৩৬. তারিখ-ই-মনসুরী, quoted in Gautam Bhadra, ‘Social Groups and Relations’, p. 335.
৩৭. Edward C. Dimmock, K, Jr., ‘Hinduism and Islam in Medieval Bengal’, in Rachel van M. Baumer, ed., Aspects of Bengali History and Society, p. 2.
৩৮. D. C. Sen, Bengali Language, pp. 396-97; ভারতচন্দ্র, সত্যপীরের কথা।
৩৯. রামেশ্বর ভট্টাচার্য্য, সত্যনারায়ণ, এন. এন. গুপ্ত সম্পাদিত, পৃ. ১১।
৪০. আহমদ শরীফ, মধ্যযুগের সাহিত্যে সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ, পৃ. ৪২৩।
৪১. ভারতচন্দ্রের গ্রন্থাবলী, পৃ. ৪০২।
০৯. স্থাপত্য
বাংলার স্থাপত্যশিল্পের ইতিহাসে নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের স্থাপত্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মুর্শিদকুলি যখন ঢাকা থেকে মখসুদাবাদে তাঁর দেওয়ানি কার্যালয় স্থানান্তরিত করেন ও মখসুদাবাদের নামকরণ করেন মুর্শিদাবাদ, তখনও সেটা ছিল প্রায় অজ গ্রাম। কিন্তু বিভিন্ন শাসন দপ্তরের প্রয়োজন অনুযায়ী ঘরবাড়ি, অফিস কাছারি নির্মাণ শুরু হয়ে যায় প্রথম থেকেই। তারপর মুর্শিদাবাদ যখন বাংলার রাজধানী হল তখন এসব নির্মাণ কার্য আরও অনেকগুণ বেড়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, মুর্শিদাবাদের সব নবাবই নানারকমের ইমারত, প্রাসাদ, মসজিদ তৈরি করতে ভালবাসতেন এবং এটা তাদের প্রায় ‘হবি’তে পরিণত হয়েছিল। তাই মুর্শিদকুলি থেকে আরম্ভ করে সুজাউদ্দিন, আলিবর্দি, এমন কী সিরাজদ্দৌল্লাকে নানারকমের স্থাপত্যকর্ম নির্মাণ করতে দেখা যায়। শুধু তাই নয়, এই ধারা মীরজাফর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল যার প্রমাণ মীরজাফরের পত্নী মুন্নি বেগমের তৈরি স্থাপত্যগুলি। পরের নবাবদের মধ্যেও কেউ কেউ এটা বজায় রেখেছিলেন। এ সব নির্মাণ কার্যে নবাবদের মানসিকতাই শুধু সাহায্য করেনি, তাঁদের যে অফুরন্ত ধনসম্পদ ছিল তা এসব কাজের খুবই সহায়ক হয়েছিল। মুর্শিদাবাদের নবাবরা শুধু নতুন নতুন ভবন ও উদ্যান তৈরি করে মুর্শিদাবাদকে সুন্দর করার চেষ্টা করেননি। নিজামতের কর্মচারী, শ্রেষ্ঠী ও অমাত্যবর্গও প্রাসাদ, ভবন, বাগানবাড়ি, মন্দির, মসজিদ, প্রভৃতি নির্মাণ করে মুর্শিদাবাদের সৌন্দর্যবৃদ্ধি করার চেষ্টা করেছেন। তাই এক বিশিষ্ট ঐতিহাসিকের মতে মুর্শিদাবাদ কখনও কখনও ভারতের রাজধানী দিল্লিকেও হার মানাত।১ কিন্তু পরিতাপের বিষয়, নবাবি আমলের স্থাপত্যগুলি আজ বেশিরভাগই প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত।
মুঘল যুগে বাদশাহি স্থাপত্যের শিল্পশৈলীর সর্বোৎকৃষ্ট নির্দশন দেখা যায় ঢাকায়। কিন্তু এই শিল্পরীতি যানবাহন ও যাতায়াতের অসুবিধের জন্য, এবং স্থাপত্যকর্মীর অভাবে বাংলার গ্রামাঞ্চলে বিস্তার লাভ করেনি। তাই বাংলার বেশির ভাগ অঞ্চলেই প্রাক-মুঘল যুগের স্থাপত্যশৈলীই অনুসৃত হয়। অবশ্য পরবর্তীকালে কিছু কিছু অঞ্চলে, যেখানে মুঘল শাসন বেশ কিছুটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানকার উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা মুঘল শৈলী অনুসরণ করে প্রাসাদ ও ভবন নির্মাণ করেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে মুঘল শৈলীর সঙ্গে স্থানীয় শৈলী ও শিল্পরীতির সংমিশ্রণও হয়েছে। কিছু কিছু স্থাপত্যে প্রাক-মুঘল যুগের ইটের দেওয়ালে খচিত শৈলীর নিদর্শনের পাশাপাশি মুঘল শৈলীর নিদর্শন— যেমন গম্বুজও, দেখা যায়। মুর্শিদাবাদের স্থাপত্যশিল্পে এই সংমিশ্রণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এখানে আমরা নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের বিশিষ্ট স্থাপত্যগুলির পর্যালোচনা করব।
কাটরা মসজিদ
মুর্শিদাবাদের স্থাপত্যকর্মের অন্যতম নিদর্শন কাটরা মসজিদ। নবাব মুর্শিদকুলি খান ১৭২৩ সালে এটি নির্মাণ করেন। কথিত আছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং শরীর ভেঙে গেছে বুঝতে পেরে তিনি নিজের সমাধি নির্মাণ করে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তাতে একটি মসজিদ ও কাটরা বা বাজারও থাকবে। এই কাটরা বা বাজার থেকেই ‘কাটরা মসজিদ’ নাম। সমাধি, মসজিদ ও কাটরা স্থাপনের জন্য শহরের পূর্বদিকে খাস তালুকের কাছের একটি স্থান বেছে নেওয়া হয়। মোরাদ ফরাস নামে একজন সাধারণ অথচ বিশ্বস্ত কর্মচারী এই কাজের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত হন। প্রচলিত ভাষ্য অনুযায়ী মোরাদ কাছাকাছি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে সে সব উপকরণ দিয়ে সমাধি ভবন তৈরি করেন। সলিমুল্লার তারিখ-ই-বংগালা গ্রন্থে হিন্দু মন্দির ভাঙার কথা থাকলেও গোলাম হোসেন সলিমের রিয়াজ-উস-সলাতিনে কিন্তু এটা নেই। মন্দির ভেঙে সেসব জিনিস দিয়ে কাটরা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ মুর্শিদকুলি মুর্শিদাবাদের কাছাকাছি বিখ্যাত রাধামাধবের হিন্দু মন্দির ও অন্য কয়েকটি মন্দিরের খরচপত্র ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিষ্কর জমি দান করেছিলেন। এ ছাড়া কাটরা মসজিদের নির্মাণে যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল সেগুলি সব একই রকমের। বিভিন্ন মন্দির ভেঙে এসব উপকরণ সংগ্রহ করা হলে তাতে এরকম মিল বা সঙ্গতি থাকত না।২
কাটরা মসজিদ একটি চতুর্ভুজাকৃতি উঁচু প্রাঙ্গণে অবস্থিত। মসজিদের দৈর্ঘ্য ১৪০ ফুট, প্রস্থ ২৫ ফুট আর এতে ৫টি গম্বুজ ছিল। মুর্শিদকুলির নির্দেশমতো মসজিদের দরজায় সিঁড়ির নীচে একটি ছোট ঘর তৈরি করা হয়। এখানেই মুর্শিদকুলিকে সমাধিস্থ করা হয়। মসজিদের দরজায় যেতে গেলে চৌদ্দটি বড় বড় সিঁড়ি বেয়ে যেতে হয়। দরজা পার হয়ে প্রায় ১২০ ফুট দূরে মসজিদ। গম্বুজগুলি ধাতু দিয়ে তৈরি। মসজিদের দরজায় খুব বড় কালো পাথরের তৈরি চৌকাঠ। ভেতরের দিকে একটি বৃহৎ কক্ষ। তার দেওয়ালের চারদিকে ধনুকাকৃতি খিলান (arch) তির্যকভাবে অবস্থিত। মসজিদ এবং চত্বরের চতুর্দিকে দোতলায় অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কক্ষ যেখানে মুর্শিদকুলির সময় সাতশো’ ‘করি’ বা কোরান পাঠক কোরান পাঠ করত। মসজিদের সঙ্গে মিনার, চৌবাচ্চা এবং ইঁদারাও তৈরি করা হয়।
