সিল্ক কাপড়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল ‘টাফেটার’ (tafettas বা taffaties) আর এটা প্রধানত কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চলেই বেশি তৈরি হত। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি ইউরোপে যে রেশমিবস্ত্র রফতানি করত, তার একটা বড় অংশই টাফেটা। ডাচরা আবার এটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও জাপানে রফতানি করত। শুধু ইউরোপীয়রা নয়, এশীয় বণিকরাও মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে বেশ ভাল পরিমাণ ‘টাফেটা’ রফতানি করত। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে বাংলা থেকে ইউরোপীয়রা নয়, এশীয় বণিকরাই সবচেয়ে বেশি রেশমিবস্ত্র রফতানি করত, যার মধ্যে টাফেটা অন্যতম। নীচে প্রদত্ত সারণি থেকে এটা পরিষ্কার।
সারণি ৭.১
এশীয় বণিক ও ইউরোপীয়দের রেশমিবস্ত্র রফতানির বার্ষিক গড়
১৭৫০/৫১-১৭৫৪/৫৫
এশীয়রা ইউরোপীয় কোম্পানি
বছর (সংখ্যা) ডাচরা ইংরেজরা মোট ইউরোপীয়
(সংখ্যা) (সংখ্যা) (সংখ্যা)
১৭৫০/৫১ ১২৪,৬৭৫ ১২,৮৯০ ১২,৭৬০ ২৫,৬৫০
১৭৫১/৫২ ৯২,৪৭৫ ৩৯,৬২৮ ২০,০৪১ ৫৯,৬৬৯
১৭৫২/৫৩ ৮৯,৯৭৮ ২৭,৭৭৭ ৩২,৬১৫ ৬০,৩৯২
১৭৫৩/৫৪ ৭৮,৯৭৮ ২৯,০২৯ ২৪,৬৬৩ ৫৩,৬৯২
১৭৫৪/৫৫ ৭৫,০৬২ ৪০,৮৮৩ ৩৪,১৬০ ৭৫,০৪৩
মোট সংখ্যা ৪৫৭,১৬৮ ১৫০,২০৭ ১২৪,২৩৯ ২৭৪,৪৪৬
বার্ষিক গড় ৯১,৪৩৪ ৩০,০৪১ ২৪,৮৪৮ ৫৪,৮৮৯
[সূত্র: এশীয় বণিকদের রফতানি, BPC, vol. 44, Consult. 19 June 1769; ডাচ রফতানি হল্যান্ডের রাজকীয় মহাফেজখানা (Algemeen Rijksarchief) থেকে সংগৃহীত তথ্য থেকে হিসেব করে বার করা হয়েছে; ইংরেজ কোম্পানির রফতানি K. N. Chaudhuri-র বই (Trading World) থেকে নেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে।]
এই পরিসংখ্যানে অবশ্য ফরাসিদের রফতানির পরিমাণ ধরা হয়নি কারণ এ বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া দুষ্কর। তবে P.J. Marshall এর বক্তব্য অনুসরণ করে, যে ফরাসিদের রফতানির পরিমাণ ডাচ বা ইংরেজদের রফতানির অর্ধেক হওয়ারই সম্ভাবনা,৩১ আমরা অনুমান করতে পারি যে, ডাচ ও ইংরেজদের রফতানির বার্ষিক গড় যখন যথাক্রমে ৩০,০৪১ ও ২৪,৮৪৮ তখন ফরাসিদের বার্ষিক গড় রফতানি ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০-এর বেশি হতে পারে না। তা যদি হয়, তা হলে ইউরোপীয়দের সম্মিলিত রেশম রফতানির মোট বার্ষিক গড় ৬৭,০০০ থেকে ৭০,০০০-এর বেশি হতে পারে না (ওপরের সারণি থেকে দেখা যাচ্ছে ডাচ ও ইংরেজদের রফতানির বার্ষিক গড় ৫৪,৮৮৯)। অথচ ওপরের সারণি থেকে আমরা দেখছি যে এশীয় বণিকদের রেশমিবস্ত্র রফতানির বার্ষিক গড় ৯১,৪৩৪। সুতরাং কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চল থেকে রেশমিবস্ত্র রফতানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের চেয়ে এশীয় বণিকরাই অনেক বেশি এগিয়ে ছিল।৩২
কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে কাঁচা রেশম উৎপাদন ও এই শিল্পের সঙ্গে অনেক কৃষক/কারিগর যেমন যুক্ত ছিল, তেমন রেশমিবস্ত্র তৈরি করার জন্যও অনেক তাঁতি ও কারিগরের প্রয়োজন ছিল। সমসাময়িক নথিপত্র থেকে জানা যে এ অঞ্চলে এমন তাঁতি ও কারিগরের কোনও অভাব ছিল না। এদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কথা কিন্তু সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে বাজারে যখন সিল্কের কাপড়ের প্রচুর চাহিদা ছিল, কাঁচা মালেরও খুব একটা অভাব যখন চোখে পড়ে না, তখন আন্দাজ করা যেতে পারে যে এদের অবস্থাও খুব একটা খারাপ ছিল না। তাঁতিরা সাধারণত তিনটে রঙের ‘টাফেটা’ বুনত— পাকা সবুজ, হালকা সবুজ ও নীল। এই তিন রকম কাপড় বুনতে কোন খাতে কত খরচ হত, তাঁতি কত পেত এবং বিশেষ করে পুরো খরচের শতকরা কত তাঁতির লাভ থাকত সে সম্বন্ধে একটি তালিকা আমি পেয়েছি। পরের পাতায় সেটি উদ্ধৃত করা হল।
আমরা আগেই বলেছি বাংলা থেকে যে বিপুল পরিমাণ কাঁচা রেশম রফতানি হত, তাঁর অধিকাংশই কাশিমবাজার-মুর্শিদাবাদ অঞ্চল থেকে, এবং ইউরোপীয় কোম্পানি তথা ভারতীয়/এশীয় বণিকরা সবাই এতে লিপ্ত ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ রেশম রফতানিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা কাদের— ইউরোপীয়দের না ভারতীয়/এশীয় বণিকদের? এতদিন ঐতিহাসিকদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে বাংলা থেকে রফতানি বাণিজ্যে ইউরোপীয়দেরই মুখ্য ভূমিকা— তারাই বাংলা থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য রফতানি করত। তা যদি হয়, তা হলে কাঁচা রেশমের রফতানিতেও তারা ছিল অগ্রগণ্য, কারণ বাংলা থেকে যে দু’টি প্রধান রফতানি পণ্য (মোট মূল্য এবং পরিমাণগতভাবে), তা হল বস্ত্র ও কাঁচা রেশম। সুতরাং ওপরের বক্তব্য অনুযায়ী কাঁচা রেশমের রফতানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দেরই প্রধান ভূমিকা। অন্তত কে, এন, চৌধুরী (১৯৭৮), ওম প্রকাশ (১৯৮৫, ১৯৯৮), পিটার মার্শাল (১৯৭৮, ১৯৮৭), ক্রিস বেইলি (১৯৮৭) প্রমুখের গবেষণা গ্রন্থ থেকে এ ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক।৩৩
তবে প্রশ্ন, এ ধারণা কি সঠিক? আমরা অস্বীকার করছি না যে বাংলার সমুদ্র বাণিজ্যে ইউরোপীয়রা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু তা বলে একথা বলা যায় না যে বাংলার সামগ্রিক বহির্বাণিজ্যে তারা এশীয় বণিকদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল কারণ এতে সমুদ্র বাণিজ্যের সঙ্গে স্থলপথে বহির্বাণিজ্যের ব্যাপারটাও থাকছে। অনেকদিন ধরেই বাংলা থেকে স্থলপথে বহিবাণিজ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিকদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল যে (বিশেষ করে নীলস স্টিনসগার্ড (Niels Steensgaard), অশীন দাশগুপ্ত প্রমুখের লেখায়),৩৪ মুঘল, পারসিক ও অটোমান (Ottoman) এই তিনটি বিশাল সাম্রাজ্যের পতনের পর এবং তাঁর ফলে সুরাটের মতো আন্তর্জাতিক ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের পতন হওয়ায় স্থলপথে বাণিজ্য প্রচণ্ড মার খায়। এরকম চিন্তাধারার অন্যতম কারণ, ভারতবর্ষ/বাংলা থেকে স্থলপথে বাণিজ্য সম্বন্ধে কোনও তথ্য পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর, যেখানে ইউরোপীয় বাণিজ্য সম্বন্ধে বেশ সহজেই পরিসংখ্যানগত তথ্য ইউরোপের মহাফেজখানাগুলি থেকে সংগ্রহ করা যায়। অবশ্য এর সঙ্গে ও-সব ঐতিহাসিকদের মধ্যে ইউরোপ কেন্দিক (Eurocentric) মানসিকতাও হয়তো কিছুটা কাজ করেছে।
