মীরজাফরের সঙ্গে রায়দুর্লভের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকলেও, ইংরেজদের সঙ্গে মীরজাফরের চুক্তি হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি ষড়যন্ত্রে পুরোপুরি যোগ দিয়েছিলেন বলে মনে হয় না। তা না হলে এর ক’দিন আগে উমিচাঁদ পলাশিতে তাঁর সঙ্গে দেখা করায় ইংরেজরা তাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে বলে এত ভয় পেত না। রায়দুর্লভ যে চুক্তির ব্যাপারে প্রথমে আপত্তি করেছিলেন সেটা, ইংরেজদের সন্দেহ, উমিচাঁদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের ফল। ওয়াটস মনে করতেন মীরজাফর রায়দুর্লভের হাতের পুতুল। তাই তিনি লিখেছিলেন যে মীরজাফর রায়দুর্লভের সঙ্গে পরামর্শ না করে চুক্তিতে সই করবেন না।১১৮ ইংরেজরা আসলে রায়দুর্লভ সম্বন্ধে সন্দেহমুক্ত হতে পারছিল না। তাই ক্লাইভ ৬ জুনও ওয়াটসকে লেখেন যে, তাঁর সন্দেহ, মীরজাফর ও ইংরেজদের উভয়ের প্রতিই রায়দুর্লভ বিশ্বাসঘাতকতা করছেন।১১৯ বিপ্লবের পরেও কিন্তু তিনি রায়দুর্লভের প্রতি সদয় ছিলেন না। সিলেক্ট কমিটিকে তিনি ২৭ জুন লিখলেন : ‘আমি কালই মুর্শিদাবাদ যাচ্ছি কারণ রায়দুর্লভের হাতে যে প্রচণ্ড ক্ষমতা এবং সেই সঙ্গে তাঁর ছলনাচাতুরি ও দুষ্টবুদ্ধি মিলে নবাব এবং আমাদের উভয়েরই পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে। তা আটকাতেই আমার যাওয়া প্রয়োজন।’১২০ যা হোক নবাব হওয়ার পর মীরজাফর দুর্লভরামকে তাঁর প্রধান অমাত্য ও সব দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নিয়োগ করেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই দু’জনের সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায়। গোলাম হোসেন লিখছেন, এই দু’জন এক সময় এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন কিন্তু এখন পরস্পরের মধ্যে বিদ্বেষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাঁদের মধ্যে কথাবার্তাই বন্ধ এবং একে অপরের প্রতি ঘৃণা পোষণ করেন।১২১ এর ফলে দু’জনের মধ্যে যে বিরোধের সৃষ্টি হয় তাতে ক্লাইভ দুর্লভরামকে সমর্থন করেন কারণ পলাশি-উত্তর ক্ষমতার লড়াইয়ে দুর্লভরামের পেছনে দাঁড়ানোই ইংরেজদের স্বার্থের অনুকূল ছিল।
ইয়ার লতিফ
পলাশির ষড়যন্ত্রে ইয়ার লতিফের ভূমিকা নিতান্তই নগণ্য। উত্তরভারতীয় এই যোদ্ধা ছিলেন দু’হাজারি মনসবদার। জগৎশেঠদের সুরক্ষার জন্য তিনি তাঁদের কাছ থেকে একটা মাসোহারা পেতেন। নবাবের সৈন্যবাহিনীতে তাঁর স্থান খুব একটা উঁচুতে ছিল না। তবু তাঁর ছিল প্রবল উচ্চাকাঙক্ষা। তাই ওয়াটস যখন উমিচাঁদের সাহায্যে সিরাজের জায়গায় নবাব হওয়ার বাসনা আছে এমন কারও খোঁজ করছিলেন, তখন ইয়ার লতিফ উমিচাঁদকে তাঁর মনোবাসনার কথা ব্যক্ত করেন এবং ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দিতে তিনি রাজি আছেন বলে জানান। তিনি এটাও বলেন যে, জগৎশেঠরা তাঁর পেছনে আছেন যেটা পরে মীরজাফরও দাবি করেছিলেন। যদিও ওয়াটস উমিচাঁদের মারফতই ইয়ার লতিফের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তবে সম্ভবত ইয়ার লতিফ উমিচাঁদেরই পছন্দসই লোক। ইয়ার লতিফের প্রস্তাব যে শুধু ওয়াটসই লুফে নিলেন তা নয়, ক্লাইভও এ-প্রস্তাবে সায় দিলেন। যদিও স্ক্র্যাফ্টন বলেছেন, ইয়ার লাতিফ নবাব হওয়ার পক্ষে ‘যোগ্য লোক’ এবং তাঁর পেছনে জগৎশেঠদের সমর্থন আছে এবং যদিও ওয়াটস প্রথমে প্রায় একই ধরনের কথা বলেছিলেন, ক্লাইভ কিন্তু ইয়ার লতিফ সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানতেন না। তা সত্ত্বেও তিনি লতিফকে সিরাজের পরিবর্তে মসনদে বসাবার পরিকল্পনায় সামিল হয়েছিলেন।১২২ আসলে ইংরেজরা বিপ্লব ঘটাবার আগ্রহে ও তাগিদে সিরাজদৌল্লার পরিবর্তে নবাব হতে চায় এমন যে-কোনও রাজপুরুষকে খুঁজে বার করতে চাইছিল। ব্যক্তি হিসেবে তিনি কেমন হবেন তা নিয়ে তাঁদের মাথাব্যথা ছিল না। এ-বক্তব্য যে একেবারে যথার্থ তার প্রমাণ, ইয়ার লতিফকে নবাব করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক’দিন পরেই যখন মীরজাফরের হদিস পাওয়া গেল, তখন তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ইয়ার লতিফকে পরিত্যাগ করে মীরজাফরকে নবাব করার পরিকল্পনা করল। আমরা অন্যত্র বলেছি, ইংরেজরা বুঝতে পেরেছিল যে ইয়ার লতিফকে সামনে রেখে সিরাজদৌল্লাকে হঠাবার যড়যন্ত্র সফল করা মুশকিল হতে পারে। সেজন্য যেই মীরজাফরের মতো শক্তিশালী আরেকজন প্রার্থী পাওয়া গেল, তক্ষুনি তারা ইয়ার লতিফকে বাদ দিয়ে মীরজাফরকে মসনদে বসাবার সিদ্ধান্ত নিল।
খোজা ওয়াজিদ
বাংলার দুই বণিক রাজা জগৎশেঠ ও উমিচাঁদের মতো অন্য বণিকরাজা আর্মানি খোজা ওয়াজিদ কিন্তু পলাশির চক্রান্তে যোগ দিয়েছিলেন একেবারে শেষ পর্যায়ে— যখন চক্রান্ত একেবারে পাকা। তাই তিনি কেন যে শেষ মুহুর্তে ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যোগ দিলেন তা বিশ্লেষণ করা একান্ত প্রয়োজন। প্রথম থেকেই ওয়াজিদ ছিলেন নবাব সিরাজদৌল্লার একান্ত আপনজন ও অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন, নবাবের অন্তরঙ্গ পরামর্শদাতাদের একজন, ফরাসিদের বন্ধু এবং সে হিসেবে ইংরেজবিরোধী। কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনিও সিরাজদৌল্লাকে পরিত্যাগ করে তাঁর শত্রুদের সঙ্গে যোগ দেন এবং ইংরেজদের বিপ্লবের পরিকল্পনায় নিজেকে যুক্ত করেন।
ওয়াজিদ যে ১৭৪০ ও ৫০’-এর দশকে বাংলার বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।১২৩ বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যের রাজধানী হুগলি থেকেই তিনি তাঁর ব্যবসার সাম্রাজ্য চালাতেন, সূক্ষ্ম কূটনীতি অবলম্বন করে এবং প্রয়োজনমতো নবাব আলিবর্দিকে আর্থিক সাহায্যের মাধ্যমে ওয়াজিদ নবাবের দরবারে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রকৃতপক্ষে হুগলি ফৌজদারের দরবারে সামান্য ব্যক্তি থেকে ১৭৪০-এর দশকের মাঝামাঝি তিনি মুর্শিদাবাদ দরবারে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে নিয়েছিলেন।১২৪ আর ১৭৪০-এর দশকের শেষদিকে দরবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিহারের অর্থনীতির ওপর নিজের প্রায় একচেটিয়া দখল প্রতিষ্ঠিত করে নেন।
