হীরাঝিল
হীরাঝিলের প্রাসাদ নির্মাণ করেন সিরাজদ্দৌল্লা। তখনও তিনি যুবরাজ, নবাব হননি। ফর্হাবাগ থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে মাইল খানেক দূরে, জাফরাগঞ্জের উল্টোদিকে এই প্রাসাদ। মুঘল সম্রাট শাজাহানের মতো সিরাজদ্দৌল্লারও সৌন্দর্যপ্রীতি ছিল এবং সেজন্যই তিনি এই প্রাসাদ তৈরি করেন বলে মনে করা হয়। প্রাসাদের সঙ্গে তিনি একটি কৃত্রিম ঝিলও তৈরি করেন, ঝিলের নাম হীরাঝিল (Lake of Diamonds)। ঝিলের নাম অনুসারে প্রাসাদের নাম হয় হীরাঝিল প্রাসাদ। ঝিলের দু’দিক পাথর দিয়ে বাঁধানো। গৌড়ের ধ্বংসস্তূপ থেকে নানা রকম পাথর এনে এই ভবন তৈরি হয়। এটি প্রধানত ইঁট দিয়ে তৈরি কিন্তু জায়গায় জায়গায় পাথর বসিয়ে সিরাজ এর সৌন্দর্যবৃদ্ধির চেষ্টা করেন। প্রাসাদের একটি অংশ এমতাজ মহল। এটা এত বিশাল ছিল যে এতে তিনজন ইউরোপীয় ‘নরপতি’ থাকতে পারতেন বলে অনেকের ধারণা।১৩
কথিত আছে যে সিরাজদ্দৌল্লা যখন প্রাসাদটি তৈরি করছিলেন তখন একদিন নবাব আলিবর্দি সপারিষদ এটি দেখতে আসেন। তিনি যখন বিভিন্ন প্রকোষ্ঠ ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন তখন সিরাজ তাঁকে একটি প্রকোষ্ঠে বন্ধ করে রাখেন এবং নবাবকে জানান যে তিনি মুক্তি পেতে পারেন যদি হীরাঝিল প্রাসাদের নির্মাণ সম্পূর্ণ করতে ও তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনি কিছু আয়ের ব্যবস্থা করে দেন। বৃদ্ধ নবাব বরাবরই সিরাজকে আস্কারা দিয়ে এসেছেন, এবারও তাকে বিমুখ করলেন না। তিনি এ-বাবদ সিরাজকে হীরাঝিলের কাছেই একটি বাজার বা গঞ্জ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিলেন। গঞ্জ থেকে বার্ষিক আয় হত ৫ লক্ষ টাকার ওপর। সিরাজের নাম মনসুর-উল-মুলক থেকে এ গঞ্জের নাম হয় মনসুরগঞ্জ। হীরাঝিলের প্রাসাদকেও অনেকে মনসুরগঞ্জের প্রাসাদ বলে উল্লেখ করে থাকেন।১৪
হীরাঝিলের প্রাসাদ তৈরি হওয়ার পর সিরাজদ্দৌল্লা সেখানেই বাস করতে থাকেন। নবাব হওয়ার পরেও তিনি কেল্লায় না থেকে হীরাঝিল থেকেই রাজকার্য চালাতেন। এই প্রাসাদের সঙ্গে বহু স্মৃতি বিজড়িত। এখানেই তিনি বিখ্যাত সুন্দরী ও নর্তকী ফৈজিকে এনে আমোদপ্রমোদে মত্ত হন। পরে ফৈজির বিশ্বাসঘাতকতায় নিদারুণ আঘাত পেয়ে তাঁকে প্রাসাদের একটি কক্ষে বন্ধ করে রাখেন, সেখানে তাঁর মর্মন্তুদ মৃত্যু হয়। আবার এই প্রাসাদেই সিরাজ তাঁর প্রিয়তমা পত্নী লুৎফুন্নেসার সঙ্গে বাস করতেন। এখান থেকেই তিনি পলাশি অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন আবার পলাশিতে পর্যুদস্ত হয়ে এখানেই ফিরে এসে লুৎফুন্নেসা ও শিশুকন্যাকে নিয়ে রাত্রের অন্ধকারে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করেন। সিরাজের পালানোর খর পেয়ে মীরজাফর হীরাঝিলের প্রাসাদ দখল করেন। এদিকে ক্লাইভ এসে মোরাদবাগে আস্তানা নেন। তারপর হীরাঝিল বা মনসুরগঞ্জের প্রাসাদেই মীরজাফরের রাজ্যাভিষেক হয়। প্রাসাদের বিশাল হলে ক্লাইভ মীরজাফরের হাত ধরে এনে মুর্শিদাবাদের তখ্ত মোবারকে বসালেন। মসনদে বসিয়ে ক্লাইভ তাঁকে এক পাত্র মোহর নজরানা দিলেন। তারপর দরবারের অমাত্য ও অভিজাতবর্গ নতুন নবাবকে নজরানা দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন।
হীরাঝিল প্রাসাদের ধনাগারে সিরাজদ্দৌল্লার কী পরিমাণ ধনরত্ন সঞ্চিত ছিল তার একটা ধারণা করা যেতে পারে মীরজাফর, ক্লাইভ প্রমুখ যখন সেই ধনাগার লুণ্ঠন করেন, তা থেকে। লুণ্ঠনের সময় মীরজাফর, ক্লাইভ ছাড়াও ওয়ালস, ওয়াটস, লাশিংটন, দেওয়ান রামচাঁদ এবং মুন্সি নবকৃষ্ণ প্রভৃতি উপস্থিত ছিলেন। জানা যায়, সিরাজের এই কোষাগারে ১ কোটি ৭৬ লক্ষ রৌপ্য মুদ্রা, ৩২ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা, দুই সিন্দুক অমুদ্রিত স্বর্ণপিণ্ড, ৪ বাক্স অলঙ্কারের ব্যবহারোপযোগী হিরে, জহরত ও ২ বাক্স অখচিত চুনী, পান্না প্রভৃতি দামি পাথর ছিল। এ অনুমান হয়তো অত্যুক্তি কিন্তু কিছুটা যে সত্য সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এ ছাড়াও কেউ কেউ বলেন যে হীরাঝিল প্রাসাদের অন্তঃপুরে আরেকটি লুকোনো ধনাগার ছিল এবং তাতে ৮ কোটি টাকার মতো ধনরত্ন সঞ্চিত ছিল। এর খবর ইংরেজরা পায়নি। এই ধন মীরজাফর, তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারী আমির বেগ খান, রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। এটাও নেহাৎ আজগুবি গল্প নয়। কারণ যে রামচাঁদ পলাশি যুদ্ধের সময় মাসিক ৬০ টাকা বেতনে কাজ করতেন, দশ বছর পরে তিনি মারা যাওয়ার সময় তাঁর নগদ ও হুণ্ডিতে ৭২ লক্ষ টাকা, ৪০০টি বড় বড় সোনার ও রুপোর কলসি থাকার উল্লেখ দেখা যায়। তার মধ্যে ৮০টি সোনার, বাকি রুপোর। তা ছাড়াও তাঁর ১৮ লক্ষ টাকার জমিদারি ও ২০ লক্ষ টাকার জহরতও ছিল। নবকৃষ্ণ সে সময় মাসিক ৬০ টাকা বেতনে চাকরি করতেন কিন্তু তিনি নাকি তাঁর মায়ের শ্রাদ্ধে ৯ লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন। মীরজাফরের স্ত্রী মুন্নি বেগমও খুব সম্ভবত এই লুঠের টাকাতেই অগাধ সম্পদের মালিক হন। তাঁর যাবতীয় হিরে, জহরত এই লুণ্ঠন থেকেই পাওয়া।১৫ নবাব হয়ে মীরজাফর প্রথমে হীরাঝিল প্রাসাদেই থাকতেন। কিছুদিন পর তিনি ভাগীরথীর পূর্ব তীরে কেল্লার মধ্যে আলিবর্দির ভবনে চলে আসেন।
ইমামবারা-মদিনা
মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত স্থাপত্য ইমামবারা নির্মাণ করেছিলেন সিরাজদ্দৌল্লা। মুর্শিদাবাদ প্রাসাদের কাছেই উত্তরদিকে সিরাজ ইমামবারার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কথিত আছে যে তিনি নিজের মাথায়/হাতে করে ইট, পাথর বয়ে এনে ইমামবারার কাজ শুরু করেন। কারও কারও মতে নির্মাণকার্যে শুধু মুসলমান কারিগর ও শ্রমিকদের নিয়োগ করা হয়েছিল, হিন্দুদের নয়। ইমামবারার মাঝখানে ‘মদিনা’। মদিনার জন্য ৬ ফুটের মতো জমি খুঁড়ে তাতে মক্কা (কারও কারও মতে কারবালা) থেকে আনা মাটি দিয়ে ভর্তি করা হয়। তার ওপরে ছোট চতুষ্কোণ একটি ভবন তৈরি করা হয়। তাতে একটি গম্বুজ ও চারটি ছোট মিনার। মহরমের সময় সারা দিন রাতই মদিনাতে কোরান পাঠ করা হত। উত্তর ও দক্ষিণের ঘরগুলো গুদাম ঘর ও কর্মশালা হিসেবে ব্যবহৃত হত। মহরমের সময় কয়েকশো লোক রাত্রে ইমামবারা ও মদিনাতে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার কাজে ব্যস্ত থাকত। ওই সময় প্রত্যেকটি কক্ষেই ঝাড়লণ্ঠন, দেওয়াল বাতি প্রভৃতি জ্বালানো হত, এবং তাতে এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হত। সিরাজদ্দৌল্লা বহুমূল্য বস্ত্রাদি দিয়ে ইমামবারা ও মদিনা সাজিয়েছিলেন। পরে নবাব মীরকাসিম নগদ টাকার জন্য সব বিক্রি করে দেন। সিরাজের সাধের ইমামবারাটি ১৮৪২ সালে বাজি পোড়ানোর সময় পুড়ে যায়। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও ১৮৪৬ সালে আরেকটি অগ্নিকাণ্ডে একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। রক্ষা পায় শুধু মদিনা।১৬
