বলা বাহুল্য, সামাজিক স্তরবিন্যাসে মুর্শিদাবাদের সমাজে সর্বোচ্চ ছিল অভিজাত শ্রেণি। মুর্শিদাবাদ সুবে বাংলার রাজধানী হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মুর্শিদাবাদ অভিজাতবর্গ ও তাদের আশ্রিত ব্যক্তিদের বাসস্থল হয়ে ওঠে। রিয়াজ-উস-সলাতিনের লেখক গোলাম হোসেন লিখেছেন, মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত বাংলার নবাবদের নীতি ছিল দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিজাতদের আমন্ত্রণ করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে আসা।১ তার সঙ্গে নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের সৌন্দর্যায়নের জন্য যে প্রচেষ্টা হয়েছিল, তাতে প্রায় সব নবাবই যুক্ত ছিলেন। ফলে অনেক অভিজাত ব্যক্তি মুর্শিদাবাদে পদার্পণ করেন। এ সব নানা কারণে মুর্শিদাবাদে অভিজাত শ্রেণির বহু মানুষের সমাবেশ হয়। এই অভিজাতরা সাধারণত দুই সম্প্রদায়ের, হিন্দু ও মুসলমান। মুসলমানদের মধ্যে বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়। বস্তুতপক্ষে, মুর্শিদাবাদের মুসলমানদের মধ্যে শিয়াদেরই ছিল প্রাধান্য। ফারসি ইতিহাস তারিখ-ই-মনসুরীর লেখক মন্তব্য করেছেন: ‘in Murshidabad the Shias, are, by the blessing of God, the reigning sect’.২ অন্যদিকে মুর্শিদকুলি বাঙালি হিন্দু ছাড়া আর কাউকে রাজস্ববিভাগে নিযুক্ত করতেন না, ফলে প্রচুর হিন্দু রাজকর্মচারী মুর্শিদাবাদে বাস করত।৩ এ প্রসঙ্গে এটাও বলা দরকার যে, মুর্শিদকুলির সংস্কারের ফলে যে নতুন ব্যাঙ্কার-ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয় তাদের অধিকাংশই হিন্দু। তাই মুর্শিদাবাদের দরবারে হিন্দুদের যে বিশেষ সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল তা অস্বীকার করা যায় না।
মুর্শিদাবাদের সমাজে ও শ্রেণিবিন্যাসে অভিজাত শ্রেণির পরই ছিল ব্যবসায়ী-ব্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক শ্রেণির স্থান। এদের অনেকে দেশ বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে মুর্শিদাবাদের সমাজে জায়গা করে নিয়েছিল। ১৭৩০-এর দশকে নবাব সুজাউদ্দিনের সময় জৈন কবি নিহাল সিংহ মুর্শিদাবাদে আসেন এবং তাঁর ‘বংগাল দেশ কী গজল’ কবিতায় গঙ্গাতীরবর্তী রাজধানীর ও ব্যবসায়কেন্দ্রের যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী-বাণিজ্যিক শ্রেণির পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন:৪
বসতী কাসমবাজার, সৈদাবাদ খাগড়া সার।
রহতে লোক গুজরাতীক, টোপীবাল জেতী জাতীক।
আরব আরমনী আংগরেজ, হবসী হুরমজী উলাংদেজ।
সীদী ফরাসীস আলেমান সৌদাগর মুর্গল পাঠান।।
শেঠী কুংপনী কী জোর দমকে লাগে লাখ কিরোর।
অর্থাৎ কবি নিহাল কাশিমবাজার, সৈয়দাবাদ ও খাগড়ায় বিভিন্ন বণিকগোষ্ঠীর উপস্থিতির দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন কারণ এটা মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। আর এই বণিকগোষ্ঠীর মধ্যে হরেক দেশ ও জাতির লোক—গুজরাটি, আরব, আর্মানি, ইংরেজ, হাবসি, হুরমজি অর্থাৎ পার্সি, ওলন্দাজ (ডাচ), সিদ্দি, ফরাসি ও পাঠান-মোগল।
শুধু তাই নয়, সমসাময়িক ইউরোপীয় পর্যবেক্ষক ও ফরাসি নথিপত্রেও মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারে বিভিন্ন প্রান্তের বহু সওদাগরগোষ্ঠীর কার্যকলাপের কথা সবিস্তারে বলা হয়েছে। ফরাসি সূত্র থেকে জানা যায় যে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে গুজরাটি, আর্মানি, মিরজাপুরি, গোরখপুরি প্রমুখ বণিকগোষ্ঠী খুবই সক্রিয় ছিল।৫ মুর্শিদাবাদের ‘পাচোত্রা’ দারোগার দপ্তরে শুল্ক জমার হিসেব থেকে দেখা যায়, লাহোর এবং মুলতান থেকে আসা ব্যবসায়ীরা পণ্য রফতানি বাবদ শুল্ক জমা দিত।৬ ইংরেজ কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারী উইলিয়াম বোল্টস লিখেছেন:৭
A variety of merchants of different nations and religions, such as Cashmeerians, Multanys, Patans, Sheikhs, Sunniasys, Paggayahs, Betteas and many others used to resort to Bengal.
এই সব সওদাগরদের মধ্যে অনেকেই মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারে তাদের বসতি স্থাপন করেছিল এবং স্থায়ীভাবেই এখানে বসবাস করত। বিশেষ করে যে সব সওদাগর পরিবার রাজস্থান, গুজরাট বা উত্তর ভারত থেকে আসত। তারা মুর্শিদাবাদের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিল। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত অনেক মারওয়ারি পরিবার। জগৎশেঠরা এসেছিল মারওয়ারের নাগর থেকে অষ্টাদশ শতকের একেবারে গোড়ার দিকে। মুর্শিদকুলির সঙ্গে এই পরিবারের মানিকচাঁদ মুর্শিদাবাদে আসেন এবং তারপর থেকে এঁরা মুর্শিদাবাদের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান। তেমনি দুধোরিয়া পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা হুজুরীমল কাপড়ের ব্যবসা করতে রাজস্থানের বিকানির থেকে এসে মুর্শিদাবাদে স্থায়ী আস্তানা করেন।৮ এরকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত আছে।
এ সব বড় বড় সওদাগর ছাড়াও মুর্শিদাবাদে অনেক ছোট ছোট ব্যবসায়ীর অস্তিত্ব ছিল, যারা নানা রকমের ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত থাকত। এরকম একটা গোষ্ঠী ‘সন্ন্যাসীরা’। এরা একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোক। সদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্য অনুযায়ী (খুব সম্ভবত পলাশির সময়কার অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে) কয়েকশো সন্ন্যাসী মুর্শিদাবাদ থেকে মিরজাপুরে কাঁচা রেশম রফতানি করত এবং বছরে ওই রফতানির পরিমাণ ছিল এক হাজার মণ।৯ এর পাশাপাশি মুর্শিদাবাদে অন্য একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দেখা মেলে— তারা হচ্ছে খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ী। মুর্শিদাবাদ একটি শহর, তাই তার বাসিন্দাদের জন্য প্রচুর খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হত। ১৭৮৩-৮৪ সালের একটি আনুমানিক হিসেব অনুযায়ী মুর্শিদাবাদে রোজ ৫,০০০ হাজার মণ খাদ্যশস্যের প্রয়োজন ছিল।১০ তা যদি হয়, মধ্য অষ্টাদশ শতকে শস্যের চাহিদা আরও বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক কারণ ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষের পর এবং কোম্পানির দেওয়ানি লাভ ও কলকাতায় প্রায় সব অফিস-কাছারি নিয়ে যাওয়ায় মুর্শিদাবাদের লোকসংখ্যা ১৭৮৩-৮৪ সালে বেশ কমে যায়। যা হোক, আমাদের আলোচ্য সময়ে দৈনিক ৫,০০০ মণ খাদ্যশস্যের প্রয়োজন হত ধরে নিলেও এই বিশাল পরিমাণ খাদ্যশস্য সরবরাহ করত বিশেষ একটি গোষ্ঠী—যারা খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ে লিপ্ত ছিল। সে হিসেবে মুর্শিদাবাদে এদের একটি বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল।
