অর্থনীতি
নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ উন্নত ছিল, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। সপ্তদশ শতকে, বিশেষ করে এই শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, বাংলা থেকে দিল্লি, আগ্রা ও উত্তর ভারতের অন্যত্র যে ধন নিষ্ক্রমণ হত, তা নবাবি আমলে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। মুর্শিদকুলি আসার আগে পর্যন্ত বাংলার সুবাদার ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, সবাই মুঘল বাদশাহি পরিবারের লোক বা মুঘল দরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলেই ওই পদে নিযুক্ত হতেন। সুবাদার শাহ সুজা (১৬৩৯-৬০) ছিলেন মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র। আরেক সুবাদার, শায়েস্তা খান (দুবার, ১৬৬৪-৭৮ এবং ১৬৭৯-৮৮) ছিলেন সম্রাট ঔরংজেবের পিতৃব্য এবং অন্য এক সুবাদার আজিম-উস-শান (১৬৯৭-১৭১২) ছিলেন ঔরংজেবের পৌত্র। অন্য সুবাদাররাও অনেকেই মুঘল দরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এঁরা, বিশেষ করে মুঘল পরিবারের সদস্যরা, বাংলা ছাড়তে চাইতেন না কারণ এখানে ধনসম্পদ আহরণের অফুরন্ত সুযোগ। তাই মুঘলনীতির ব্যতিক্রম করে তাঁরা তিন বছরের অনেক বেশি সময় বাংলায় সুবাদার হিসেবে থেকে গেছেন। এঁরা বাংলা থেকে যে ধনসম্পদ আহরণ করতেন তার সবটাই প্রায় বাংলার বাইরে দিল্লি, আগ্রা ও উত্তর ভারতে নিয়ে যেতেন। ফলে বাংলা থেকে এই ধন নিষ্ক্রমণের ধারা সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বেশ প্রকট হয়ে উঠেছিল। এই সব সুবাদার, মনসবদাররা কী পরিমাণ ধন আহরণ করে বাংলার বাইরে নিয়ে যেতেন তার একটা ধারণা করা যেতে পারে কয়েকজনের দৃষ্টান্ত থেকে। শায়েস্তা খান ১০ বছরে ৯ কোটি টাকা, খান জাহান বাহাদুর খান এক বছরে ২ কোটি এবং আজিম-উস-শান ৯ বছরে ৮ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন।১৮
নবাবি আমলে বাংলা, অবশ্যই মুর্শিদাবাদ থেকে, এই বিপুল ধন নিষ্ক্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এখন আর সুবাদাররা দিল্লি থেকে নিযুক্ত মনসবদার নন, মুর্শিদকুলি বাংলায় প্রায় স্বাধীন নিজামত প্রতিষ্ঠা করেছেন। দিল্লি থেকে বাংলায় মুঘল মনসবদার বা অন্য উচ্চপদস্থ কর্মচারী পাঠানও এখন বন্ধ হয়ে গেল। স্থানীয় বাসিন্দারাই এখন নিজামতের সব পদে নিযুক্ত হল। ফলে বাংলা থেকে ধন নিষ্ক্রমণের প্রশ্নই রইল না। নবাবরা বা উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীরা বাংলায় ধন আহরণ করা বন্ধ করে দিলেন ঠিক তা নয়। যা ধনসম্পদই তাঁরা আহরণ করে থাকুন না কেন, তা বাংলাতেই থেকে গেল, তাতে বাংলার ধনসম্পদই বৃদ্ধি পেল। ১৭৪০-এর দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত নবাবরা বাংলা থেকে প্রতি বছর ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার মতো রাজস্ব দিল্লিতে পাঠাতেন। তা ছাড়া বাংলার প্রায় সব নবাবই প্রচুর অর্থ ব্যয় করে মুর্শিদাবাদে নানা প্রাসাদ, মসজিদ, সমাধিভবন প্রভৃতি নির্মাণ করেন। এ সবকিছু করেও নবাবরা যে পরিমাণ ধনসম্পদ সঞ্চয় করেছিলেন, তা দেখে অবাক হতে হয়।
পলাশিতে নবাব সিরাজদ্দৌলাকে পরাভূত করে ইংরেজরা মুর্শিদাবাদের কোষাগারে গিয়ে নবাবের সঞ্চিত ধনসম্পদ দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। শুধুমাত্র সোনা-রুপো নিয়ে ওখানে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ ছিল ২ কোটি টাকা। ক্লাইভ লিখেছেন যে নবাবের কোষাগারে ঢুকে অবাক বিস্ময়ে তিনি দেখলেন, সোনা ও হিরে-জহরত দুধারে স্তূপীকৃত হয়ে আছে।১৯ আমরা আগেই বলেছি, তারিখ-ই-মনসুরীর লেখক জানিয়েছেন যে নবাবের হারেমে লুকোনো যে ধনসম্পদ ছিল, সোনা, রূপো, হিরে, জহরত মিলে তার মূল্য কম করে ৮ কোটি টাকা।২০ আর মুজাফ্ফরনামার লেখক করম আলির ভাষ্য অনুসারে, সিরাজদ্দৌলা ঘসেটি বেগমকে মোতিঝিল প্রাসাদ থেকে বিতাড়িত করে সেখান থেকে হীরে জহরত বাদ দিয়েই নগদ ৪ কোটি টাকা ও ৪০ লক্ষ মোহর বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ১ কোটি টাকা মূল্যের সোনা, রুপোর নানা বাসনপত্রও সিরাজ মোতিঝিল থেকে উদ্ধার করেছিলেন।২১ এসব তথ্যে হয়তো কিছুটা অত্যুক্তি আছে কিন্তু তা হলেও এ থেকে কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে।
নবাব, মনসবদার বা অন্যান্য অভিজাতবর্গ শুধু নয়, নবাবি আমলে ব্যাঙ্কার-মহাজন-সওদাগর প্রভৃতি শ্রেণি প্রচুর ধনসম্পদ আহরণ ও সঞ্চয় করেছিল। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত জগৎশেঠ পরিবার। সামান্য মহাজন থেকে তাঁরা ভারতবর্ষ তথা এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাঙ্কার হয়ে ওঠেন। তাঁদের বার্ষিক আয়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা, আর ব্যবসার মূলধনই ছিল কম করে ৭ কোটি টাকা, কারও কারও মতে ১৪ কোটি টাকা।২২ জগৎশেঠরা ছাড়াও মুর্শিদাবাদে তখন আরও দু’জন বণিকরাজা ছিলেন, উমিচাঁদ ও খোজা ওয়াজিদ। এঁদের সম্পদের বা সঞ্চিত অর্থের কোনও তথ্য পাওয়া যায় না, তবে তা যে বেশ ভাল পরিমাণের হবে সেটা অনুমান করা যায়। কারণ উমিচাঁদ সোরা, আফিং-এর প্রায় একচেটিয়া ব্যবসা করতেন। তা ছাড়াও ছিল তাঁর টাকা লেনদেনের ব্যবসা। খোজা ওয়াজিদ বিহারের অর্থনীতি প্রায় কব্জা করে নিয়েছিলেন, সোরা এবং আফিং-এর ব্যবসাও ছিল তাঁর কুক্ষিগত। এ ছাড়া তিনি সমুদ্রবাণিজ্যেও লিপ্ত ছিলেন, তাঁর কমপক্ষে ৬টি বাণিজ্যতরী ছিল। এ সব তথ্য থেকে অনুমান করা যায় যে মুর্শিদাবাদের বণিকরাজারা প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী ছিলেন।
বণিকরাজারা ছাড়াও মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে বহু ব্যাঙ্কার-মহাজন, সওদাগর এসে ভিড় জমিয়েছিল। নবাবি আমলে এখানকার কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্রের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল তুঙ্গে। এ সব পণ্যের চাহিদা শুধু ভারতবর্ষ ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে নয়, ইউরোপেও ছিল প্রচুর। ফলে শিল্পবাণিজ্যের তখন রমরমা। জৈন কবি নিহাল সিংহ লিখেছেন, বালুচরে কাঁসার হাট বসে, সেখানে অনেক রকম ভাল ভাল বাসন বিক্রি হয়। বহু ঘর তাঁতিরও বাস সেখানে, তারা নানারকমের কাপড় বোনে। কাশিমবাজার, সৈয়দাবাদ ও খাগড়ায় অনেক লোকের বাস, বিভিন্ন দেশের, জাতির ও ধর্মের। রেশমের ও রেশমি বস্ত্রের কারবার জমজমাট। দিল্লির সঙ্গেই যেন মুর্শিদাবাদ টেক্কা দেয়—‘জৈসা দিল্লিকা বাজার, তৈসা চৌক গুলজার’।২৩ বাজারে টাকার অঢেল আমদানি, ধারের কোনও অসুবিধেই নেই। বাজারে যে টাকার অভাব নেই, টাকার আমদানি যে বৃদ্ধি পেয়েছিল, তা ১৭৪০ সালের একটি ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি তাদের রফতানি পণ্য কেনার জন্য বাংলার টাকার বাজার থেকে প্রায়ই টাকা ধার করতে বাধ্য হত এবং তারা ধার করত প্রধানত জগৎশেঠদের কাছ থেকে। সুদের হার ছিল শতকরা ১২ টাকা। এ হার কমাবার জন্য কোম্পানিগুলি অনেক চেষ্টা করেছিল কিন্তু বিফল হয়। ১৭৪০ সালে ইংরেজরা মুর্শিদাবাদে জগৎশেঠদের কুঠিতে গিয়ে সুদের হার কমাবার জন্য আবার অনুনয় বিনয় করে। জগৎশেঠ সেটা মঞ্জুর করেন এবং পরের দিন থেকে সুদের হার শতকরা ১২ টাকা থেকে নেমে শতকরা ৯ টাকা হয়ে যায়। এটা টাকার বাজারে জগৎশেঠদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ সন্দেহ নেই। তবে সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে হয় তখন বোধ হয় বাজারে টাকার আমদানি ছিল প্রচুর, ধার সহজলভ্য। তাই হয়তো জগৎশেঠরা এক কথায় সুদের হার কমিয়ে দেন।২৪
