সংস্কৃতি ও হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক
নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদকে বহু জাতি, বিভিন্ন র্ধম ও বর্ণের মানুষের মিলনক্ষেত্র বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। মুর্শিদাবাদে প্রথম দেওয়ানি ও পরে রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে দেশবিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষ মুর্শিদাবাদে এসে ঠাঁই নেয়। আবার মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার কাঁচা রেশম ও রেশমিবস্ত্রের প্রধান উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের সওদাগর-ব্যাঙ্কার-মহাজন এসে ভিড় জমায় এখানে। এদের মধ্যে একদিকে যেমন ছিল হিন্দু-জৈন ব্যাঙ্কার-মহাজন-সওদাগর, অন্যদিকে তেমনই দেখা যায় তার সঙ্গে ছিল শিয়া মুসলমান সম্প্রদায়। এরকম একটি জায়গায় বহু জাতি, বহুবর্ণ ও বহু ধর্মাবলম্বীর সমাবেশ ইতিহাসে খুবই বিরল। এর জন্য অবশ্য মূলত মুর্শিদাবাদের নবাবদের উদারনীতিই অনেকটা দায়ী। সব ধর্ম ও জাতি সম্পর্কে সহনশীলতা ও উদারতা মুর্শিদাবাদের নবাবদের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। ফলে মুর্শিদাবাদে নবাবদের আমলে যে কৃষ্টি ও সংস্কৃতি দেখা যায়, তা যে কোনও শহরের পক্ষেই গর্বের বিষয়।
আসলে মুর্শিদকুলির সময় থেকে মুর্শিদাবাদের নবাবরা উদারতা ও সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করেন। হয়তো তাঁদের ধারণা ছিল এতেই রাষ্ট্রের মঙ্গল ও উন্নতি হবে। তাই নিজেরা শিয়া মুসলমান হয়েও সুন্নি মুসলমান, হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি তাঁরা কোনও বৈষম্যমূলক আচরণ করেননি। মুর্শিদকুলির সময় থেকেই হুগলি ও মুর্শিদাবাদ শিয়াদের বড় উপনিবেশ হয়ে ওঠে। বাংলায় জগৎশেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মানিকচাঁদ জৈন সম্প্রদায়ভুক্ত হয়েও মুর্শিদকুলির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরামর্শদাতা হয়ে ওঠেন। মূলত তাঁরই আকর্ষণে মানিকচাঁদ তাঁর সঙ্গে ঢাকা ছেড়ে মুর্শিদাবাদ চলে আসেন। পলাশির আগে পর্যন্ত এই জগৎশেঠ পরিবারই মুর্শিদাবাদ নিজামতের সবচেয়ে বড় সমর্থক ও হিতাকাঙক্ষী বলে পরিচিত ছিল। আবার মুসলমান হয়েও মুর্শিদকুলি শাসনবিভাগের প্রায় সর্বত্র, বিশেষ করে রাজস্ববিভাগে, হিন্দুদেরই নিয়োগ করেছিলেন। এর পেছনে হয়তো তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের স্বার্থ—রাজস্ব আদায়ে যাতে কোনও রকমের গাফিলতি না হয়। কিন্তু তা হলেও এর ফলে নবাবি আমলে একটি ধারার (tradition) সৃষ্টি হয়— হিন্দুরা শুধু সাধারণ কর্মচারী নয়, অনেক উচ্চপদেও নিযুক্ত হয়। বলতে গেলে নবাবি আমলে রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রে হিন্দুদেরই ছিল প্রায় একচ্ছত্র প্রাধান্য।
তা বলে মুর্শিদাবাদে শুধু শিয়া, সুন্নি বা হিন্দুদের বাস ছিল তা নয়। ছিল আরও অনেক জাতি ও ধর্মের মানুষের। আমরা আগেই বলেছি, মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে আরব, আর্মানি, ইংরেজ, হাবসি, পার্সি, ওলন্দাজ, সিদ্দি, ফরাসি, পাঠান, মোগল, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, লাহোরি, মুলতানি— সবাই এসে জড়ো হত নানা কাজে, ব্যবসায় কেনাবেচা করতে, বিশেষ করে রেশম ও রেশমিবস্ত্র সংগ্রহ করতে। ফলে এত বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের লোক পাশাপাশি থাকার ফলে পরস্পরের মেলামেশা ও আদানপ্রদানের মাধ্যমে একটি ‘কসমোপলিটান’ (cosmopolitan) সংস্কৃতির উদ্ভব হয় মুর্শিদাবাদে। একদিকে হিন্দু ও জৈন মন্দির, মুসলমান মসজিদ অন্যদিকে আর্মানি ও খ্রিস্টানদের গির্জা—সবকিছুর সহাবস্থান। কবি নিহাল সিংহ লিখেছেন, মুর্শিদাবাদে ভাল ভাল দেবমন্দির ও ধর্মশালা আছে, তার গা ঘেঁষেই উঠেছে সুন্দর সব মসজিদ ও মিনার। অসংখ্য যতী, যোগী, ভক্ত, প্রভৃতি নানা বেশে এখানে স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়।৩২
আছ দেহরে পোষাল, সিবকৈ ধাম অরু ধ্রুমশাল,
মসজিদ মুনারে মকাম, ক্যা ক্যা বনৈ হৈ কমঠান,
জোগী জতী নাথ অলেখ, জংগম ভকত নানা ভেখ?
এদিকে ধর্মনিষ্ঠ নবাব মুর্শিদকুলি শহরে মাদ্রাসা ও বাজার বা কাটরা পাশাপাশি খুলে দেন। নবাবি মুর্শিদাবাদে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর আরাধনা একসঙ্গে শুরু হয়। উৎসবের দিনে মাহিনগর, লালবাগ প্রভৃতি এলাকায় প্রজানির্বিশেষে খাওয়ানো, দান খয়রাত চলত, এলাকাগুলিও জমজমাট হয়ে পড়ত। আরেকদিকে নবাব সাহেব নিজের হাতে কোরান নকল করতেন আর সেই কোরান বিলি করা হত নামজাদা জায়গায়—মক্কা, মদিনা ও কারবালায়, এবং বাংলার পাণ্ডুয়ায়, গাজিসাহেবের আস্তানায়। নিজে শিয়া হয়েও মুর্শিদকুলি সুন্নি আলিমদের সঙ্গে ‘বহস’ করতে ভালবাসতেন। সব মিলে মুর্শিদাবাদ সব ধর্ম ও সংস্কৃতির এক মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। এ ধারা পলাশি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের নানা পালাপর্বণ, উৎসব, সমারোহে বিভিন্ন ধর্ম সংস্কৃতির সমন্বয় চোখে পড়ে। মহরমের সময় ভাটিয়ালি গায়করা শোকগাথা গাইত।৩৩ শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা একই মসজিদে পাশাপাশি নমাজ পড়ত। হিন্দুদের হোলি উৎসবে মুসলমানরাও যোগ দিত। শুধু সাধারণ প্রজা নয়, নবাবরাও হোলি উদযাপন করতেন। নবাব শহমৎ জঙ্গ (ঢাকার নবাব নওয়াজিস মহম্মদ খান) শওকত জঙ্গের (তিনি তখন পাটনা থেকে এসেছিলেন) সঙ্গে মুর্শিদাবাদের মোতিঝিল প্রাসাদে সাতদিন ধরে হোলি উৎসব পালন করেন। এমন কী সিরাজদ্দৌল্লা ইংরেজদের সঙ্গে আলিনগরের চুক্তি (ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭) সম্পাদন করেই তাড়াতাড়ি মুর্শিদাবাদ ফিরে তাঁর প্রাসাদ হীরাঝিলে হোলির উৎসবে মেতে ওঠেন।৩৪ শুধু তাই নয়, নবাবরা প্রচুর অর্থব্যয় করে হিন্দুদের দেওয়ালি উৎসবও পালন করতেন।৩৫ মুর্শিদাবাদে মারাঠাদের তৈরি মন্দিরের পাশাপাশি তৈরি হয়েছিল আলিবর্দির মসজিদ। এরকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত আছে। বরানগরের মন্দিরচত্বর এবং মাস্তিরাম আওলিয়ার আখড়া সামনাসামনি অবস্থান করছিল। এই এলাকাতেই রানি ভবানী শ্যাম রায়ের মন্দির তৈরি করেন। বেরাভাষা বলে মুর্শিদাবাদের শিয়াদের একটি প্রাচীন উৎসব আসলে হিন্দুদের গঙ্গাপূজার মুসলিম সংস্করণ।৩৬
