অনেকে মনে করেন যে কাটরার মসজিদ ঢাকায় তৈরি মুর্শিদকুলির মসজিদের, যা ‘করতলব খানের মসজিদ’ হিসেবে পরিচিত, অনুকরণ।৩ আবার কেউ কেউ বলেন যে এটি মক্কার মসজিদের অনুকরণে তৈরি।৪ আবার মসজিদের ভেতরের বৃহৎ কক্ষের দেওয়ালে তির্যকভাবে তৈরি যে সব ধনুকাকৃতি খিলান (arch), এই শৈলী দক্ষিণ ভারতীয় বলেও কেউ কেউ মনে করেন। তবে এটা হয়তো ঠিক নয় কারণ এই বিশেষ শৈলী মুঘল যুগের বাংলায় খুবই প্রচলিত ছিল।৫
কাটরা মসজিদের সঙ্গে জাহানকোষা নামক কামানের নাম যুক্ত হয়ে আছে। কাটরার পূর্বদিকে একটি অশ্বত্থ গাছের দুটি কাণ্ডের মাঝখানে এই কামান রক্ষিত বলে বোধহয়। এখানেই মুর্শিদকুলির কামানগুলিও রাখা হয় বলে জানা যায়। সে জন্য এ জায়গাটিকে আজও সাধারণ লোকেরা তোপখানা বলে। জাহানকোষা কামানটি লম্বায় প্রায় ১২ হাত, বেড় তিন হাতেরও বেশি। এর মুখের বেড়টি ১ হাতের ওপর। আগুন লাগার ফুটোটির ব্যাস দেড় ইঞ্চি। কামানটি মুঘল সম্রাট শাজাহানের রাজত্বকালে ইসলাম খাঁর সুবাদারির সময় জাহাঙ্গিরনগরের (ঢাকা) দারোগা শের মহম্মদের নির্দেশে ও হরবল্লভ দাসের তত্ত্বাবধানে জনার্দন কর্মকার নামক শিল্পী নির্মাণ করেন। এটির ওজন ২১২ মণ, এতে বারুদ লাগে ২৮ কিলো।৬
মুবারক মঞ্জিল
মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন খান বাংলার নবাব হন। তিনি ছিলেন দক্ষ কিন্তু আয়েসি ও শৌখিন লোক। শহর মুর্শিদাবাদের রাজসিক বোলবোলাও তাঁর আমলেই বাড়ে। নিত্যনতুন প্রাসাদ নির্মাণ করা তাঁর হবি ছিল। কুচ করে যেখানে তিনি আসতেন, সেখানে মহল তৈরি করতেন, নাম দেওয়া হত মুবারক মঞ্জিল। মুর্শিদকুলির তৈরি ‘চল্লিশ স্তম্ভের প্রাসাদ’ বা চেহেল সুতুনে তিনি সন্তুষ্ট থাকতে নারাজ ছিলেন। ঘরগুলো বাড়িয়ে তিনি এই প্রাসাদের রদবদল করেন। সরকারি নানা বিভাগের জন্য বাড়িঘর তৈরি হয়— দিওয়ানখানা, খিলাতখানা, ফরমান বাড়ি, খালসা কাছারি, আরও কত কী! শুধু তাই নয়, মুর্শিদকুলির আমলের রাজস্ববিভাগের নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী উচ্চপদস্থ কর্মচারী নাজির আহমেদ মুর্শিদাবাদের অদূরে ভাগীরথীর তীরে দাহাপাড়াতে যে মসজিদ ও উদ্যান নির্মাণ শুরু করেছিলেন, সুজাউদ্দিন তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলাবার পর অসমাপ্ত মসজিদ ও উদ্যানের কাজ সম্পূর্ণ করেন। সেখানেও তিনি প্রাসাদ, জলাশয় ইত্যাদি নির্মাণ করেন এবং তার নাম দেন ফর্হাবাগ বা ফররাজবাগ (আনন্দ-উদ্যান)। এখানে তিনি সারা বছর পিকনিক ও নানা রকমের আনন্দ উৎসব করতেন আর বছরে একবার তাঁর দরবারের উচ্চপদস্থ ও শিক্ষিত কর্মচারীদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভোজসভার আয়োজন করতেন।৭
মোতিঝিল
মোতিঝিলের বিখ্যাত প্রাসাদের নির্মাতা নবাব আলিবর্দি খানের ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা নওয়াজিস মহম্মদ খান ওরফে শহমত জঙ্গ, আলিবর্দির দুহিতা ঘসেটি বেগমের স্বামী। মোতিঝিল অর্থাৎ Lake of Pearls— মুক্তোর ঝিল। মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুরের প্রাসাদের দেড় মাইল দক্ষিণ পূর্বে এই সুন্দর জায়গাটির অবস্থান দেখে এবং অশ্বপদাকৃতি ঝিল এর তিনদিক ঘিরে থাকায় নওয়াজিস মহম্মদ এখানে তাঁর নতুন প্রাসাদ নির্মাণ করেন। তিনি ঢাকার শাসনকর্তা বা ছোট নবাব পদে নিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু আলিবর্দি খান যখন যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকতেন তখন মুর্শিদাবাদ রক্ষা করার ভার তাঁর বেগম ও নওয়াজিসের ওপরই থাকত। তাই তিনি বেশির ভাগ সময়েই মুর্শিদাবাদে থাকতেন। তাঁর বিশ্বস্ত সহকারী হোসেন কুলি খানের ওপর ঢাকার শাসনভার ন্যস্ত থাকত। নওয়াজিস অত্যন্ত বিলাসী ও আমোদপ্রিয় লোক ছিলেন। মুর্শিদাবাদের মধ্যে নিজের বাসভবনে সব সময় থাকতে তাঁর ভাল লাগত না। তাই ১৭৪৩ সালে তিনি মোতিঝিলের প্রাসাদ নির্মাণ করেন।৮ পরে প্রাসাদের পশ্চিম দিকে তোরণদ্বার নির্মাণ করে তাকে সুরক্ষিত করেন। তারই কাছে ১৭৫০/৫১ সালে একটি মসজিদ, মাদ্রাসা ও অতিথিশালাও নির্মিত হয়। মসজিদ ও অতিথিশালার জন্য নওয়াজিস প্রচুর অর্থব্যয় করতেন।৯
বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের বহু ভগ্নস্তূপ থেকে মার্বেল ও অন্যান্য জিনিসপত্র এনে মোতিঝিলের প্রাসাদ তৈরি করা হয়। প্রাসাদটি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত, ভাগগুলি (চত্বর) পরস্পরের অল্প ব্যবধানে। প্রত্যেকটি ভাগ দুটি বৃহৎ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। প্রাচীরগুলি প্রত্যেক দিকেই ঝিলের জল স্পর্শ করত। নওয়াজিস মোতিঝিলের প্রাসাদেই বেশির ভাগ সময় কাটাতেন। গান, বাজনা, নানা বিলাসবহুল প্রমোদ তাঁর খুব প্রিয় ছিল। নানা নর্তকী ও বাইজি এনে এখানে তিনি মজলিস বসাতেন এবং আত্মীয়পরিজন নিয়ে এখানে থাকতেই তিনি ভালবাসতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী ঘসেটি বেগম সমস্ত ধনরত্ন নিয়ে মোতিঝিলেই বাস করতে থাকেন। সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হয়ে ঘসেটি বেগমকে বিতাড়িত করে মোতিঝিল দখল করেন এবং সব ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন।১০
মোতিঝিল প্রাসাদের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় ঘটনা জড়িয়ে আছে।১১ ১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌল্লা মোতিঝিল থেকেই পলাশি অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন বলে যে অভিমত, তা সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ তখন তিনি নিজের প্রাসাদ হীরাঝিলেই থাকতেন। ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ ইংরেজ কোম্পানিকে বাংলার দেওয়ানি হস্তান্তর করার জন্য নবাবের সঙ্গে আলোচনা করতে এসে মোতিঝিলে ছ’দিন কাটিয়েছিলেন। আবার কোম্পানি দেওয়ানি পাওয়ার পর ১৭৬৬ সালের এপ্রিল মাসে ক্লাইভ এখানে এসেছিলেন এবং এ প্রাসাদেই কোম্পানি প্রথম পুণ্যাহ করে। এ উৎসবে নবাব নজমদৌল্লা যথোচিত পোশাক পরিচ্ছদ পরে মসনদে বসেছিলেন, পাশে দেওয়ানের (কোম্পানির) প্রতিনিধি রূপে ক্লাইভ। উপস্থিত ছিলেন জগৎশেঠ, রেজা খান ও মুর্শিদাবাদের অমাত্য ও অভিজাতবর্গ। ওয়ারেন হেস্টিংস যখন নবাব নাজিমের দরবারে কোম্পানির রাজনৈতিক এজেন্ট ছিলেন (১৭৭১-৭৩), তখন তিনি মোতিঝিলের প্রাসাদেই থাকতেন। মোতিঝিলে শেষ পুণ্যাহ হয় ১৭৭২ সালে। তারপরেই রাজস্ব বিভাগ কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। মোতিঝিল কোম্পানি বাগ নামেও পরিচিত কারণ এটা বেশ কিছুদিন কোম্পানির দখলে ছিল। ১৮৭৬ সালে এটা আবার নবাবকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।১২
