রিয়াজ-উস-সলাতিনের লেখক গোলাম হোসেন সলিম ইমামবারা দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন:১৭
Its praise is beyond description; its equal is not to be found in the whole of Hindustan. Although at present one-tenth of it does not exist, yet a remnant of it is a fair specimen of the original edifice.
মুর্শিদাবাদের বর্তমান ইমামবারাটি ১৮৪৮ সালে তখনকার নিজামতের দেওয়ান সৈয়দ সাদিক আলি খানের তত্ত্বাবধানে তৈরি করা হয়। এটি আগের ইমামবারার সামান্য উত্তর দিকে। পুরনো মদিনা যথাস্থানেই রাখা হয়। নতুন ইমামবারাতে একটি নতুন মদিনা তৈরি করা হয়। নতুন ইমামবারা তৈরি করতে ৬ লক্ষ টাকার বেশি খরচ হয়। এটি লম্বায় ৬৮০ ফুট, প্রস্থে নানা জায়গায় বিভিন্ন মাপের হলেও মাঝখানে ৩০০ ফুট। এটি তৈরি করতে ১১ মাস মাত্র সময় লেগেছিল। সাদিক আলি খান পেশায় ইঞ্জিনিয়ার না হলেও পুরো নির্মাণ কার্যের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধান করেছিলেন। সব কারিগর ও শ্রমিকদের মজুরি ছাড়াও খাবার দেওয়া হত যাতে তারা দিনরাত কাজ করতে পারে। ইমামবারা তৈরি হওয়ার পর সব কর্মীকেই শাল, দোশালা প্রভৃতি পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়। ফলে একেক সময় মুর্শিদাবাদের অলিতে গলিতে এসব বহুমূল্য পোষাক পরা লোকদের খুবই দেখা যেত।১৮
খোশবাগ
ভাগীরথীর পশ্চিমতীরে লালবাগের কাছে দক্ষিণ দিকে যে উদ্যান বাটিকা তার নাম খোশবাগ অর্থাৎ সুখস্বর্গ (garden of happiness)। এই উদ্যান আসলে একটি সমাধি ক্ষেত্র। এই সমাধিক্ষেত্রে আলিবর্দি, সিরাজদ্দৌল্লা, লুৎফুন্নেসা বেগম এবং সম্ভবত আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসার সমাধিও অবস্থিত। নবাব আলিবর্দি তাঁর জননীকে সমাধিস্থ করার জন্য এই উদ্যান তৈরি করেন। খোশবাগের সমাধিভবনে প্রধানত দুটি চত্বর— প্রথমটি প্রবেশ দ্বার থেকে শুরু, দ্বিতীয়টি প্রথমটির পশ্চিম দিকে। এই দ্বিতীয় চত্বরে প্রবেশ করার জন্য আরও একটি প্রবেশদ্বার। প্রাচীর বেষ্টিত এই সমাধি স্থানটির উত্তর দিকে একটি উঁচু স্থানে ১৭টি সমাধি আছে। মূল সমাধি গৃহের মধ্যস্থলে সাদা ও কালো পাথরের তৈরি যে সমাধি, সেটি নবাব আলিবর্দির। তার পূর্বদিকে সিরাজদ্দৌল্লার সমাধি। পলাশির যুদ্ধে পরাভূত সিরাজকে হত্যা করে তার ছিন্নভিন্ন দেহ হাতির পিঠে মুর্শিদাবাদ প্রদক্ষিণ করাবার পর এখানে এনে সমাধিস্থ করা হয়। সিরাজের সমাধির দক্ষিণে তাঁর পায়ের নীচে তাঁর প্রিয়তমা বেগম লুৎফুন্নেসার সমাধি।
আলিবর্দি তাঁর জননীর মৃত্যুর পর এই সমাধিস্থলে তাঁকে সমাধিস্থ করে এই উদ্যানবাটিকার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ভাণ্ডারদহ ও নবাবগঞ্জ নামক দুটি গ্রামের থেকে প্রাপ্য রাজস্ব বরাদ্দ করেন। এর পরিমাণ ছিল মাসিক ৩০৫ টাকা। সিরাজদ্দৌল্লার মৃত্যুর পর অন্যান্য বেগমদের সঙ্গে লুৎফুন্নেসাকেও ঢাকায় নির্বাসিত করা হয়। সেখানে ৭ বছর কাটাবার পর অনেকটা ক্লাইভের বদান্যতায় তাঁকে মুর্শিদাবাদে ফেরত পাঠানো হয় এবং কিছুদিনের মধ্যে খোশবাগের সমাধি ক্ষেত্র তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়। এর জন্য তিনি মাসিক ৩০৫ টাকা করে পেতেন। লুৎফুন্নেসার জীবিতাবস্থাতেই তাঁর কন্যা উম্মত জহুরার মৃত্যু হয়। সেজন্য লুৎফুন্নেসার মৃত্যুর পর উম্মত জহুরার কন্যা খোশবাগ সমাধিক্ষেত্রের তত্ত্বাবধান করার দায়িত্ব তাঁদের ওপর দেওয়ার জন্য ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে আর্জি পাঠান। হেস্টিংস তা মঞ্জুর করেন। তাঁদের মৃত্যুর পর সেই বংশের লোকরা খোশবাগের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পায়।১৯
ফর্হাবাগ, রোশনিবাগ
নবাব সুজাউদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন, বিলাসপ্রিয় ও সৌন্দর্যের ভক্ত। তাই মুর্শিদকুলির তৈরি প্রাসাদ চেহেল সেতুন বা অন্যান্য স্থাপত্যে তিনি সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। নিজের পছন্দমতো বহু স্থাপত্য, উদ্যান ইত্যাদি তৈরি করেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি বোধ হয় ফর্হাবাগ বা সুখকানন। এটি মুর্শিদাবাদের দাহাপাড়াতেই, ভাগীরথীর পশ্চিম তীরে, রোশনিবাগের কিছুটা উত্তরে। এই বাগানটি ও তাতে একটি মসজিদ প্রথম তৈরি করতে শুরু করেন মুর্শিদকুলির নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী এক কর্মচারী—নাজির আহমেদ। সুজাউদ্দিন নবাব হয়ে নাজিরের মৃত্যুদণ্ড দেন কিন্তু ওই বাগান ও মসজিদের নির্মাণ কাজ সুসম্পন্ন করেন। ফর্হাবাগের সৌন্দর্যকরণে সুজা কোনওরকম কার্পণ্য করেননি। মসজিদ ছাড়াও এখানে নানা সুন্দর প্রমোদ অট্টালিকাও তিনি তৈরি করেন। বাগানে নানারকমের ফুল ও ফলের গাছ লাগানো হয়। অসংখ্য ফোয়ারা এ বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।২০
ফর্হাবাগের কাছেই রোশনিবাগ বা আলোর উদ্যান (garden of light)। এটি নবাব সুজাউদ্দিনের সমাধি। রোশনিবাগ উদ্যানের সামনে নবাবরা আলোকোৎসব করতেন বলে এর নাম রোশনিবাগ হয়েছিল বলে মনে করা হয়। রোশনিবাগের বর্তমান সমাধিভবনের উত্তরদিকে এর প্রবেশদ্বার। সেটি অতিক্রম করে কয়েক পা গেলে সুজাউদ্দিনের সমাধি। প্রায় ৩ হাত উঁচু একটি বিশাল ভিতের ওপর সমাধিটি। পুরনো সমাধিটি ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন সমাধিটি তৈরি হয়। সমাধিভবনটির দৈর্ঘ্য ১৪ হাত, প্রস্থ ১৩ হাত। মুর্শিদাবাদে এত বড় সমাধি আর একটিও নেই।২১
