপ করার পরিকল্পনার সঙ্গে ওয়াজিদও যুক্ত ছিলেন। ক্লাইভ ওয়াটসকে লেখেন: ‘কাগজপত্রের মধ্যে ওয়াজিদের একটা চিঠি পাওয়া গেছে যাতে ও-সব [ফরাসিদের পরিকল্পনা] ব্যাপারের উল্লেখ আছে। আমি চাই যে আপনি ওই ভিলেনের সর্বনাশের ব্যবস্থা করুন—ও কিন্তু মনেপ্রাণে ফরাসি৷’১৪৮ ইংরেজদের পক্ষে ওয়াজিদের সর্বনাশ সম্পূর্ণ করার সুযোগ এল ১৭৫৯-তে।
ওয়াজিদ বুঝতে পেরেছিলেন, ইংরেজরা যতদিন বাংলায় ক্ষমতার শীর্ষে থাকবে, ততদিন তাঁর ধ্বংসোন্মুখ বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য রক্ষা করার কোনও উপায় নেই। তাই মরিয়া হয়ে তিনি আবার জুয়া খেলে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাইলেন। জুয়ায় আবার হারলেও তাঁর আর বেশি কী ক্ষতি হবে কিন্তু জিতলে অনেক লাভ—হয়তো এটাই তিনি ভেবেছিলেন। তিনি ডাচদের সঙ্গে পরিকল্পনা করলেন যে, ডাচরা বাংলা আক্রমণ করে ইংরেজদের তাড়াবার চেষ্টা করবে। কিন্তু পলাশির মতো, তাঁর এই দ্বিতীয় জুয়া খেলাও ব্যর্থ হল৷ ডাচদের পরাজয়ের পর ওয়াজিদের সর্বনাশ ঠেকানো আর কোনও রকমেই সম্ভব ছিল না। ক্লাইভ খুব উৎফুল্ল হয়ে ওয়াজিদের পতন বর্ণনা করেছেন: ‘আমি জানতাম যে নবাবের সঙ্গে আমাদের কলকাতায় যে সাম্প্রতিক ঝামেলাটা হয়েছিল তার প্রধান হোতা হচ্ছে ওই ‘রাসকেল’ ওয়াজিদটা। আবার আমাদের সঙ্গে ডাচদের বিরোধ বাঁধাতে সে এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। তাই আমি ভাবলাম তাকে হাতকড়া পরানো দরকার যাতে সে ভবিষ্যতে মহামান্য নবাব [মীরজাফর], আপনি [মীরণ] এবং আমার [ক্লাইভ] মধ্যে যে দৃঢ় বন্ধুত্ব হয়েছে তা যেন ভাঙতে না পারে।’১৪৯ ওয়াজিদকে ধরে জেলে পোরা হল। সেখানে তিনি বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন।১৫০
.
সূত্রনির্দেশ ও টীকা
১. পূর্বতন ঐতিহাসিকদের মতো (পিটার মার্শাল, রজত রায় ইত্যাদি) সম্প্রতি কুমকুম চ্যাটার্জীও (Merchants, Politics and Society, 1996, p. 103) বলেছেন যে ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীরাই সিরাজদৌল্লাকে হঠাবার জন্য চক্রান্তে যোগ দিতে ইংরেজদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এ বক্তব্য মোটেই যুক্তিগ্রাহ্য নয়। তিনি আরও বলেছেন যে ইংরেজরা নবাব-বিরোধী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিল কারণ তারা ভয় পেয়েছিল সিরাজদৌল্লা হয়তো ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের সঙ্গে আঁতাত করবেন। আমরা অবশ্য তথ্য-প্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছি তাঁর এই মতও গ্রহণ যোগ্য নয়।
২. ওয়ালসকে লেখা স্ক্র্যাফ্টনের চিঠি, ৯ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, III, p. 343.
৩. Scrafton, Reflections, p. 81.
৪. ঐ, পৃ. ৯৮।
৫. Watts’ to Governor and Fort William Council, 15 Aug. 1755, BPC, Range 1, vol. 28; FWIHC, vol. 1, pp. 884-85.
৬. Watts’ Memoirs, p. 37.
৭. ঐ, পৃ. ৪২।
৮. Orme, Military Transactions, vol. II, Sec, I, p. 148; তাঁর পিতাকে লেখা ওয়াটসের চিঠি, ১৩ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, II, p. 468.
৯. Law’s Memoirs, Hill, III, p. 191.
১০. Watts’ Memoirs, p. 80.
১১. ক্লাইভকে ওয়াটস, ২৩ মে ১৭৫৭, Hill, II, pp. 392-93.
১২. ওয়াটস তাঁর পিতাকে, ১৩ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, II, p. 469.
১৩. লন্ডনের সিক্রেট কমিটিকে ক্লাইভ, ৬ আগস্ট ১৭৫৭, Hill, II, p. 465.
১৪. Hill, 1, p. clxxxiv; Hill, II, p. 367.
১৫. ওয়ালসকে স্ক্র্যাফ্টন, ১৮ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, II, pp. 342-43.
১৬. ঐ, ২০ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, II, p. 349.
১৭. ঐ, পৃ. ৩৫০৷
১৮. ঐ।
১৯. ওয়ালসকে স্ক্র্যাফ্টনের চিঠি, ২১ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, I, p. 351.
২০. ক্লাইভকে স্ক্র্যাফ্টনের চিঠি, ২৪ এপ্রিল ১৭৫৭, Hill, II, pp. 357-58.
২১. ঐ, পৃ. ৩৫৮।
২২. Fort St. George, Select Committee Consultations, 1 Oct. 1756, Hill, II, p. 225; ক্লাইভকে ফোর্ট সেন্ট জর্জ কাউন্সিল, ১৩ অক্টোবর ১৭৫৬, Hill, II, p. 234.
২৩. Scrafton, Reflections, p. 62.
২৪. সিয়র-উল-মুতাখারিন, ২য় খণ্ড, পৃ. ২১৯; মুজাফ্ফরনামা, পৃ. ৭১; রিয়াজ-উস-সলাতিন,পৃ. ৩৭০।
২৫. Michael Edwardes, Plassey, p. 84; Mark Bence-Jones, Clive of India, p. 189.
