এই খাদ্যশস্য ব্যবসায়ীদের সম্বন্ধে নীচে উদ্ধৃত একটি বর্ণনা পাওয়া যায়:১০
All the grain business is carried on by four tribes, the Cuyar, Buccali, Ujinea and Moorcha. They are managed by a few of the most rich and opulent of each tribe and no instance will ever occur of their underselling each other or ever deviating from the plans of combination
ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলির নাম দেখে অনুমান করা যায় যে এরা মূলত রাজস্থানের বাসিন্দা ছিল। ‘মুরচা’ ও ‘কুয়ার’রা সম্ভবত উত্তর-পশ্চিম রাজস্থানের শৈখাবতীর লোক, ‘উজিনিয়ারা’ উজ্জয়নের ব্রাহ্মণ। ওপরের উদ্ধৃতি থেকে খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলির কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যের পরিচয় পাওয়া যায়। এগুলি হল, এদের গোষ্ঠীগত সংহতি এবং গোষ্ঠীগুলির ওপর দলপতি বা সর্দারের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতা। এরা খাদ্যশস্য মজুত করত ভগবানগোলাতে—সেখানে তাদের অনেকগুলি গোলা ছিল। বলা বাহুল্য, সুযোগ বুঝে, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদে খাদ্যশস্যের অভাব দেখা দিলে, ব্যবসায়ীরা শস্যের দাম বাড়িয়ে দিত এবং প্রচুর মুনাফা করে নিত।১১
মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ীরা একটি মিশ্র বা ‘হেটেরোজেনাস’ গোষ্ঠী—এদের মধ্যে একদিকে বড় বড় সওদাগর, ব্যাঙ্কার, অন্যদিকে ছোটখাট ব্যবসায়ী, যাদের মধ্যে খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ী, সন্ন্যাসী ও ছোট ছোট ব্যাপারী (peddlers) সবাই ছিল। ব্যাঙ্কার মহাজনদের মধ্যে বাঙালি, অবাঙালি সবাই অন্তর্ভুক্ত। অবাঙালিদের মধ্যে বিশেষ করে গোষ্ঠী, জ্ঞাতি এবং জাতপাতের প্রশ্ন বড় করে দেখা যেত। এদের মধ্যে অনেকেই ছিল ওসওয়াল (Oswal) সম্প্রদায়ের জৈন। এদের কাজ কারবার দেখার জন্য এরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর লোকদেরই নিযুক্ত করত। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ জগৎশেঠরা। শেঠদের গোমস্তারা সবাই তাঁদের নিজেদের আত্মীয়, জ্ঞাতি বা সম্প্রদায়ের লোক।১২ এটা অবশ্য আর্মানিদের ক্ষেত্রে আরও বিশেষ করে প্রযোজ্য। তারা নিজেদের আত্মীয়স্বজন, জ্ঞাতিগোষ্ঠীর লোক ছাড়া কাউকেই প্রায় গোমস্তা বা এজেন্ট নিযুক্ত করত না। বাংলায় আর্মানিদের কাজকর্মের বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।১৩ সামাজিক দিক থেকে এ সব ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা করত। এদের বিয়ে, সাদি, সামাজিক মেলামেশাও নিজেদের গোষ্ঠী এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, ধর্মীয় ব্যাপারে তো বটেই। সবাই প্রায় নিজেদের মহল্লাতেই বসবাস করত।
অভিজাত শ্রেণি, ব্যবসায়ী-সওদাগর ছাড়া মুর্শিদাবাদের অন্য যারা বাসিন্দা, তাদের মধ্যে অন্যতম, যারা বৃত্তিমূলক (professional) কাজে নিযুক্ত ছিল। আবার এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে শাসন, রাজস্ব ও আইন বিভাগে মাঝারি ও নীচের দিকের কর্মচারী। মুর্শিদাবাদ নিজামতে, দেওয়ানিতে, সদর দেওয়ানি আদালতে, ফৌজদারি আদালতে এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরে মাঝারি ও নিম্নস্তরে বহু কর্মচারী নানা পদে অধিষ্ঠিত ছিল। সাধারণভাবে বেশির ভাগ দপ্তরেরই প্রধান পদে মুসলমান কর্মচারী, বাকি সব পদে বেশিরভাগই হিন্দু কর্মচারী থাকত। কবি ভারতচন্দ্র নবাব ও রাজাদের দরবারের নিচুতলার কর্মচারী ও বিভিন্ন বৃত্তিধারী লোকজনের তালিকা দিয়েছেন। তাতে বৈদ্য, হস্তগণনাকারী, লেখক, খাজাঞ্চি, উকিল, ‘বাজে জমি’ দপ্তরের প্রধান, সময়রক্ষক, নাকিব, এমন সব বৃত্তিমূলক ব্যক্তির নাম আছে। এদের স্ত্রীরা এদের সম্বন্ধে যে বর্ণনা দিয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে এদের বেশির ভাগই হিন্দু।১— এই তালিকা থেকে অনুমান করা যায় যে পেশাদারি লোকদের আয় ও তাদের সামাজিক মর্যাদায় বেশ তারতম্য ছিল।
বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মচারী ছাড়াও বিভিন্ন পেশায় লিপ্ত বহু লোকের আবাস ছিল মুর্শিদাবাদে। এদের মধ্যে বৈদ্য ও কবিরাজরা সমাজে বেশ মর্যাদা ভোগ করত। উচ্চপদস্থ মুসলমান কর্মচারীদের কাছে এদের খুব কদর ছিল এবং মুসলমান হেকিমের চেয়ে এদের চিকিৎসার ওপর তাদের ভরসা ছিল অনেক বেশি।১৫ এ ছাড়া মুর্শিদাবাদের সমাজে হিন্দু পুরোহিত, মুসলমান মোল্লা, মৌলভি ও অন্যান্য ধর্মগুরুরা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সিয়রের লেখক গোলাম হোসেন খান লিখেছেন যে মুর্শিদাবাদের নবাবরা এদের মুর্শিদাবাদে এসে বসবাস করার জন্য আহ্বান জানাতেন এবং তাদের নানারকম উপহার ও সুযোগ সুবিধা দিতেন।১৬ ভারতচন্দ্র তার সময়কার বাদশাহি/রাজকীয় নগরীর অধিবাসীদের পেশাগত যে বর্ণনা দিয়েছেন, মুর্শিদাবাদ সম্বন্ধে তা প্রযোজ্য। তিনি লিখেছেন:১৭
কায়স্থ বিবিধ জাতি দেখে রোজগারি।
বেনে মণি গন্ধসোনা কাঁসারি শাঁখারি।।
গোয়ালা তামুলী তিলি তাঁতী মালাকার।
নাপিত বারুই কুরী কামার কুমার।।
আগরি প্রভৃতি আর নাগরী যতেক।
যুগি চাষা ধোবা চাষা কৈবৰ্ত্ত অনেক।।
সেকরা ছুতার নুড়ী ধোবা জেলে গুঁড়ী।
চাঁড়াল বাগদী হাড়ী ডোম মুচী শুঁড়ী।।
কুরমী কোরঙ্গা পোদ কপালি তিয়র।
কোল কলু ব্যাধ বেদে মালী বাজিকর।।
এ ছাড়া অবশ্য দিনমজুর ও অন্য খেটেখাওয়া মানুষও ছিল মুর্শিদাবাদে। মনে হয় কাজকর্মের সন্ধানে এরা আশপাশের গ্রামাঞ্চল থেকেই আসত। নবাবের সৈন্যবাহিনীতে প্রচুর সাধারণ সৈন্যও ছিল। নবাবি আমলে অনেক স্থানীয় ব্যক্তিকেও সৈন্যবাহিনীতে নেওয়া হত। রিয়াজের লেখক জানিয়েছেন যে আলিবর্দির যে সব সৈন্যের মুর্শিদাবাদে বাড়ি তারা ঘরে ফেরার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকত। সুতরাং আমরা বলতে পারি মুর্শিদাবাদের সমাজে অভিজাত থেকে শুরু করে সাধারণ স্তরের মানুষও পাশাপাশি বাস করত এবং সমাজ ছিল বহু জাতি, বর্ণ, গোষ্ঠী ও ধর্মাবলম্বীর এক সংমিশ্রণ।
