এ প্রসঙ্গে নবাব আলিবর্দির সময়, ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ পর্যন্ত, প্রায় প্রতি বছর যে মারাঠা আক্রমণ হয়েছে, মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার অর্থনীতিতে তার কতটা প্রভাব পড়েছিল তা আলোচনা করা প্রয়োজন। আমরা আগেই বলেছি, মারাঠা আক্রমণের ফলে বাংলার অর্থনীতি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে এই আক্রমণের ফলে বাংলার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল এমন বক্তব্য সঠিক বলে মনে হয় না। অর্থনীতি যেটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা সাময়িক এবং কয়েকটি জায়গায় সীমাবদ্ধ। এর কোনও দীর্ঘকালীন প্রভাব মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার অর্থনীতিতে পড়েনি। মারাঠারা বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়, মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট পথেই বাংলায় লুঠতরাজ করতে আসত। ওই সব অঞ্চলের কৃষক-তাঁতি-কারিগর প্রমুখ বর্ষার আগে, মারাঠারা চলে গেলে, নিজেদের কাজকর্ম শুরু করে দিত আবার শীতকালে, মারাঠারা আসার আগে, তাদের ফসল/উৎপাদন সব গুছিয়ে নিয়ে অন্যত্র চলে যেত। মুর্শিদাবাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় মারাঠা আক্রমণের ভয়ে জগৎশেঠ ও অন্যান্য ব্যাঙ্কার-মহাজন-সওদাগররা কিছুদিন মুর্শিদাবাদ ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতেন এবং মারাঠাদের মুর্শিদাবাদ আক্রমণের সম্ভাবনা চলে গেলে আবার তাঁরা মুর্শিদাবাদে ফিরে আসতেন। মাঝে মাঝে তাঁদের অনুপস্থিতিতে বাজারে টাকার অভাব দেখা দিত কিন্তু সেটা একেবারেই সাময়িক। জগৎশেঠ এবং অন্যান্যরা মুর্শিদাবাদে ফিরে এলে ব্যবসা-বাণিজ্যে আবার রমরমা দেখা দিত, বাজারে টাকারও কোনও অভাব থাকত না। মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে মারাঠা আক্রমণের ফলে যে কোনও অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়নি তার প্রমাণ, এ সময়েও ওই অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা রেশম ও রেশমি কাপড় রপ্তানি হয়েছিল। যে অর্থনীতিতে ওই পরিমাণ পণ্য উৎপাদিত হতে পারে, তা মারাঠা আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়েছিল এ কথা বলা যায় না।২৫
নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের সাধারণ লোকের অবস্থা মোটামুটি ভালই ছিল মনে হয়। প্রথমে দেওয়ানি কার্যালয় ও পরে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ায়, এবং মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারে কাঁচা রেশম ও রেশমি কাপড়ের ব্যবসার জন্য ওই অঞ্চলে কাজকর্ম এবং আয়ের পথও বেশ সুগম হয়। তা ছাড়াও নবাবদের নানা স্থাপত্যকর্মের ফলে বহু লোকের কর্মসংস্থান হয়। আসলে মুর্শিদকুলি অভিজাতবর্গ, দেশি সওদাগর, বিদেশি বণিক, হিন্দু কর্মচারী ও জবরদস্ত জমিদারদের সামলে ও তাদের নিয়ে বাংলায় নিজামতের যে কাঠামোটি তৈরি করেন এবং পরে অন্য নবাবরা যেটা বজায় রেখেছিলেন তাতে সলিমুল্লা, গোলাম হোসেন প্রমুখ ঐতিহাসিকরা সুবে বাংলাকে ‘দার-উল-আমন’ বলতে দ্বিধা করেননি। আর এই ‘দার-উল-আমনে’র রাজধানী হিল মুর্শিদাবাদ। হয়তো সাধারণ লোকের কথা ভেবেই মুর্শিদকুলি বাংলা থেকে চাল রফতানি বন্ধ করে দেন এবং সে কারণেই সম্ভবত চালের দাম অনেক কমে যায় ও তাতে সাধারণ মানুষের খুব সুবিধা হয়। রিয়াজের লেখক গোলাম হোসেন বলেছেন এ সময় মুর্শিদাবাদে চালের দাম ছিল টাকায় ৫ থেকে ৬ মণ, যদিও সলিমুল্লা লিখেছেন, টাকায় ৪ মণ। সে অনুপাতে অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও ছিল সস্তা। ফলে, গোলাম হোসেন সলিম জানাচ্ছেন, তখন মাসে এক টাকা খরচ করলেই লোকে পোলাও, কালিয়া খেতে পারত। এটা হয়তো অত্যুক্তি, যদিও এ থেকে অনুমান করা যায় যে সাধারণ লোকের অবস্থা বেশ স্বচ্ছলই ছিল।২৬
নবাব সুজাউদ্দিনের সময়েও মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার আর্থিক অবস্থা বেশ উন্নতই ছিল। সিয়রের লেখক ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন খান সুজাউদ্দিনের শাসনকাল সম্বন্ধে লিখেছেন যে বাংলা তখন ‘came to enjoy so much prosperity as to exhibit everywhere an air of plenty and happiness’.২৭ ১৭৮৯ সালে ইংরেজ কোম্পানির রাজস্ববিভাগের কর্মচারী, জন শোর (John Shore), মন্তব্য করেছেন যে আলিবর্দির শাসনকালের শেষ কয়েকবছর বাদ দিয়ে মুর্শিদকুলি থেকে মীরকাশিমের রাজত্বকালের মধ্যে, একমাত্র সুজাউদ্দিনের সময়েই দেশের উন্নতিসাধন করাটা মুর্শিদাবাদের নিজামতের প্রধান লক্ষ্য ছিল।২৮ কবি নিহাল সিংহ এই সময় মুর্শিদাবাদে আসেন এবং সুজাউদ্দিনের রাজত্বকালে পৌরাণিক রাম রাজ্যের লক্ষণ দেখতে পান: ‘নাহি জোর অর জুলম্যাঁন, নাঁহি বাটমৈ বটপার, নাঁহি চোর চেটকবার।’ তাই সকল প্ৰজাই সুখী। দুঃখীর দেখা পাওয়াও ভার হয়ে ওঠে। ‘ইহবিধ রহৈ রেয়ত সুখী, দেখা কোউ নাঁহি দুঃখী’।২৯
নবাব আলিবর্দি খানের আমলে মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার অর্থনৈতিক অগ্রগতি কিছুটা ব্যাহত হয়েছিল সন্দেহ নেই তবে সেটা সাময়িক। ১৭৫১ সালে মারাঠাদের কাছ থেকে শান্তি কেনার পর আলিবর্দি সর্বশক্তি ও মনপ্রাণ দিয়ে রাজ্যের উন্নতিসাধনে উঠে পড়ে লাগেন। তিনি যে এ কাজে যথেষ্ট সফল হয়েছিলেন তার প্রমাণ তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে মুর্শিদাবাদ শহরের বিস্তৃতি ও শ্রীবৃদ্ধিতে দেখা যায়। মুজাফ্ফরনামার লেখক করম আলি লিখেছেন যে আলিবর্দির শাসনকালের শেষদিকে মুর্শিদাবাদ শহর প্রচুর বিস্তার লাভ করে— দৈর্ঘ্যে ২৪ মাইল, প্রস্থে ১৪ মাইল তখন শহরের আয়তন। তা ছাড়াও অনেক ধনী ও সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী, ব্যাঙ্কার শহরের প্রান্তে তাদের বাগানবাড়ি তৈরি করে।৩০ নগরায়ণের এই যে চিত্র, তা থেকে আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ও অগ্রগতির প্রমাণ পাওয়া যায়। পলাশির পর রবার্ট ক্লাইভ প্রথম মুর্শিদাবাদ দেখে বিস্ময়ে হতবাক। তিনি মন্তব্য করেছেন যে মুর্শিদাবাদ লন্ডনের মতোই বিরাট, প্রচুর লোকবসতি এবং লন্ডনের মতোই ধনী শহর। তফাত শুধু এই যে লন্ডনের চেয়ে মুর্শিদাবাদে অনেক বেশি ধনী লোক যাদের ধনসম্পদ লন্ডনের যে কোনও ধনী বাসিন্দার চাইতে অনেক অনেক বেশি।৩১
