We told them (merchants) the price being already agreed, it was not in our power to alter it, and if they would not undertake the invest-ment we must look out for other merchants that would, to which they replied we might do as we pleased, but they were sure no merchants could contract cheaper than themselves, who had been bred up in silk business from their childhood, but they could not give us their labour without some profit of which they saw no prospect at the price we kept.
এ থেকে স্পষ্ট যে কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদের বণিকগোষ্ঠীর একটি বিশেষত্ব ছিল যে তারা সাধারণত কোনও একটি নির্দিষ্ট পণ্য সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ (specialist) ব্যবসায়ী, ছোটবেলা থেকে তারা এ পণ্যের কাজ কারবারেই অভিজ্ঞতা অর্জন করে এ পণ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যেই লিপ্ত হত। এ অঞ্চলের বণিকরা সাধারণত রেশম এবং রেশমিবস্ত্রের ব্যবসাতেই নিযুক্ত থাকত। এদের মধ্যে অনেকে শুধু রেশমের ব্যবসা করত, আবার অনেকে শুধু রেশমিবস্ত্রের। কেউ কেউ অবশ্য দু’টো পণ্যের বাণিজ্যই করত। এদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য, এরা মোটামুটি ভাল মুনাফা না হলে কাউকে পণ্য সরবরাহ করতে আগ্রহী হত না এবং এদের পঞ্চায়েত বেশ শক্তিশালী ছিল।
ইংরেজ কোম্পানি মুর্শিদাবাদ কাশিমবাজার থেকে পণ্য সংগ্রহের জন্য সবচেয়ে বেশি নির্ভর করত কাশিমবাজারের কাটমা পরিবারের ওপর। অষ্টাদশ শতকের তিরিশের দশকে এ পরিবারের কয়েকজনই কোম্পানির ‘প্রধান বণিক’ (chief merchant) হিসেবে কাজ করেছে। এদেরই একজন বলাই বা বলরাম কাটমা, কোম্পানির ‘প্রধান বণিক’ নিযুক্ত হয় ১৭৩৭ সালে। ১৭৪০-এ যখন কোনও একটি কারণে নবাব তাঁকে বন্দি করে রাখেন, তখন কোম্পানি চোখে অন্ধকার দেখে কারণ ‘if some of that family [Katma] will not assit us on this occasion, we find it on several Tryalls impossible to get any of our other merchants to agree for more silk or piece-goods.’২৫
কোম্পানিগুলি বাংলা থেকে ইউরোপে যে কাঁচা রেশম পাঠাত, অনেক সময় সে রেশম ইউরোপের তাতে ব্যবহার করা মুশকিল হত। কারণ এগুলো গোটানো বা কুণ্ডলী করা থাকত না। এসব অসুবিধে দূর করার জন্য কোম্পানিগুলি, বিশেষ করে ডাচরা, কাশিমবাজারে কারখানা (karkhana) স্থাপন করে এ কাজের জন্য উপযুক্ত কারিগর নিযুক্ত করত। বাংলার শিল্প জগতে একদিক থেকে এটি একটি অভিনব সংযোজন। এর আগে কোনও ব্যক্তিগত বা বেসরকারি মালিকানার প্রতিষ্ঠানে এরকম নতুনত্ব দেখা যায়নি। অবশ্য মুঘল যুগের কারখানার কথা আমরা জানি। তবে এসব কারখানা মূলত বাদশাহি প্রতিষ্ঠান। এখানে বাদশাহ ও আমির ওমরাহদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রই শুধু তৈরি হত, সাধারণ মানুষের বা বাজারের জন্য নয়। নবাবি আমলে ঢাকায় এরকম কারখানা ছিল, যেখানে সবচেয়ে বিলাসবহুল, উৎকৃষ্ট ও দামি মসলিন তৈরি হত।২৬ সে যাই হোক, ডাচ কোম্পানিই প্রথম ইউরোপের তাঁতগুলোর উপযুক্ত করে রেশমিসুতো কাটাবার ও ভাল করে গুটিয়ে রফতানি করার জন্য ১৬৫৩ সালে কাশিমবাজারে একটি কারখানা স্থাপন করে। তার জন্য কোম্পানি একটি চালা (shed) তৈরি করে, যাতে ৩,০০০ কারিগর কাজ করতে পারত। এদের পুরো কাজে লাগালে বছরে ১,৫০০ গাঁটরি উৎকৃষ্ট মানের রেশম তৈরি করা যেত। কিন্তু কোম্পানি তা সব সময় করে উঠতে পারত না। অষ্টাদশ শতকের প্রথমদিকে ইউরোপে রেশমের চাহিদা আরও বেড়ে যাওয়ায় ডাচ কোম্পানি ১৭১৫ সালে চালাটি আরও বাড়ায় যাতে ৪,০০০ কারিগর একসঙ্গে কাজ করতে পারে।২৭ ইংরেজ কোম্পানিও এরকম কারখানা তৈরি করে কিন্তু সেখানে ৩০০-র বেশি লোক একসঙ্গে কাজ করতে পারত না, তাই কাশিমবাজার কাউন্সিল ১৭৫৫ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলকে লেখে কারখানাটি বড় করা দরকার, তাই চালাটা আরও বাড়াতে হবে এবং তাঁর জন্য অর্থ মঞ্জুর করতে। ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল তাতে রাজি না হওয়ায় কারখানার সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি।২৮
রেশমিবস্ত্র
কাঁচা রেশম ছাড়াও মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ সিল্কের কাপড় তৈরি হত এবং তাঁর অধিকাংশই ভারতবর্ষ এবং এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে শুধু নয়, ইউরোপেও রফতানি হত। মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার যেহেতু বাংলায় রেশম উৎপাদনের সবেচেয়ে বড় কেন্দ্র ছিল, সেজন্য স্বাভাবিক ভাবেই উৎকৃষ্ট সিল্পের কাপড়ও এখানেই তৈরি হত। সঙ্গে সঙ্গে সিল্ক-সুতি মেশানো কাপড়ও। এই দু’রকম কাপড়েরই প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র ছিল মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চল। ঐতিহাসিকরা বলেন:
The neighbourhood of Murshidabad is the chief seat of manufacture of wove silk: taffeta, both plain and flowered, and many other sorts of inland commerce and for exportation, are made there abundantly, than at any other places where silk is wove.
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, সিল্ক কাপড়ের কাজ-কারবার যারা করত, তারা ওতেই বিশেষজ্ঞ ব্যবসায়ী। অন্যান্য ব্যবসায়ীরা সাধারণত এরকম কাপড় কেনাবেচা করত না। কোম্পানির নথিপত্র থেকে এটা স্পষ্ট। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৭৪৪ সালে কাশিমবাজার থেকে যে পরিমাণ রেশমিবস্ত্র সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয়, তা করতে হলে এখানকার কুঠিয়ালরা জানায়, মুর্শিদাবাদ-সৈয়দাবাদে যে সব অভিজ্ঞ ও বড় বড় ব্যবসায়ী এই পণ্যই শুধু সরবরাহ করে, তাদের সাহায্য একান্ত দরকার। এদের মধ্যে আছে গোঁসাইরাম, রাম সিং, রামনাথ ইচ্ছানাথের মতো ধনী ও এ পণ্যে অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী। তারাই প্রধানত সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের সিল্কের কাপড় সরবরাহ করতে পারে। অন্যান্য ব্যবসায়ীরা সাধারণত এই পণ্যে কাজ-কারবার করতে চায়না। কোম্পানি গোঁসাইরাম প্রমুখ ব্যবসায়ীর সঙ্গে রেশমিবস্ত্র সরবরাহের জন্য চুক্তি করতে চায় কিন্তু ওই সব ব্যবসায়ীরা অগ্রিমের জন্য জামিন দিতে অস্বীকার করে। তারা বলে যে এতে বাজারে তাদের সুনাম নষ্ট হবে। কাশিমবাজার কাউন্সিল কলকাতায় লেখে যে এরা খুবই ধনী এবং সিল্কের কাপড়ে বিশেষ ব্যবসায়ী। সিল্কের কাপড় সরবরাহ করার জন্য ওদের সঙ্গে তাড়াতাড়ি চুক্তি না করলে এরা হাতছাড়া হয়ে যাবে, ফরাসি ও ডাচ কোম্পানি এদের লুফে নেবে। ফলে ইংরেজ কোম্পানির পক্ষে ইংল্যান্ড থেকে যে পরিমাণ রেশমিবস্ত্র পাঠানোর জন্য নির্দেশ এসেছে, তা কার্যকর করা সম্ভব হবে না। অবশেষে কোম্পানি জামিন ছাড়াই ওই সব রেশমিবস্ত্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য হয়।৩০
